Technology Image

মোবাইল ফোনের আদি কথা

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা মানবসভ্যতার জন্য এক বিশাল মাইলফলক। আর সেই টেলিযোগাযোগই যখন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসে তখন তাকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের প্রতিটি কোণেই মোবাইল ফোনের ব্যবহার দেখা যায়। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহারের কথা ভাবতেই পারতো না। তবে কেউই যে ভাবেননি তা বলা ঠিক হবে না।

১৯০৮ সালে অকল্যান্ডের অধ্যাপক আলবার্ট জানকে একটি টেলিফোন কোম্পানির জন্য তারবিহীন টেলিফোন তৈরি করেছেন এমন দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই দাবি ভুয়া প্রমাণিত হয়। এরপর ১৯১৮ সালে জার্মানির রেলবিভাগের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বার্লিন থেকে জোসেন রেঞ্জে কার্যকর একটি ফোন তৈরি করা হয়েছিল। তবে সেই ফোনটি শুধু ট্রেনের ভেতরই কর্মক্ষম ছিল। কিন্তু ১৯৪০ সালের দিকে বেশ কয়েকটি টেলিফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মোবাইল ফোন তৈরিতে সক্ষম হয়। যদিও তখনকার মোবাইলগুলো ছিল বেজায় ঢাউস আকৃতির। প্রথম দিককার কিছু মোবাইল বহনের জন্য একজন বাড়তি লোকও নিয়োগ করতে হতো বলে জানা যায়।
তবে প্রথম সফর তারবিহীন সহজে বহনযোগ্য মোবাইল ফোন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের মটোরোলা কোম্পানি। ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ‘ডায়নাটাক ৮০০০এক্স’ নামের ওই মোবাইলটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল চার হাজার ডলার। কিন্তু মজার বিষয় হলো ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত অপর একটি মোবাইল তৈরি করার আগ পর্যন্ত ওই মোবাইলটি দিয়ে কোনো কল করা যায়নি। শেষমেষ বর্তমান ভোডাফোনের চেয়ারম্যান স্যার আর্নেস্ট হ্যারিসন প্রথম কল করেন ওই মোবাইল দিয়ে।
১৯৮৬ সালের দিকে মটোরোলা ‘মটোরোলা ৪৫০০এক্স’ নামের অপর একটি মোবাইল ফোন বাজারে আনে। এবং এই ফোনটি বিশেষত গাড়িতে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়। আর এই মোবাইলটির ওজন ছিল প্রায় সাড়ে তিন কিলোগ্রাম।

নতুন এই প্রযুক্তির বাজার শুরুতে অতটা ভালো ছিল না। কিন্তু মটোরোলা তার প্রকৌশলীদের খাটিয়ে একের পর এক উদ্ভাবন করে যাচ্ছিল নতুন ডিজাইনের সব মোবাইল। ১৯৮৯ সালে ‘মাইক্রোটাক ৯৮০০এক্স’ নামের ওই সময়ের সবচেয়ে হালকা মোবাইল ফোন বাজারে আনে তারা। ওই মোবাইলটির সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি প্ল্যাস্টিক অ্যান্টেনা। যদিও ওই অ্যান্টেনাটির কোনো কাজ ছিল না, স্রেফ সৌন্দর্যের জন্য রাখা হয়েছিল।

