Entertainment Image

একাকার মোশাররফ করিম



সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী অভিনেতা মোশাররফ করিম। দীর্ঘদিনের সাধনায় কোটি ভক্তের মন জয় করেছেন তিনি। শুরুটা তার মঞ্চ থেকে। তারপর ছোট ও বড় পর্দায়। সবার কাছে প্রিয় ও কাঙিক্ষত এক মুখ। অভিনয়ে তুমুল ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন তিনি।

আপনার বেশিরভাগ নাটকই হাসি নির্ভর। নাটক দেখে মানুষ হাসে, মজা পায়। কিন্তু সেখানে কোনো মেসেজ থাকে না। তো এ ব্যাপারে আপনি কি বলবেন?
শিল্পের ক্ষেত্রে শিল্পীর দায়িত্ব কি? শিল্পীর একটা দায়িত্ব হয় তো আছে যে, আমরা কিছু শেখাতে চাই। এই চাওয়ার মধ্যে একটা মাস্টারিও আছে। রবীন্দ্রনাথের এক নাতি একটা ছাতার বাট নিয়ে খেলছিল। রবীন্দ্রনাথ উপর থেকে দেখতে পায় । নাতি লজ্জা পেয়ে বলে বলতো আমি কি নিয়ে খেলছি। রবীন্দ্রনাথ কথা বলছে না, তো নাতি বললো যে ভাবছ আমি ছাতার বাট নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ বললো না, তুমি যে পঙ্খীরাজ ঘে্াড়া চালাচ্ছো তা দেখেই বুঝেছি। গল্পটা আমার মোস্তফা মনোয়ারের কাছ থেকে শোনা। তো একটা ছাতার বাটকে পঙ্খীরাজ ঘোড়া হিসেবেও চালানো যায়, আবার ইহা একটি ছাতার বাট এই বলেও শেখানো যায়। এখন আমি মনে করি রাষ্ট্রের একক সমাজ, সমাজের একক মানুষ, মানুষের একক কি? তার মন। আমি অভিনয় করে যদি একটা লোকের মন ভালো করে দিতে পারি তাহলে আমি মনে করবো যে আমি একটা কাজ করলাম। মানুষের মন ভালো করে দিলেই তো হলো। আর তো কিছুর দরকার নেই। শেখানোটা দরকার কিন্তু কেউ নাটক বানিয়ে কিছু শেখাচ্ছে না, সে বিশাল অন্যায় করেছে এটা আমি মনে করি না।

এ পর্যন্ত আপনার অভিনীত নাটক নিয়ে কি আপনি তৃপ্ত? না কোনো অতৃপ্তি এখনো আছে?
তৃপ্ত না কি অতৃপ্ত তা জানিনা। আবার এরকমও না যে অমুক একটা ক্যারেক্টার যদি পেতাম, সেখানে দুর্দান্ত অভিনয় করতাম। এরকমও না। তবে একটা চরিত্রের ভেতরে যখন নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় তখন ভালো লাগে। কাজ করে তৃপ্তি পাওয়া যায়।

এরকম কতগুলো নাটকের ক্যারেক্টারে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন? সেই নাটকগুলো কি কি?
এক্ষেত্রে প্রথমেই স্টেজের কথা বলবো। আরজ চরিতামৃতের আরজ। ওটায় একটা বাচ্চা ক্যারেক্টার করে ভালো লেগেছিল। সুখ নামের একটি নাটক ছিলো (নাট্যকারের নাম নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগায় নাম উল্লেখ করা হলো না)। এটাতে অভিনয় করেও ভালো লেগেছে। আর মিডিয়ায় এসে তো প্রচুর নাটকে প্রচুর চরিত্রে অভিনয় করেছি। অনেক চরিত্রই এনজয় করেছি। তারপরও মনে হয় সেই ক্যারেক্টারগুলোকে আরো অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যেতো। সালাউদ্দীন লাভলুর ‘ঘরকুটুমের’ একটা ক্যারেক্টার এনজয় করলাম। ফোর টোয়েন্টির ক্যারেক্টারটাও এনজয় করেছি। লং মার্চের ক্যারেক্টারটাও খুবই এনজয় করেছি। লং মার্চে অভিনয় করার সময় আমার মনে হয়েছে যে, অন্য ধরনের একটা চরিত্রে অভিনয় করছি। তারপর ‘তোমার দয়ায় ভালো আছি মা’নামের একটা নাটকের চরিত্রটাকে খুব এনজয় করেছি।

ব্যক্তি মোশাররফ করিম এবং অভিনেতা মোশাররফ করিম এই দুই সত্তাকে কিভাবে দেখেন?
দুটো সত্তাই এক। একাকার।

