Entertainment Image

জীবনের জয়গানে একজন চলচ্চিত্র যোদ্ধা ঋত্বিক ঘটক



বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বরণীয় নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক। মৃনাল সেন ও সত্যজিত রায়ের সমান ভাবা হয় তাকে। জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধই তার চলচ্চিত্রের অংশ। তার সব চলচ্চিত্রও তাই জীবনের জয়গানই গেয়েছে। এই বিখ্যাত নির্মাতার জন্ম কিন্তু বাংলাদেশেই। পুরোনো ঢাকার জিন্দাবাজরে তার জন্ম। ১৯২৫ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ৪৭ এ দেশে ছেড়ে তার পরিবারকেও কলকাতায় পাড়ি জমাতে হয়। সেখান থেকে তিনি ইংরেজিতে অনার্স করেন। যদিও ফাইনাল পরীক্ষা দেননি।

ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির আন্দোলনের ফসল হিসেবে ১৯৫০ সালের শুরুতে কলকাতায় শুরু হয় বিশ্বের ধ্রুপদ এবং অন্যান্য ভালো ছবি দেখানো। এসময় তিনি ছবি নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেন এবং বুঝতে পারেন জনমানুষের বড় অংশের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার চলচ্চিত্র। এই বোধ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সেলুলয়েড দুনিয়াতে প্রবেশ ঘটে ঋত্বিক ঘটকের। এই ছবিতে তিনি একই সাথে অভিনয় করেন এবং সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেন।

তার সর্ব প্রথম ছবি সৃষ্টি 'নাগরিক'। ১৯৫২ সালে তার একক পরিচালনায় তৈরি হয় চলচ্চিত্রটি। তবে সেটি তার জীবদ্দশায় মুক্তি পায় নি। তার দ্বিতীয় ছবি ‘অযান্ত্রিক’ খুব ভাল ব্যবসা করে। ফলে তিনি রাতারাতি একজন সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

জীবদ্দশায় তিনি একজন সংগ্রামী ব্যক্তি। সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, দেশ ভাগ। সরকারের হাতের পুতল, যান্ত্রিক জীবন সব কিছই তাকে অনেক কষ্ট দিতো। সমাজের শোষন নিপিড়নের বিরুদ্ধে সারাজীবনই সোচ্চার ছিলেন তিনি। তাই সত্যজিতও বলেছিলেন, ঋত্বিকের ভিতর সত্যিকারের শিল্পীর যন্ত্রণা ছিলো এবং তিনি আসলেই অনেক বড় মানের নির্মাতা।

আর এসব কারণেই তিনি তার শিল্পের মাধ্যম চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে সেই কষ্ট যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলতেন। তাকে বলা হয় শিল্পীর শিল্পী। তিনি কখনো ভদ্রতার তোয়াক্কা করতেন না। কোন মুখোশ পড়তেন না। যা কিছু বলতে হয় সরাসরি বলতেন। তবে সব সময় অত্যধিক মদ পান করতেন।

শরণার্থী নিয়ে তার ত্রিলোজি সিনেমা 'মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০) ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ও ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২)। তার 'কোমল গান্ধার' ও 'সুবর্ণরেখা' ছবি দুটি ব্যবসা সফল না হওয়ায় তিনি প্রায় ৭/৮ বছর সিনেমা বানাতে পারেননি।

তখন তিনি বলতেন, ‘ছবি লোকে দেখে। ছবি দেখানোর সুযোগ যতদিন খোলা থাকবে, ততদিন মানুষকে দেখাতে আর নিজের পেটের ভাতের জন্য ছবি করে যাবো। কালকে বা দশ বছর পরে যদি সিনেমার চেয়ে ভালো কোনও মিডিয়াম বেরোয় আর দশবছর পর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাবো। সিনেমার প্রেমে নেশায় আমি পড়িনি। আই ডু নট লাভ ফিল্ম’।

