Technology Image

রোবটের বিবর্তন: ১৯৩৯-২০১৫



আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে রোবট অনেক সহজ করে দিয়েছে। এর খারাপ দিকের থেকে ভাল দিকই বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুনি রোবটের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে প্রযুক্তি জগতের নামকরা ব্যক্তিত্বরা এবং বিজ্ঞানীরা।

রোবট শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সায়েন্স ফিকশনের সেই যন্ত্রমানবের কাল্পনিক চেহারা কিংবা সাই-ফাই ম্যুভির কোন এক যন্ত্র দানবের চেহারা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই এমন কিছু না।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে রোবট অনেক সহজ করে দিয়েছে। এর খারাপ দিকের থেকে ভাল দিকই বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুনি রোবটের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে প্রযুক্তি জগতের নামকরা ব্যক্তিত্বরা এবং বিজ্ঞানীরা।
সে যাই হোক, বর্তমান সময়ে যে ধরণের রোবট পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, প্রথম দিকের রোবটগুলো কিন্তু মোটেও তেমন ছিল না। বিবর্তনের ধারায় রোবটের গাঠনিক পরিবর্তন এসেছে অনেক।
কেমন ছিল রোবটের এই বিবর্তন? চলুন দেখে আসা যাক:
১৯৩৯ : মানুষের মতই কিছু একটা

বিশ্বের প্রথম রোবটটি তৈরি হয়ে ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে ৩৫০ সালের মধ্যে। আর বাষ্প শক্তির সাহায্যে চলা এ রোবটটি তৈরি করেছিলেন গ্রিক গণিতবিদ আরকিটাস। এরপর ১৯৩২ সালে জাপানে লিলিপুট নামে ১৫ সেমি. উচ্চতার একটি খেলনা রোবট বাজারে আসে। তবে ১৯৩৯ এর মাঝেই রোবটকে খেলনার চেয়ে কাজের জিনিস হিসেবে চিন্তা করতে শুরু করা হয়।
১৯৩৯ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ডস ফেয়ারে ৭ ফুট দীর্ঘ টিনের রোবটটি নিজের আগমন বার্তা জানান দেয় এই বলে যে রোবটটি ৪৮টি ইলেকট্রিক্যাল রিলে দিয়ে তৈরি একটি বুদ্ধিমান সাহায্যকারী যন্ত্র।
ইলেক্ট্রো নামের এই রোবটটি মঞ্চে হেঁটে দেখায়, টেলিফোনের মাধ্যমে মানুষের কথা বুঝে কাজ করে এমনকি মঞ্চে একটি সিগারেটও খেয়ে দেখায়। অনেক অপূর্ণতা থাকলেও মানুষের বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করে রোবট।
টিকে থাকা প্রাচীন রোবটগুলোর মধ্যে একটিকে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানসফিল্ড মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে দেখতে পাওয়া যায়।
১৯৬১: ভার তুলতে রোবট

১৯৫৪ সালে জর্জ ডেভল এবং জো ইংলেবারজার নামের দুজন বিজ্ঞানী প্রথমবারের মত প্রোগ্রামযোগ্য রোবট বাহু ডিজাইন করেন। এর সাত বছর পর এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জেনারেল মটরস এর প্ল্যান্টে এসেম্বলি লাইনে নিয়ে যাওয়া হয়।
এখানে এর কাজ ছিল গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে তৈরি স্টিলের গরম খণ্ডগুলোকে ঠাণ্ডা করার জন্য রাখা তরলে সারিবদ্ধভাবে স্থানান্তর করা।
উপরের ছবিতে বর্তমানে এসেম্বলি লাইনে কাজ করে এমন একটি রোবট দেখা যাচ্ছে। ১৯৬১ তে এটি আরও অনেক ছোট ছিল, কিন্তু বর্তমান সংস্করনটি সেই ধারণারই উন্নত অবস্থা।
১৯৮৮: মানুষ চালিত নয় এমন ভার বহনকারী বাহন

হাসপাতালের নার্সের কথা ভাবলেই মনে পড়ে যায় রোগী বা মেডিকেল সম্পর্কিত জিনিস পত্র কোন কিছুতে নিয়ে যথাস্থানে পৌঁছে দেয়া কোন মানুষের কথা। আর এ কাজটি তার হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোর, মানুষ বা অন্য যেকোনো বাধা পেরিয়ে তবেই শেষ করতে হয়। কিন্তু একাজটির কথাই ভাবুন যেটি কোন মানুষ করছেনা। করছে কোন একটি যন্ত্র? এই যন্ত্রটিই হল ‘হেল্পমেট’।
আজকের যুগে যখন ড্রাইভার ছাড়া গাড়ি চলে বা চালকবিহীন বিমান আকাশে ওড়ে তখন এই হেল্পমেট হয়তো আশ্চর্যের কিছুই না। কিন্তু ১৯৮৮ সালের সেই সময়ে এটিই ছিল অনেক কিছু। অন্তত জিনিসপত্র আনা নেয়ার এ কাজগুলো রোবটের হাতে দিয়ে মানুষ আরও গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে মন দিতে পারত।
স্বাস্থ্য সেবায় এ রোবট অনেকটা আশীর্বাদের মত ছিল। খাবার বা ঔষধ থেকে শুরু করে এক্স-রে রিপোর্ট যাই হোক না কেন সঠিক ভাবেই যথাস্থানে পৌঁছে দিত এ রোবট।
১৯৯৪: গভীর গর্ত তৈরির কাজে

