Travel Image

ঐতিহ্যময় তাজহাট জমিদারবাড়ি



বাংলাদেশের বিভাগের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন রংপুর। রংপুর প্রাচীন জনপদ বরেন্দ্র অঞ্চলের অংশ ছিল। রংপুরের নামকরণ নিয়ে রয়েছে অনেক মতভেদ। প্রচলিত রয়েছে যে, রঙ্গরসে ভরপুর, তার নাম রংপুর! রংপুরের প্রাচীন নাম ছিল রঙ্গপুর। আবার কেউ কেউ বলেন, রংধনুর সাত রং মিলিয়ে এ জেলার নামকরণ করা হয়েছে রংপুর।

রংপুর জেলার তাজহাট, ডিমলা, কাকিনা, মহুনা, পীরগঞ্জ ইত্যাদি এলাকায় বেশ কিছু বিখ্যাত জমিদার বংশ ছিল। তাদের ছিল প্রাসাদতুল্য বাড়ি। এগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো তাজহাটের জমিদার বাড়ি। সাদা ধবধরে প্রাসাদটিকে মনে হয় যেন এক বিশালাকৃতির শ্বেতপদ্ম। বেশ বড় এলাকা নিয়ে তৈরি রাজবাড়িটি। রয়েছে বাগান এবং ঘাট বাঁধানো পুকুর। রংপুর শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্বদিকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জমিদার বাড়িটি দেখতে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা।

তাজহাট জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মান্নালাল রায়। তিনি শিখ ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। মান্নালাল রায় পাঞ্জাব থেকে এসে রংপুরের মাহীগঞ্জে বসবাস শুরু করেন। সে সময় মাহীগঞ্জ ছিল রংপুরের জেলা সদর। মান্নালাল পেশায় ছিলেন একজন স্বর্ণকার। ধারণা করা হয়, তাঁর নিজের তৈরি আকর্ষণীয় তাজ বা রত্নখচিত মুকুটের কারণে এ এলাকার নাম হয় তাজহাট।

মান্নালাল রায় তাঁর জীবদ্দশায় প্রচুর সম্পত্তির মালিক হন এবং রংপুরের অনেক এলাকা নিজ আয়ত্তে নিয়ে আসেন। তাঁর নাতি ধনপত লাল রায় বিয়ে করেন রতন লাল রায়ের নাতনিকে। রতন লাল রায়ও পাঞ্জাব থেকে এসে অভিবাসন গ্রহণ করেন। ধনপত লাল রায়ের নাতি উপেন্দ্রলাল রায় খুব অল্প বয়সে মারা যায়। ফলে জমিদারির দায়িত্ব তাঁর কাকা গিরিধারী লাল রায়ের ওপর আসে। গিরিধারী লাল রায় ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি কলকাতার জনৈক গোবিন্দ লালকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। গোবিন্দ লাল ১৮৭৯ সালে এই জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। তিনি ছিলেন খুবই স্বাধীনচেতা এবং একই সাথে জনপ্রিয়। তিনি ১৮৮৫ সালে রাজা, ১৮৯২ সালে রাজা বাহাদুর এবং ১৮৯৬ সালে মহারাজা উপাধি গ্রহণ করেন। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে নিজ বাড়িতে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। ১৯০৮ সালে তাঁর ছেলে মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ধারণা করা হয় বিংশ শতকের শুরুর দিকে তিনিই তাজহাট জমিদারবাড়ি নির্মাণ করেন।

১৯৪৭ সালে জমিদারবাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। প্রায় ৫৫ একর জমিসহ এটাকে এগ্রিকালচার ইনস্টিটিউটকে দেয়া হয়। ১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চ তত্‍কালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জমিদারবাড়ি ভবনটি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট সিভিশন হিসেবে উদ্বোধন করেন। ১৯৯১ সালে হাইকোর্ট ডিভিশন উঠে গেল ১৯৯৫ সালে রাজবাড়িটি ১৫ একর জমিসহ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রাজবাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে।