এরপর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এসে নির্মাণ করেন তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র 'তিতাস একটি নদীর নাম'। এটি ভারত বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস থেকে নেওয়া এ ছবিটি পেয়েছিল ব্যাপক প্রশংসা। এ ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করেন বাংলাদেশের শক্তিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র। প্রবীর মিত্র ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে এভাবেই স্মৃতিচারণা করেন -‘এই মাকড়া, এই ছোঁড়া এদিকে আয়—এই সব বলেই তিনি (ঋত্বিক) আমাকে ডাকতেন। কখনোই আমার নাম ধরে ডাকতেন না। বলতেন, এডিটিংয়ের সময় তুই আসিস। তোর সঙ্গে আমার কথা আছে। আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তিনি কিছুই বলেন না।কাজের ভেতরেই ডুবে থাকেন। মুখ তুলেন না। ঋত্বিক-দা চলে গেলেন। তাঁর না-বলা কথাটা আমার আর শোনা হয়নি।’
এরপর ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিকের সর্ব শেষ ছবি 'যুক্তিতক্ক আর গপ্পো'। কাহিনীর ছলে তিনি নিজের কথা বলে গেছেন এ ছবিতে। এটা অনেকটা নিজের বায়োগ্রাফী টাইপ ছবি। যার মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক মতবাদকেও দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন।

ঋত্বিক যে মাপের নির্মাতা ছিলেন সেই মানের কোন সম্মান তিনি পাননি সত্যি। অনেক দিন তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন মানসিক হাসপাতালে। ১৯৭৬-এর ৬ই ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫০ বছর বয়সে চলচ্চিত্রের এই মহামানব পশ্চিম বঙ্গের কলকাতায় পরলোকগমন করেন। ইহজগৎ থেকে তিনি ছুটি নিলেও, তাঁর সৃষ্টি ছবিগুলো আজও চলচ্চিত্র জগতের সম্পদ।

তার চলচ্চিত্রের তালিকা
পরিচালনা
নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭) অযান্ত্রিক (১৯৫৮) বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮) মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) কোমল গান্ধার (১৯৬১) সুবর্ণরেখা (১৯৬২) তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩) যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭)

কাহিনী ও চিত্রনাট্য
মুসাফির (১৯৫৭) মধুমতী (১৯৫৮) স্বরলিপি (১৯৬০) কুমারী মন (১৯৬২) দ্বীপের নাম টিয়ারং (১৯৬৩) রাজকন্যা (১৯৬৫) হীরের প্রজাপতি (১৯৬৮)

অভিনয়
তথাপি (১৯৫০) ছিন্নমূল (১৯৫১) কুমারী মন (১৯৫২) সুবর্ণরেখা (১৯৬২) তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭২) যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭)

শর্টফিল্ম ও তথ্যচিত্রের তালিকা
দ্য লাইফ অফ দ্য আদিবাসিজ (১৯৯৫) প্লেসেস অফ হিস্টোরিক ইন্টারেস্ট ইন বিহার (১৯৫৫) সিজার্স (১৯৬২) ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান (১৯৬৩) ফিয়ার (১৯৬৫) রঁদেভু (১৯৬৫) সিভিল ডিফেন্স (১৯৬৫) সায়েন্টিস্টস অফ টুমরো (১৯৬৭) ইয়ে কওন (হোয়াই / দ্য কোয়েশ্চন) (১৯৭০) আমার লেলিন (১৯৭০) পুরুলিয়ার ছৌ (দ্য ছৌ ড্যান্স অফ পুরুলিয়া) (১৯৭০) দুর্বার গতি পদ্মা (দ্য টার্বুলেন্ট পদ্মা) (১৯৭১)

অসমাপ্ত ছবি ও তথ্যচিত্রের তালিকা
বেদেনি (১৯৫১) কত অজানারে (১৯৫৯) বগলার বঙ্গদর্শন (১৯৬৪-৬৫) রঙের গোলাপ (১৯৬৮) রামকিঙ্কর (১৯৭৫)