Sports Image

কালের বিবর্তনে ক্রিকেট



প্রায় ৭০০ বছর আগের কথা।যেটা সম্ভবত তের শতকে।তবে সঠিক সাল বা তারিখটির কথা কারো কাছে নেই।কবে,কোথায়,কিভাবে এটির আবির্ভাব হলো তার কোন ইতিহাস সঠিকভাবে পাওয়া যায়নি।

বাংলাতে একটি প্রবাদ আছে,“জন্ম হোক যথা যথা কর্ম হোক ভালো’’। সুতরাং ক্রিকেটের জন্ম নিয়ে এত পানি ঘোলা করে লাভ নাই তাই কাজের কথায় ই আসা যাক। বর্তমান বিশ্বে ক্রিকেট খেলার জনপ্রিয়তা কেমন তা বলার উপেক্ষা রাখেনা।তবে এটার জনপ্রিয়তা আগে এমন ছিলনা।তের শতকে ক্রিকেটের জন্মের পরেও এটা বিস্তার পেতে অনেক সময় নিয়েছে।এর ভিতরে রয়েছে অনেক উত্থান-পতন।ক্রিকেট নিষিদ্ধ ছিলো অনেকদিন।১৩০০ সালে ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা এডওয়ার্ড এর আমলে একটি বইতে ক্রিকেট খেলার তথ্য পাওয়া যায়।খেলাটির সুত্রপাত হয় ইংল্যান্ডের কেন্টের নিউয়েন্ডনে।তার পরবর্তী ২০০ বছর ক্রিকেটের কোন খবর পাওয়া যায়নি।

১৫০৯ সালে আবারো ক্রিকেট খেলা শিরনামে উঠে আসে।তখন এই খেলাটি মানুষের মাঝে জুয়া খেলার মত রুপ নেয়।তখনকার সময়ে লোকজন কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে দিনরাত ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকতো।ফলে রাজা এডওয়ার্ড ক্রিকেট খেলা বন্ধ করে দেয়।তবে ক্রিকেট খেলা বন্ধ করে দিলেও কে শোনে কার কথা? রাজার সেনাদের চোঁখ ফাঁকি দিয়ে সবাই গহীন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে আবার শুরু করে ক্রিকেট খেলা।কিন্তু একদিন রাজার মান ভাঙ্গলো নিষিদ্ধ ক্রিকেট আবার চালু হল ইংল্যান্ডে।এরপর ক্রিকেট ছড়িয়ে যেতে থাকে বহিরঃবিশ্বে।


১৯০৫ সালে এফএ কাপ ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় যে মাঠে

১৭১০ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্য একটি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।১৭১৯ সালে প্রথম কাউন্ট্রি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।১৭৪৪ সালে ক্রিকেটের কিছু আইন প্রনয়ন করা হয়।সেই সময়ে ২টি স্টাম্প ও ১ টি বেল ব্যাবহার করা হত।তবে ১৭৮৫ সাল থেকে ৩ টি স্ট্যাম্প ও ২ টি বেল ব্যাবহার করা শুরু করে।১৭৪৪ সালে ৪ বলে ওভার চালু ছিলো কিন্তু ১৮৮৭ সালে অষ্ট্রলিয়ায় ৬ বলে ওবার চালু করা হয়।১৮৮৯ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে ৫ বলে ওভার খেলা হলেও ১৮৯০ সালে ৬ বলে ওভার কর হয়।১৯১৮ সালে অষ্ট্রলিয়ায় ৮ বলে ওভার করা হয়,পরবরতি ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডে ৮ বলে ওভার চালু হলেও পরে সবাই ৬ বলের ওভারে ফিরে আসে।১৭৪৪ সালে নো বলের সিস্টেম চালু থাকলেও ১৮২৯ সাল থেকে নো বলের জন্য ১ টি বল এবং ১ রানের জরিমানা আইন চালু হয়।১৮৮৯ সালে ইনিংস ডিক্লেয়ার সিস্টেম চালু করা হয় ও ১৭৮৭ সালে এল্বিডব্লিউ আউট আইন চালু করা হয়।১৯৮০ সাল থেকে ক্রিকেটের ৪২ টি আইন চালু হয়ে আসছে।