বিশাল প্রাসাদতুল্য এই জমিদারবাড়িটির দৈর্ঘ্য ৭৬.২০ মিটার। এটি প্রায় ২১০ ফুট প্রশস্ত এবং চারতলার সমান উঁচু। এর গঠনশৈলী প্রাচীন মোঘল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত বলে ধারণা করা হয়। এর ছাদের ঠিক মধ্যভাগে রয়েছে একটি আটকোনা গম্বুজ। সাদা মার্বেলের সিঁড়ি সরাসরি দোতলায় চলে গিয়েছে। একসময় সিঁড়ির দুপাশে দোতলা পর্যন্ত ইতালীয় মার্বেলের তৈরি রোমান দেব-দেবীর মূর্তি দিয়ে সাজানো ছিল। প্রাসাদে মোট ২২টি কক্ষ আছে। রাজবাড়ির পেছনের অংশে গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। এই গুপ্ত সিঁড়ি কোনো একটি সুরঙ্গের সাথে যুক্ত, যা সরাসরি ঘাঘট নদীর সাথে যুক্ত রয়েছে এবং এটা রাজারা বিপদের সময় পালানোর কাজে ব্যবহার করার জন্য তৈরি করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে সিঁড়িটা এখন নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে জাদুঘরে ঢুকলেই রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী কক্ষ। এসব কক্ষে রয়েছে দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম। এখানে রয়েছে সংস্কৃত ও আরবি ভাষায় লেখা বেশ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও শিলালিপি। রয়েছে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলের কোরআন শরীফ, মহাভারত ও রামায়ণ। পেছনের ঘরে রয়েছে বেশ কয়েকটি কালো পাথরের বিষ্ণুমূর্তি। এছাড়া এ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে বেগম রোকেয়ার স্বহস্তে লেখা চিঠি, হাতির দাঁত, তত্‍কালীন দাড়িপাল্লা, কালো পাথর, জমিদার গোপাল রায়ের ব্যবহার্য ঝাড়বাতি, সিলমোহর, পোড়ামাটির মস্তক, নারী মূর্তি, আবক্ষ মূর্তি, গণেশ, পিতলের দুর্গা, কবি শেখ সাদীর স্বহস্তে লেখা কবিতা, শিবলিঙ্গ, কষ্টি পাথরের মুদ্রা ইত্যাদি। জাদুঘরে নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য পরিশোধ করে প্রবেশ করা যায়। প্রাসাদ চত্বরে গাড়ি নিয়ে ঢুকতে চাইলে গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট ফি দিতে হবে।

কীভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে রংপুরগামী যেকোনো বাসে বা ট্রেনে রংপুর যেতে পারেন। ঢাকা থেকে যে বাসগুলো ছাড়ে সেগুলো হলো হানিফ এন্টারপ্রাইজ (ফোন : ৯১৩৫০১৮), টি আর ট্রাভেলস (ফোন : ৮০৩৫৯৬৪), আগমনী পরিবহন (ফোন : ৮০২১৯৫৩), এস আর পরিবহন (ফোন : ৮০১৩৭৯৩), শ্যামলী পরিবহন (ফোন : ৮১২৪৮৮১)।

কোথায় থাকবেন :
রংপুরে রয়েছে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল। এগুলো থেকে রিকশা বা সিএনজিতে করে খুব সহজেই চলে যেতে পারবেন তাজহাট জমিদারবাড়ি। রংপুরের আবাসিক হোটেলগুলো হলো -
হোটেল চাঁদিমা,
স্টেশন রোড,
ফোন : ০৫২১-৬২০২৬।
হোটেল শাহ আমানত,
জাহাজ কোম্পানির মোড়,
ফোন : ০৫২১-৬৫৬৭৩।
হোটেল পার্ক,
জি এল রায় রোড,
ফোন :০৫২১-৬৬৭১৮
পর্যটন মোটেল,
আর কে রোড,
ফোন : ০৫২১-৩৬৮১।