আগ্নেয়গিরি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, আগে তাদের বেশ ঝুকি নিয়ে কাজ করতে হত। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার আশংকা থাকতো, এমন কি ঘটতও।
দান্তে ২ নামের একটি রোবট মানুষ কে এই বিপদজনক কাজগুলো সরাসরি করা থেকে মুক্তি দেয়। মানুষের বদলে রোবটগুলোকে পাঠানো হত গর্তের ভিতর। সেখান থেকে গর্তের গ্যাসগুলো পর্যবেক্ষণ করে তথ্য প্রদান করত। ১৯৯৩ সালে পৃথক দুটি প্রকল্পে কাজ করার সময় ৮ জন আগ্নেয়গিরি গবেষককে প্রাণ দিতে হয়। তবে দান্তে ২ এর মত রোবট ব্যবহার শুরুর পর থেকে মাঠ পর্যায়ে এধরণের গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এতে করে গবেষকগণ আরও গভীরে গিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হন।
১৯৯৭: মানুষ বনাম মেশিন

কেমন লাগে যদি আপনি কোন কিছুতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওই একই কাজে যন্ত্রের কাছে হেরে যান? এমন প্রশ্নই করা হয়েছিল দাবার মাস্টার গ্যারি কাস্পারোভকে।
১৯৯৭ সালের মে মাসের ১১ তারিখ। এ দিন দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কে ৬ রাউন্ডের খেলায় হারায় আইবিএম এর তৈরি সুপার কম্পিউটার ডীপ ব্লু।
তবে হারবেন এমনটা কোনভাবেই আশা করেননি দাবার এই গ্র্যান্ড মাস্টার।
২০০৪: মহাকাশে রোবট

প্রায় এক দশকেরও আগে রোবোনাট ২ নামের একটি রোবটকে মহাকাশে অভিযাত্রার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
এটিকে মহাকাশে পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল মূলত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজগুলো করানো, যাতে করে বিজ্ঞানীরা অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন।
২০১৪: বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ

ইউগ্যান গোস্টম্যান, দেখতে ইউক্রেনের দশ বছর বয়সী এক বালকের মত। এটি মূলত একটি রোবট হলেও, দুর্বল ইংরেজি জ্ঞানে এটি ৩৩% বিচারককে নিজেকে মানুষ হিসাবে বোঝাতে সক্ষম হয়।
তবে আসলে এটি ছিল রাশিয়ান একটি রোবট।
শতকরা ৩৩ ভাগ লোক এটিকে মানুষ ভাবলেও, নিন্দুকেরা বাকি ৬৭ ভাগ লোকের মতামত নিয়েই মেতে আছে। তবে এর নির্মাতারা এর ভাষাগত বিষয়টিতে আরেকটু নজর দিলে হয়ত এই নিন্দা সইতে হতো না।
তবে বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ রোবটটি প্রথম ‘বুদ্ধিমান’ রোবট হিসেবে যথেষ্ট ছিল।
জুন ২০১৫: রোবটের কি মন আছে?

এতক্ষন তো রোবটের কাজ নিয়ে অনেক কথা হল। রোবট হয়ত মানুষের অনেক কাজ করে দিতে পারে যা আগে মানুষের নিজে করতে হত। আপনি হয়ত ভাবছেন এদের কাজ শুধুই কাজ করা, এদের কোন আবেগ অনুভূতি নেই। কিন্তু আপনার ধারনা ভুল।
পিপার নামের রোবটটি কিন্তু এরকম কোন কাজের যন্ত্র শুধু না। পিপার এমন এক যান্ত্রিক বন্ধু যার মাঝে আবেগ অনুভূতি খুজে পাওয়া যায়।
এর ভিতরে থাকা সেন্সরগুলো ব্যবহার করে এটি আপনার অনুভূতি বুঝতে পারবে, এমনকি নিজের অনুভুতিও প্রকাশ করবে।
এ মুহূর্তে এ রোবটটি ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, জাপানিজ আর স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে পারে।
জুলাই ২০১৫: মানুষের অবস্থা শনাক্তকারী

টিউরিং টেস্ট সঠিক বা ভুল যেকোনো কিছুই হতে পারে। এর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে বিচারকের উপর। তবে এখন যেটি নিয়ে কথা বলব সেটি কিছুটা ব্যতিক্রম। ৫৮ সেমি. লম্বা এ রোবটটি মানুষের অবস্থান বুঝতে পারে। এমনকি মানুষের সাথে কথাও বলে।
এটি ২০০৬ সালে তৈরি করা হলেও এবারই বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এটিকে উপযুক্ত করা হয়। এটি প্রয়োজনমত কথা বলতে পারে আর অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। এরকম রোবট এর আগে দেখা যায়নি।