১৯৯২ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল মোবাইল ফোনটিও বাজারে আনে মটোরোলা। আর সেই মোবাইলটির নাম ছিল ‘মটোরোলা ৩২০০’। পরবর্তীতে যদিও এই মোবাইলের আদলেই নকিয়া কোম্পানি তাদের ‘নকিয়া ৩২১০’ মোবাইলটি তৈরি করে। ১৯৯২ সালেই প্রথম গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন(জিএসএম) সম্বলিত মোবাইল ফোন তৈরি করে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি নকিয়া। প্রতিষ্ঠানটি ‘নকিয়া ১০১১’ নামের মোবাইলটি যুক্তরাজ্যের বাজারে তৎকালীন সময়ে ২৩৪ পাউন্ডে বিক্রি হয়।
জিএসএম’র ধাক্কা শেষ হতে না হতেই সফটওয়্যার ব্যবহার করা যায় এমন ফোন নিয়ে আসে আইবিএম। শুধু তাই নয় বর্তমানে আমরা যে টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি দেখতে পাই, তার সৃষ্টিও সেই সময়েই করে আইবিএম। ‘আইবিএম সিমন’ নামের ওই মোবাইলটি ৮৯৯ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি রাজ্যে নেটওয়ার্ক স্থাপনে সক্ষম হয় আইবিএম।

১৯৯৬ সাল মোবাইল ফোন জগতের জন্য ছিল এক বিশাল ধাক্কার সময়। প্রথমবারের মতো নকিয়া স্মার্টফোন বাজারে আসে এ সময়। এলসিডি মনিটর সমৃদ্ধ এই মোবাইল বাজারে আসতেই ইউরোপের বাজারে সেসময় ব্যাপক হৈচৈ শুরু হয়ে গিয়েছিল। নকিয়ার মোবাইলকে টেক্কা দিতে ১৯৯৬ সালে মটোরোলা বিশ্ববাজারে প্রথম ‘ফ্লিপ’ মোবাইল নিয়ে আসে। এবং মোবাইল কিনলে ফ্রি হিসেবে ৬০ মিনিট টকটাইমও ফ্রি দিয়েছিল সেসময় মটোরোলা। একই বছর নকিয়া প্রথম স্লাইড ফোন নিয়ে আসে। যা বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’র মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়।

২০০০ সালে নতুন অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে বাজারে আসে এরিকসন আর৩৮০ মোবাইল ফোন। দেখতে সুন্দর এবং সহজে অপারেট করতে পারার কারণে অল্পদিনেই জনপ্রিয়তা অর্জন করে নেয় মোবাইল কোম্পানিটি। ২০০২ সালে হ্যান্ডস্প্রিং নামের একটি কোম্পানি ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় এমন মোবাইল তৈরি করে।
২০০৩ সাল পুরোটাই ছিল নকিয়া ১১০০ মডেলের মোবাইলটির। এখন পর্যন্ত বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রিত মোবাইলের মধ্যে নকিয়া ১১০০ অন্যতম। একই বছর ব্ল্যাকবেরি নামের নতুন কোম্পানি ‘কেয়ার্ক’ নামের একটি স্মার্টফোন বাজারে আনে।

২০০৭ সালে বর্তমানে বিখ্যাত কোম্পানি অ্যাপল বাজারে আনে ‘আইফোন’ স্মার্টফোন। ভিন্নধর্মী অপারেটিং সিস্টেম এবং উন্নত প্রযুক্তির কারণে রাতারাতি ইউরোপের বাজার দখল করে নেয় অ্যাপল মোবাইল। পরবর্তী বছর ২০০৮ সালে এইচটিসি লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম সম্বলিত নতুন মোবাইল বাজারে আনে। যদিও পরবর্তীতে এই মোবাইলটির প্যাটেন্ট গুগল কিনে নেয়।

২০১০ সাল ছিল স্যামসাং ধামাকা। গ্যালাক্সি এস অ্যান্ডরয়েড মোবাইল ফোন তৈরি করে এবং বাজারজাত করে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দেয় কোম্পানিটি। অতিরিক্ত খরচের কথা ভেবে যারা এতোদিন অ্যাপলের আইফোন ব্যবহার করতে পারেননি তাদের জন্য স্যামসাং সম্ভাবনার দরজা উন্মোচন করে দেয়।

২০১৩ সালে অ্যাপল ‘আইফোন ৫এস’ নামে আরেকটি স্মার্টফোন বাজারে নিয়ে আসে। এমনও শোনা গেছে যে, চীনে এক নারী এই মোবাইল কেনার জন্য তার কিডনি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন।