Travel Image

\"বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান\" সোমপুর মহাবিহার



পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর বিহার নওগাঁ জেলার বাদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর নামক গ্রামে অবস্থিত। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের দূরত্ব নওগাঁ জেলা সদর থেকে ৩২ কিলোমিটার। এই বিহার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে ব্যাপক পরিচিত। পরিপাটি এই বিহারের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক প্রাচীন নিদর্শন। বিহারের মূল ভবনে ১৭৭ টি কক্ষ ছিল এবং এখানে প্রায় ৮০০ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু বসবাস করতে পারতেন। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এই বিহারকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) এর মর্যাদা দেয়। ইউনেস্কো ঘোষিত তালিকায় এই পাহাড়পুর বিহারকে ৩২২তম বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


পূর্বের ইতিহাসঃ
অষ্টম শতকের শেষের দিকে অথবা নবম শতকে পালবংশের রাজা শ্রী ধর্মপাল (৭৮১-৮২১) পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার তৈরি করেছিলেন। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের আরেক নাম সোমপুর বিহার বা সোমপুর মহাবিহার। উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের পর তারা সবখানে জরিপ কাজ শুরু করে। জরিপ কাজ পরিচালনার সময় বুকানন হ্যামিল্টন এবং পরে ওয়েস্টম্যকট পাহাড়পুর পরিদর্শন করে ফিরে গিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পাহাড়পুরের কথা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এই স্থান খননের আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু তৎকালীন বলিহারের জমিদার তাকে এই কাজে বাঁধা দেন। তারপরও তিনি অল্প কিছু স্থান খনন করেন। ফলে পাহাড়পুরের মাথার দিকের ২২ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি ইমারত আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে এটি ১৯১৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননঃ
ব্রিটিশ যুগে কয়েকবার এই পাহাড়পুর বিহার খনন করা হয়। ১৮৭৯ সালে প্রথম খনন কাজ শুরু করেন স্যার কানিংহাম। তারপর বলিহারের জমিদারের বিরোধিতার কারণে খনন কাজ থেমে যায়। অনেক প্রচেষ্টার পর ১৯২৩ সালে ডি.আর.ভান্ডারকরের নেতৃত্বে আবার খনন কাজ শুরু হয়। এই কাজে আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন দিঘাপতিয়ার জমিদার বাড়ির সদস্য শরৎ কুমার রায়। এছাড়াও ১৯২৫-২৬ সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৩০-৩১ ও ১৯৩১-৩২ সালে জি.সি.চন্দ্র, ১৯৩৩-৩৪ সালে কাশিনাথ দীক্ষিত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রফিক পাহাড়পুর বিহারের খনন কাজ পরিচালনা করেন। তখনই উন্মুক্ত হয় কেন্দ্রীয় ঢিবির প্রধান সিঁড়ি, পোড়ামাটির ফলক দিয়ে কারুকাজ করা দেয়াল, মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এর ব্যাপক উন্নয়ন কাজ চালায়। তারা ১৯৮১-৮৩ এবং ১৯৮৭-৮৯ সালে দুবার খনন কাজ পরিচালনা করে।

নিদর্শন সমূহঃ
২৭ একর জমির উপর পাহাড়পুর বিহারটি অবস্থিত ছিল। বিহারের সীমানা প্রাচীরের দেয়াল বরাবর অনেকগুলো ছোট ছোট কক্ষ ছিল। এদের মধ্যে উত্তর দিকের বাহুতে ৪৫টি এবং অন্য তিন দিকের বাহুতে ৪৪টি করে কক্ষ রয়েছে। এগুলো মূলত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবাস কক্ষ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। পরে কিছু ঘরকে প্রর্থনাকক্ষে রূপান্তর করা হয়। বিহারের উত্তর বাহুর মাঝ বরাবর প্রধান ফটক আছে এবং এর বাইরের ও ভেতরের দিকে একটি করে স্তম্ভ সম্বলিত হলঘর এবং পাশে ছোট ছোট কুঠুরি আছে। বিস্তৃত সমভূমির মাঝখানে প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরটি বিহারের মূল আকর্ষণ। মন্দিরের দেয়াল জুড়ে রয়েছে প্রায় দুহাজার পোড়ামাটির ফলক। গাছপালা, মানুষ, ফুল, শিকারি, নৃত্যরত রমণী, রাখাল, পশু-পাখি, হাতি, ঘোড়া আরও কত কি সেই পোড়ামাটির ফলকে স্থান পেয়েছে। মূল মন্দিরটি ছিল বিহারের ঠিক মাঝখানে। এছাড়াও এখানে ওখানে রয়েছে বেশ কিছু নিদর্শন যেমন-নিবেদন স্তূপ, প্রশাসনিক ভবন, কেন্দ্রীয় মন্দিরের প্রতিকৃতি ইত্যাদি। মূল স্থাপনার বাহিরে স্নানাগার ও শৌচাগার অবস্থিত। বিহারের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে প্রায় ৪৯মি দক্ষিণে প্রায় ৩.৫মি প্রশস্ত স্নানঘাট অবস্থিত। স্নানঘাট থেকে ১২ মি পশ্চিমে পূর্বমুখী একটি ইমারত পাওয়া গেছে যাকে স্থানীয় ভাবে বলা হয় গন্ধেশ্বরীর মন্দির।

