Travel Image

শরীয়তপুরের ধানুকার মনসা মন্দির



সংস্কার আর সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে শরীয়তপুরের ধানুকার মনসাবাড়ি । এ বাড়ির বেশির ভাগ সম্পদই বেহাত হয়ে গেছে । শুধু দালানগুলো এলাকার প্রভাবশালীদের হাত থেকে এখনো রক্ষা করে রেখেছেন বাড়ির শেষ পুরুষ শ্যামাচরন চক্রবর্তী । শরীয়তপুর জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পেছন দিকটাই ধানুকা গ্রাম । দক্ষিন দিকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হাঁটলেই চোখে পড়ে মনসা বাড়ি । কথিত আছে, বাড়ির এক কিশোরের অভ্যাস ছিল প্রত্যুষ বাগানে গিয়ে ফুল কুড়ানো। একদিন প্রত্যষেু ফুল কুড়াতে গিয়ে সে দেখতে পায় বাগানে মস্তবড় এক সাপ । ভয় পেয়ে সে ঘরে ফিরে আসে । পরদিন আবার যথা রীতি ওই কিশোর ফুল কুড়াতে যায় বাগানে । সেদিনও মুখোমুখি হয় সেই সাপের । সাপটি কিশোরের পিছু পিছু বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করে তাকে ঘিরে নৃত্য করতে শুরু করে। বাড়ির লোকজন প্রত্যক্ষ করে সে দৃশ্য। রাতে তাদের সামনে স্বপ্নে আর্বিভূত হয় মনসা দেবী। দেবী তাদের মনসা পূজা করার নির্দেশ দেন। এর পরই বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় মনসা মন্দির। আর সেই থেকেই ময়ূর ভট্রের বাড়ি রূপান্তর হয় মনসা বাড়িতে। মূল রাস্তা থেকে বাড়িটির প্রবেশ মুখে একটি বড় পুকুর রয়েছে। পুকুরে পশ্চিম পাড় থেকে শুরু রয়েছে মূল বাড়ির সীমানা। মন্দির বাড়ির পশ্চিম সীমানার মাঝামাঝি পূর্বদিকে মূখ করে দাঁড়িয়ে আছে বাংলো প্যাটার্নের দোচালা ছাদবিশিষ্ট ইমারত। এটাই একসময় মনসা মন্দির হিসাবে ব্যবহার হতো। উওরের প্রান্তসীমায় দক্ষিন দিকে মুখ করে অপেক্ষাকৃত বড় একটি ইমারত রয়েছে। এটি দোচালা ছাদবিশিষ্ট। এটি দূর্গা মন্দির হিসেবে চিহ্নিত। দুর্গা মন্দিরের দিকে মুখ করে একটু ভিন্ন ডিজাইনের একটি ভবন রয়েছে। ভবনটি দ্বিতল ছিল। দ্বিতল ভবনের দ্বিতীয় তালাটি বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত। এর ওপরে ওঠার জন্য ইটের তৈরি সিঁড়ির কিছু অংশ এখনো টিকে আছে। এ ভবনটিই ছিল নহবতখানা। মন্দিরের বাড়ির সাজানো চত্বরের ধার ঘেঁষে একটু পশ্চিম দিকে রয়েছে কালীমন্দির। কালীমন্দিরটি ও দোতালা। মন্দির বড়ির দক্ষিনে নহবতখানার পেছন থেকে পর্ব পশ্চিমে প্রলম্বিত ধ্বংস প্রায় একটি বিশাল ভবন রয়েছে। বহু কক্ষবিশিষ্ট এ ভবনটি ছিল দোতালা।

বর্তমানে দক্ষিন-পশ্চিমের একাংশে দোতালার কাঠামোটি টিকে আছে। মনসাবাড়ির এ ভবনটিকেই শিক্ষায়তন বা টোল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে এ বাড়ির সীমানায় সর্বমোট পাঁচটি ইমারত রয়েছে। এর কোনো কোনোটি বিধ্বস্ত আবার কোনোটি দাঁড়িয়ে আছে সদম্ভে। স্থানীয় জনশ্রুতি ও বাড়ির শেষ বংশধদের কাছ থেকে জানা যায়, ভবনগুলোর একটি কালীমন্দির, একটি দূর্গা মন্দির, একটি মনসা মন্দির, একটি নহবতখানা, একটি আবাসিক গৃহ বা শিক্ষায়তন (টোল) হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ইমারতগুলো নির্মান সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধরনা পাওয়া না গেলে ও এর নির্মানশৈলী ও নির্মান উপকরন দেখে প্রতীয়মান হয়, এগুলো মোগল আমলের নিদর্শন। ময়ূর ভট্ট আর মনসাবাড়ির শ্যামাচরন চক্রবর্তী তিনি মাষ্টার, একজন পন্ডিত ওখ্যাতনামা হস্তরেখাবিদ। তিনি জানান, প্রায় ৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মনসাবাড়ির সম্পদগুলোর এখন আর তার দখলে নেই। বেশির ভাগই বেহাত হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে কিছু প্রভাবশালী লোক চাপ সৃষ্টি করত এ প্রাচীন (দ্বিতল) ভবনগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য। হাজার চাপের মধ্যে আজও তিনি তা টিকিয়ে রেখেছেন। তনু মাষ্টারের মা মহামায়া, বয়স ৯০ বছর। তার মতে, ব্রিটিশদের শেষ সময় পর্যন্ত এ বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলটা খুবই রমরমা ছিল। ৬৫- এর সাম্প্রাদায়িক দাঙ্গা ও ৭১এর মুক্তি সংগ্রামের সময় মূল্যবান পুরনো মূর্তিসহ অনেক সম্পদ লুট হয়ে গেছে।