১৭৪০ সালে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ক্লাব “হ্যাম্বল্ডন” প্রতিষ্ঠিত হয় তবে ১৭৮৭ সালে মেরিলিবন ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ক্রিকেট আরো সক্তিশালি হয়ে ওঠে।সাধারন ক্রিকেট থেকে আজকের জনপ্রিয় ক্রিকেট হয়ার প্রধান ভুমিকায় ই ছিলো এই মেরিলিবন ক্রিকেট ক্লাব।

এরই মধ্যে ক্রিকেট খেলা ইংল্যান্ড ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন ছড়িয়ে পড়ছিলো।অস্ট্রোলিয়া, দঃআফ্রিকা, কানাডা, এমেরিকা,নিউজিল্যান্ডসহ আরো অনেক দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এই দেশগুলোতে ক্রিকেট চর্চা হতে থাকে।

১৮৫৯ সাল থেকে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সফর শুরু হয়।ইংল্যান্ড দল এমেরিকা ও কানাডা সফর করে.২ বছর পর ইংল্যান্ড দল আবার অস্ট্রোলিয়া সফর করে। এভাবেই ক্রিকেট আজকের মত বিস্তার লাভ করে।ইংল্যান্ডকে “Father of Cricket” এবং অস্ট্রোলিয়াকে “Mother of Cricket” বলা যেতে পারে।

১৮৮৭ সালে টেস্ট ক্রিকেটের সুত্রপাত হয়।এতে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রোলিয়া দল মুখোমুখি হয়।খেলাটি হয় মেলবোর্নে।যেখানে ৪ দিন মিলিয়ে ২০৫০০ দর্শক উপস্থিত থাকে।

১৯০৯ সালে ICC এর জন্মলগ্ন থেকেই ৩ টি দল তাদের সদস্যপদ লাভ করে।এরা হলো ইংল্যান্ড,অস্ট্রোলিয়া ও দঃআফ্রিকা.১৯১৪ সালের ১ম বিশ্বযুদ্ধের কারনে থেমে যায় ক্রিকেট।এরপর ১৯২৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ,ভারত নিউজিল্যান্ড ও ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান,১৯৮১ সালে শ্রীলংকা,১৯৯২ সালে জিম্বাবুয়ে এবং সর্বশেষ ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্ট খেলার মর্যাদা লাভ করে।

একদিনের ক্রিকেট চালু: আগে টেস্ট খেলার নির্দিষ্ট কোনো দিন ছিলোনা।১৯৩৯ সালে ইংল্যান্ড বনাম দঃআফ্রিকার মধ্যকার ডারবান টেস্ট ১০ দিনেও শেষ না হওয়ায় ড্র ঘোষনা করে আম্পায়ারেরা.১৯২৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইংল্যান্ডের মদ্যকার একটি টেস্ট ৯ দিনেও শেষ হইনি আবার ১৯২৮ সালে অস্ট্রোলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার টেস্ট ৮ দিনেও শেষ হয়েছিলোনা। এতে করে সাধারন দর্শকদের ভিতরে একটু ক্লান্তিকর লাগছিলো এবং ক্রিকেট থেকে আগ্রহ কমে যাচ্ছিলো।

১৯৫৬ সালে মেরিলিবন ক্রিকেট ক্লাব একদিনের ক্রিকেট চালু করার কথা মাথায় আনে.১৯৬৩ সালের “জিলেট কাপ” নামক একটি নকআউট ক্রিকেট প্রতিযোগিতা আয়জন করে।

১৯৭১ সালে ইংল্যান্ড দল অস্ট্রোলিয়া সফর করে। বৃষ্টির কারনে ঐতিহাসিক মেলবোর্ন টেস্ট পরিত্যাক্ত করা হয়,কিন্তু এই খেলা দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ অনেকটা হতাশ হন ।কারন টাকা দিয়ে তারা টিকিট কেটেছে খেলা দেখার জন্য আর সেই খেলাই দেখতে পারলোনা তারা!এই সময়ে মেলবোর্নে ৪০ ওভারের একটি ODI ম্যাচ খেলার আয়জোন করা হয়(বিঃদ্রঃ তখন ৮ বলে ওভার ছিলো).১৯৭১ সালের ৫ জানুয়ারী ইতিহাসের প্রথম ODI ম্যাচ খেলা হয় মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।টেস্টের পাশাপাশি ওডিয়াই ম্যাচেও জয় পায় অস্ট্রোলিয়া। এই ম্যাচে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ পান “জন এড্রিচ”।এই ম্যাচে প্রচুর টাকা আয় করার কারনে একদিনের খেলাটি চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে আইসিসি।