কিভাবে একাকার?
অভিনেতা মেশাররফ করিম কখনোই ব্যক্তি মোশাররফ করিম থেকে আলাদা হয়ে যান না। সম্ভবও না। কেননা অভিনয়ের যে চরিত্র তাকে রূপ দিচ্ছে কে? ব্যক্তি মোশাররফ করিম। আর সেই চরিত্র রূপদিতে গিয়ে তাকে অবজার্ভ করতে হচ্ছে। এই অবজার্ভারও কিন্তু ব্যক্তি মোশাররফ করিমই।
আপনি তো বিকল্প ধারার ফিল্মে অভিনয় করেন। তো ফিল্মের এই বাণিজ্যিক ধারা ও মূল ধারার পৃথকীকরণের বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন?
চলচ্চিত্রের ধারা তো বহুভাগেই হতে পারে, সেটাকে মোটাদাগে মানুষ দুইভাগে ভাগ করছে মূল ধারা বা বাণিজ্যিক ধারা। আসলে একেকটা পরিচালকেরই তো একেকটা ধারা। সেই জায়গায় মূল ধারা বা বিকল্প ধারা না, বরং ভাল ছবি হওয়া দরকার। ভাল নির্মাতা, শিক্ষিত নির্মাতার প্রয়োজন। শিক্ষিত নির্মাতা বলতে, যে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি ভালভাবে বোঝে, জানেন যে সিনেমাটি কেমন করে বানাতে হয়। ভাল গল্প ভাল চরিত্র। আমার বিকল্পধারা বা মূল ধারার চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো যায় আসে না। আমি মনে করি ছবিটা ভাল হতে হবে।

পর্দায় মোশাররফ করিম একজন মজার মানুষ, বাস্তবের মোশাররফ করিম কতটা মজার?
কোনো ক্যারেক্টারই ফানি না। হিউমার থাকাটা একটা বড় ব্যাপার। যে অ্যাক্টরের ভেতর সেই হিউমারটা নেই সে আসলে টোটাল অ্যাক্টর না।

বর্তমানে মানুষ আপনাকে যেভাবে দেখছে, কমেডিয়ান চরিত্রে। অভিনয়ের ক্ষেত্রে আপনার যে ঢংটি দাঁড়িয়ে গেছে। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো ইচ্ছা আছে কি না?
বহুবার বের হয়ে এসেছি। তবে কোনোকিছুর ভেতরে ঢোকা বা বেরিয়ে যাওয়া কোনোকিছুতেই আমার কোনো তাড়াহুড়া নেই। আর ঘুরেফিরে টেলিভিশনের দর্শক আনন্দটা পছন্দ করে। সবকিছুতেই আনন্দ চায়। ক্লাসিক নাটকেও তাই চায়। দু:খের ভেতর দিয়েও দর্শক আসলে আনন্দটা দেখতে চায়। তবে এক ঘন্টার নাটকগুলোতে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী কাজ করা হয়। আবার যখন ঈদ আসে তখন এক ঘন্টার নাটকগুলোও হাস্যরসাত্বক হয়ে যায়। নির্মাতা চ্যানেল সবাই ঐ ধরনের নাটক চায়। আরেকটা কারন হচ্ছে বানিজ্যিকভাবেই হাস্যরসাত্মক নাটকগুলোর চাহিদা বেশি আর যেহেতু নির্মাণটা আমি করি না সেক্ষেত্রে সেরকম স্ক্রিপ্ট আসলে অবশ্যই করবো। আমি তো আসলে অভিনেতাই।

ব্যক্তি মোশাররফ করিমের দোষগুণ ?
আমার গুণ বেশি চোখে পড়ে না। দোষ তো অনেক। আমি টেলিফোন অপছন্দ করি। দেখা গেছে যে আমি বই পড়ছি বা কিছু ভাবছি সেই সময়ে চট করে ফোন রিসিভ করতে পারছি না। কারণ ঐ সময়ে আমি যে আবেগের মধ্যে থাকি তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না । তো সেলফোন আবিষ্কার না হলে আমি আমার চরিত্রের এই দোষটি বুঝতে সক্ষম হতাম না। অথবা মানুষ পরিবর্তিত পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, আমি সেটা পারি নি। মনে করি পরে ফোন করবো। কিন্তু পরে ফোন করা হয় না কারণ আরেকটি দোষ যে আমি ভুলে যাই।

পর্দার চরিত্রটাকে আপনি বাস্তবের মতো করে ফুটিয়ে তুলেন। অভিনয় জাদুতে মোহাবিষ্ট করেন দর্শককে। এই জাদুর রহস্য কোথায়?
কিছুনা কিছু জাদু সবার ভেতরেই থাকে। সেটা একটা ভাল মিষ্টির কারিগরের ভেতরেও থাকে। সে জন্যই আর দশজনের চেয়ে তার মিষ্টিটা ভাল হয়। সেই জাদুটা কি সেটা বোধ হয় সে নিজেও জানে না। আমার ভেতরের ম্যাজিকটা কি তা আমিও জানি না। তবে জাদুর রহস্য না জানলেও আমি ছোটবেলা থেকেই অভিনয়টাকে ভালবেসেছিলাম। আমার ভালবাসার পেছনে দীর্ঘদিন লেগেছিলাম। তারই ফলে এটা সম্ভব হয়েছে।

তরূণরা আপনাকে আইডল মনে করে, আপনার মতো হতে চায়, আপনার আইডল কে?
আমি অমুক হতে চাই- এরকম কোনো টার্গেট আমার কখনোই ছিলনা। আমার কোনো আইডল নেই। আর ঐ তরুণদের জন্য আমি বলবো, ওরা যেন ওদের মতো হয়। মোশাররফ করিম হয়ে ওঠার কিছু নাই। প্রথমত তাকে তার ভেতরটাকে আবিষ্কার করতে হবে। এরপর সেই স্বপ্নের জায়গায় পৌঁছানো। বেশিরভাগ মানুষ অস্থিরতা আর লোভের কারণে তার ভালোলাগাটা আবিষ্কার করতে পারে না। অসংখ্য মানুষ আছে যারা তার কি ভালো লেগেছিলো তা না জেনেই মরে গেছে।