Travel Image

পুরনো ঢাকার আর্মেনীয় গির্জা ও একজন শেষ আর্মেনীয়ান



পুরনো ঢাকার আর্মেনিয়ান গির্জা, এক ঐতিহ্যমন্ডিত আর স্মৃতি বিজড়িত স্থান। আর্মানিটোলায় অবস্থিত এই গির্জায় এক সময় প্রচুর লোকের সমাগম হতো। এখানে মূলত আর্মেনিয়ান অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের মানুষজনই বেশি আসতেন, যারা এই এলাকাতেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু কালক্রমে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে। আর আজ অনেক অনেক বছর পর পুরনো এই গির্জাতে সেই আর্মেনিয়ান সম্প্রদায়ের একজন মাত্র ব্যক্তিই রয়েছেন।
১৭৮১ সালে আর্মেনিয়ান এপোস্টলিক চার্চের অধীনে এই গির্জাটি নির্মিত হয়, যা কিনা বিশ্বের প্রাচীনতম জাতীয় গির্জা হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ সরকারের স্থাপত্য বিভাগের আওতাভুক্ত একটি গুরত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। এর রক্ষণাবেক্ষণ কাজে এখন একজন মাত্র ব্যক্তিই রয়েছেন, যার নাম মাইকেল জোসেফ মার্টিন। এখানে এখন দর্শনার্থী তেমন আসে না বললেই চলে। যেকারণে গির্জাটিও বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিও পালিত হয় কালেভদ্রে।

মার্টিন ১৯৪২ সালে তার বাবার পথ অনুসরণ করে এদেশে আসেন। আর যেসব আর্মেনীয়রা এই গির্জার দেখভাল করতেন হয়তো তাদের মাঝে তিনিই সর্বশেষ ব্যক্তি। মার্টিন এই প্রাচীন গির্জা আর তৎসংলগ্ন কবরস্থান দেখাশোনা করেন। এতে রয়েছে ৪০০ টি কবর-যার মাঝে একটি মার্টিনের প্রিয়তমা স্ত্রীর। বিশাল এই গির্জাতে মার্টিন একাই থাকেন। মাঝে মাঝে কানাডাতে তার মেয়েদের দেখতে যান।
তিনি জানেন না, তার মৃত্যুর পর কে এই গির্জার দেখাশোনার ভার নেবে। ২০০৯ সালে এএফপি-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,হয়তো তার তিন মেয়ের কোন একজন এই দায়িত্ব নিতে পারে। আর এর সাথে বেঁচে থাকবে আর্মেনীয়দের স্মৃতি। কিংবা তাঁর বিশ্বাস পৃথিবীর অন্য কোন প্রান্ত থেকে আর্মেনীয়রা এসে গির্জার দায়িত্ব নেবেন। মার্টিন বলেন, ইশ্বর কখনোই এরকম একটি স্থানকে অরক্ষিত আর অযত্নে পড়ে থাকতে দিতে পারেন না। স্থানীয় এলাকাবাসীও এরকমই মনে করেন।
পুরনো ঢাকার আরমানিটোলা রোডে অবস্থিত এই গির্জার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই এই বিশাল দরজায় লাগানো তালাটি আপনাকে স্বাগত জানাবে। এর ভেতরে কেউ আর এখন ঢোকেই না। ভেতরটা একদম জনমানবশূন্য। নেই গির্জার ঘন্টাধ্বনি কিংবা পাদ্রীর মুখ থেকে বাইবেলে বর্ণিত ইশ্বর, যীশু আর পবিত্র আত্মার কাহিনী ভেসে আসার শব্দ। যে কারোরই গির্জাতে ঢুকতে বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। খ্রিস্ট ধর্মের বড় ধর্মীয় উৎসবের সময়ই এখানে কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ইতিহাস বলছে, সপ্তদশ শতকের কোন এক সময়ে আর্মেনীয়রা বাংলাদেশে আসে। এসময় তারা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে দক্ষিন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা প্রথমে ভারতের কলকাতা ও দিল্লীতে ব্যবসা শুরু করে। এরপর তারা বাংলাদেশের ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে যায়। তাদের মূল ব্যবসা ছিল মশলা, রত্ন-পাথর, মসলিন,সিল্ক ইত্যাদি। ধর্ম আর্মেনিয়দের জীবনের অংশ ছিল, তাই তারা যেখানেই যেত প্রয়োজনমত গির্জা বানিয়ে নিত। আর্মানিটোলা সেসময় ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল। যখন এই গির্জাটি তৈরি হয়, তখন চলছে দোর্দন্ড প্রতাপশালী মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্ব।
গির্জাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, এর পশ্চিম দিকে একটি টাওয়ার, যাতে ছিল বিশাল এক ঘড়ি। এতোটাই বিশাল যে এটি নারায়ণগঞ্জ থেকেও দেখা যেত। ১৮৯৭ সালের এক ভূমিকম্পে টাওয়ারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঘড়িও নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে একটি ছোট টাওয়ার বানানো হয়, যাতে কোন ঘড়ি ছিল না। এক কথায় আজো এক ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন এই আর্মেনীয় গির্জা।