Travel Image

কীর্তিমানের আঙ্গিনা : নারায়ণগঞ্জের চৌধুরীপাড়া



অনেকেই বলেন, ঘুরে আসুন রাজধানী ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমের পাশের এলাকার চৌধুরীপাড়া গ্রাম থেকে। কি আছে এ চৌধুরী পাড়া গ্রামে! কেনইবা এখানে পশ্চিমবঙ্গের(ভারতের) সাবেক মূখ্যমন্ত্রী ও কমিউনিস্ট পার্টির বর্ষীয়ান নেতা সময়-সুযোগ পেলেই ছুটে আসতেন। এমনকি মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও তিনি কেনইবা এখানে আসার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন? কেনইবা ভারতের রাইটার্স বিল্ডিংয়ের রিসিপশনে গিয়ে কোনও ব্যক্তি বারদীর পরিচয় দিলে নিরাপত্তারক্ষীরা যথাযথ সম্মানের সঙ্গে দোতলার মুখ্যমন্ত্রীর কক্ষে পৌঁছে দিত। এমন হাজারো প্রশের উত্তর জানতে ঘুরে আসুন সেই গ্রামের আলোচিত বাড়ি থেকে।

কারণ, বর্ষীয়ান নেতা জ্যোতি বসুর পৈতৃক বাড়ি। ভারতের পশ্চিবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং কিংবদন্তি নেতার শৈশব কাটে এ গ্রামে। এখানে আসলে দেখতে পাবেন এই বাড়ির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কিংবদন্তি নেতার শৈশব ও কৈশোর স্মৃতি। ২ একর ৪ শতক বাড়িটির মধ্যে রয়েছে ৮৭ বছরের পুরাতন একটি দ্বিতল ভবন। একটি পুকুর ও একটি কুয়া। বাড়ির দোতলা এ ভবনটির দেয়ালের নামফলক থেকে জানা যায় এটি ১৩২৯ বাংলা সনের ১৩ অগ্রহায়ণ তারিখে পাচু ওস্তাগারের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়। অসাধারণ এ দ্বিতীয়তলা ভবনটির নিচতলায় রয়েছে দুটি শোবার ঘর ও একটি বৈঠকখানা। দ্বিতীয়তলায়ও রয়েছে দুটি শোবার ঘর। রয়েছে একটি বেলকুনি। ভবনের ছাদ থেকে এক অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। দক্ষিণে তাকালে প্রমত্তা মেঘনা নদী আর চারদিকে কেবলই সবুজের সমারোহ। মূলত এ বাড়িটির মালিক ছিলেন জ্যোতি বসুর নানা শরৎচন্দ্র দাস ও স্ত্রী খিরদা সুন্দরী। শরৎচন্দ্র দাস ও স্ত্রী খিরদা সুন্দরীর একমাত্র মেয়ে হেমলতা বসুকে স্থানীয় নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ডা. নিশিকান্ত বসু বিয়ে করার সুবাদে এ বাড়ির মালিক হন। ডা. নিশিকান্ত ও হেমলতা বসুর তৃতীয় সন্তান জ্যোতি বসু। শৈশবের কিছুটা সময় তিনি তার পৈতৃক বাড়ি বারদীতে কাটিয়ে ছিলেন।

বৃক্ষের প্রতি তার অনেক আগ্রহ ছিল। তার হাতে রোপণ করা বিভিন্ন ফলদ ও ভেষজের মধ্যে আমগাছ, তালগাছ ও শিমুল গাছগুলো তার স্মৃতিকে তাড়া করছে। কলকাতায় পড়ালেখার ফাঁকে ছুটে আসতেন এখানে। জ্যোতি বসু যখনই বারদীতে আসতেন তখন তার সেবাযত্নের কাজ করেছিলেন আয়াতুন নেছা নামে একজন । পাশাপাশি আয়াতুন নেছার স্বামী ফকির মাহমুদ কলকাতা শহরে অবস্থিত জ্যোতি বসুর পিতা ডা. নিশিকান্ত বসুর একটি তেলের কারখানায় চাকরি করতেন। সে সুবাদে এ মুসলিম পরিবারটির সঙ্গে জ্যোতি বসুর পরিবারের একটি আত্র সম্পর্ক তৈরি হয়। জ্যোতি বসুর পরিবার কলকাতায়ই বেশি থাকতেন। তাই বাড়িটির দেখাশোনার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে ফকির মাহমুদের পরিবারকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সে থেকে ফকির মাহমুদের পরিবার জ্যোতি বসুর এ বাড়িটিতে বসবাস করে আসছেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর জ্যোতি বসুর পিতামহের এ বাড়ির ভবনটি ছাড়া অন্যসব জমিদারদের পাকা দালান প্রাসাদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

জ্যোতি বসু ১৯৮৭ সালের ৩০ জানুয়ারি তার স্মৃতিমাখা বারদী চৌধুরী পাড়া গ্রামের সেই পৈতৃক বাড়িটি দেখতে আসেন। এসময় তার সঙ্গী ছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী মিজানুর রহমান এবং জ্যোতি বসুর স্ত্রী বাসন্তি ঘোষ (কমলা বসু) ও ছেলে চন্দন বসু । জ্যোতি বসু সর্বশেষ বারদীতে তার পৈতৃক বাড়িতে আসেন ১৯৯৭ সালে তখন তার সফরসঙ্গী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের উপ-মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য ও অর্থমন্ত্রী অসীম দাস গুপ্ত। জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময় দুবারই তার পৈতৃক ভিটে বারদীতে এসে বাল্যবন্ধুদের খোঁজখবর নিয়েছিলেন এবং ভবনের দ্বিতীয় তলার শয়নকক্ষে দীর্ঘক্ষণ বসে অতীতের স্মৃতিচারণ করেন। এ ছাড়াও ২০১০ সালের শুরুর দিকে জ্যোতি বসু তার পৈতৃক বাড়িতে আসার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আসতে পারেননি। সরকার ইতিমধ্যে জ্যোতি বসুর এ প্রাণপ্রিয় স্মৃতিমাখা বাড়িটিকে সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তার একটি আধুনিকমানের লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা। জ্যোতি বসুর পৈতৃক বাড়িতে আসতে হলে চলে আসতে হবে বারদীর চৌধুরী পাড়া গ্রামে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর থেকে বাসে করে ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম এলাকায় আসবেন। আশ্রম এলাকা থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত বাড়িটিতে হেঁটেও যেতে পারেন অথবা রিকশায় করে ৫ ভাড়া নেবে।