১৯৭২ সালে ১৭টি প্রথম শ্রেনীর কাউন্ট্রি দল নিয়ে একটি একদিনের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। এই টুর্নামেন্টের প্রধান স্পন্সর পায় বর্তমানের জনপ্রিয় সিগারেট কম্পানি “বেন্সন এন্ড হেজেস”।

১৯৭৩ সালের ২৫ ও ২৬ জুন লর্ডস এর বৈঠকে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।এই সিদ্ধান্তের মোতাবেগে ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপের আসর বসে ইংল্যান্ডে। আইসিসি এর ৬ টি পূর্ণ সদস্য দেশ ইংল্যান্ড,অস্ট্রোলিয়া, ,নিউজিল্যান্ড,ভারত,পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ২ টি সহযোগি দেশ পূর্ব আফ্রিকা ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে মোট ৮ টি দলের অনশগ্রহনে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়ন হয়।

১৯৮৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ পদার্পণ করে এশিয়া কাপের মাধ্যমে।

১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখলেও আজকের শক্তিশালী দঃআফ্রিকা কিন্তু ওডিয়াই ক্রিকেট এ যাত্রা শুরু করে ১৯৯১ সাল থেকে।আর এত পরে দঃআফ্রিকার ওডিয়াই তে আসার প্রধান কারন হল নির্বাসন।১৯৬১ সালে দঃআফ্রিকা কমনওয়েলথ ত্যাগ করলে তৎকালীন ইম্পেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্স(ICC) এর সদস্যপদ থেকে নির্বাসন করা হয়।১৯৬৪ সালে আইইসিস্র নিয়ম পরিবর্তন করা হয়।এজন্য অন্যান্য সহযোগী সদস্যদেরকে মর্যাদা দেওয়া হয় ।কিন্তু দঃআফ্রিকা সেই সময় কনো আবেদন করেনি।১৯৪৮ সালে প্রবর্তিত বর্ণবাদের আইনের কারনে শ্বেতাঙ্গ(কালো,ভারতীয়)কোনো খেলোয়াড়কে দঃআফ্রিকার পক্ষে টেস্ট খেলার বিধি-নিষেধ আরোপ করাব হয়।আর এই বর্ণবাদ আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে ১৯৭০ সালে আইসিসি দঃআফ্রিকার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

ক্রিকেটের নতুন সংস্করন টি টুয়েন্টিঃ ২০০৫ সালে ক্রিকেটের এই নতুন ও ক্ষুদ্র সংস্করনের অভিষেকের পর থেকে ক্রিকেট মাঠ প্রানবন্ত ও উপচে পড়ে দর্শক।বিগ ব্যাশ,ফ্রেইন্ড লাইফ টি টুয়েন্টি, আইপিএ,বিপিএল, এসএলপিএল,পিসিএল,ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট লীগ ইত্যাদির মাধ্যমে ক্রিকেট মাঠ প্রানবন্ত হয়ে উঠেছে,ক্রিকেট সবাই উপভোগ করছে।২০০৭ থেকে শুরু হয় টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ এর আসর।ভারত প্রথমাসরেই শিরোপা জয়লাভ করে।এছাড়াও বিভিন্ন দেশের টি-টুয়েন্টি লীগের চ্যাম্পিয়ন দলদের নিয়ে প্রতিবছর ই আয়োজন করা হচ্ছে চ্যাম্পিয়ন লীগ টি-টুয়েন্টি।





উপরের সকল আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম শুরু থেকে ক্রিকেট এর ইতিহাস হয়েছে অনেক উত্থান-পতনের মাধ্যমে।একেবারেই বলা যায় “কালের বিবর্তনে ক্রিকেট”