পাহাড়পুর জাদুঘরঃ
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের পাশে জাদুঘরটি অবস্থিত। জাদুঘরের তিনটি গ্যালারীতে পাহাড়পুর থেকে সংগ্রহীত পুরাকীর্তি প্রদর্শন করা হয়। কাঁচের তৈরি সো-কেস এ খুব সুন্দর ভাবে নিদর্শন গুলি সাজানো আছে। জাদুঘরের নিদর্শনের গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল কৃষ্ণ পাথরের বিষ্ণুর খণ্ডাংশ,কৃষ্ণ পাথরের দন্ডায়মান গণেশ,বেলে পাথরের কীর্তি মূর্তি, লাল পাথরের দন্ডায়মান শীতলা মূর্তি,দুবলহাটির মহারাণীর তৈলচিত্র,হরগৌরীর ক্ষতিগ্রস্ত মূর্তি, বেলে পাথরের চামুন্ডা মূর্তি, কৃষ্ণ পাথরের লক্ষ্ণী নারায়নের ভগ্ন মূর্তি,কৃষ্ণ পাথরের উমা মূর্তি,বেলে পাথরের গৌরী মূর্তি,বেলে পাথরের বিষ্ণু মূর্তি,নন্দী মূর্তি,কৃষ্ণ পাথরের বিষ্ণু মূর্তি,সূর্য মূর্তি, কৃষ্ণ পাথরের দন্ডায়মান গণেশ,কৃষ্ণ পাথরের শিবলিঙ্গ,বেলে পাথরের মনসা মূর্তি। জাদুঘরটি রবিবার এবং সব সরকারী ছুটির দিনে বন্ধ থাকে।

আরও দেখুনঃ
হাতে সময় নিয়ে গিয়ে থাকলে কুসুম্বা মসজিদ দেখতে ভুলবেন না। মান্দা উপজেলার নওগাঁ-রাজশাহী সড়কের ধারে অবস্থিত। জেলা সদর হতে দূরত্ব ৩৩ কি: মিঃ। সড়কপথে যে কোনো যানবাহনে যাওয়া যায়। ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম গিয়াস উদ্দিন শাহ এর রাজত্বকালে জনৈক সোলায়মান ধুসর পাথর দ্বারা মসজিদটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে পুরাতন ৫/- টাকার নোটে কুসুম্বা মসজিদের ছবি ছাপা আছে। বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত পতিসর কুঠিবাড়ী একবার ঢু মেরে আসুন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত পতিসর কুঠিবাড়ী, যা আত্রাই উপজেলায় অবস্থিত। জেলা সদর হতে দূরত্ব ৪৮ কিঃ মিঃ। সড়কপথে যে কোনো যানবাহনে যাওয়া যায়। এছাড়াও আরও দেখতে পারেন জবাই বিল, ভিমের পান্টি, বলিহার রাজবাড়ী, জগদ্দল বিহার, হলুদ বিহার, দুবলহাটি রাজবাড়ী।

যাতায়াতঃ
ঢাকা থেকে সড়ক পথে খুব সহজেই নওগাঁ যাওয়া যায়। রাজধানীর কল্যাণপুর, গাবতলী ও মহাখালী বাস-স্ট্যান্ড থেকে প্রতি ১ ঘন্টা পর পর বাস ছাড়ে। এস.আর, শ্যামলী, টি.আর, হানিফ, বাবলু, শাহ্ সুলতান সহ আরো অনেক পরিবহন সংস্থার বাস চলাচল করে এই রুটে। ট্রেনে গেলে কমলাপুর থেকে সকাল ৮.৩০ মিনিটে নীলসাগর এক্সপ্রেসে উঠতে পারেন। এছাড়াও রংপুর এক্সপ্রেস ও লালমনি এক্সপ্রেস নামের দুটো ট্রেন ছাড়ে কমলাপুর থেকে। লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেন শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১০.২০ মিনিটে এবং রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি রবিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯.০০ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। ট্রেন থেকে সান্তাহার রেলস্টেশনে নামতে হবে। সান্তাহার নেমে ৮ কিলোমিটার উত্তরে গেলে নওগাঁ শহরে পৌছতে পারবেন। নওগাঁ বালুডাংগা বাস টার্মিনাল হতে সরাসরি বাসযোগে ঐতিহাসিক পাহাড়পুরে যাওয়া যায় |


কোথায় থাকবেনঃ
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে আপনি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের রেস্ট হাউজে উঠতে পারেন। পাহাড়পুরে রাত-যাপনের মতো ভাল কোনো হোটেল নেই। তাই থাকার জন্য আপনাকে নওগাঁ জেলা সদরে আসতে হবে। এখানে বেশ কিছু ভাল মানের হোটেল আছে। সব ধরণের ও মানের থাকা-খাওয়ার জায়গা পাবেন এখানে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মুক্তির মোড়ে হোটেল আগমনী(০৭৪১-৬৩৩৫১), পার-নওগাঁয় হোটেল অবকাশ (০৭৪১-৬২৩৫৬) ও হোটেল ফারিয়াল(০৭৪১-৬২৭৬৫), এছাড়া হোটেল যমুনা (০৭৪১-৬২৬৭৪), হোটেল স্বরনী(০৭৪১-৬১৬৮৫), হোটেল আরিফ(০৭৪১-৬৩২৪৭), আজিজ রেস্ট হাউজ, হোটেল রাজ, আফসার রেস্ট হাউস (০৭৪১-৬৩১৫৩) উল্লেখযোগ্য। এই হোটেল গুলোতে ২০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকায় রাত-যাপনের ভাল ব্যবস্থা হয়ে যাবে।