Technology Image

কৃত্রিম গাছ



পরিবেশ যে হারে দূষিত হচ্ছে তাতে আগামি প্রজন্মের জন্যে কেমন পরিবেশ থাকবে সেটা নিয়ে বেশ শঙ্কিত পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশের শুধু ঢাকা শহরই নয়, অন্যান্য বিভাগীয় শহরেরও বাতাস নাকি ধারণরি চেয়েও দূষিত। এসব শহরের বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত সিসা পাওয়া গেছে।

আর আমরা সবাই জানি দিন দিন বাতাসে কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আমাদের বেঁচে থাকাই দুরুহ হয়ে পড়বে যদি এখনই কোনো পদক্ষেপ না নেয়া হয়। জলবায়ু সম্মেলনগুলো রুপক অর্থেই সম্মেলন করছে। খুব একটা কাজের কাজ যে করছে সেটা বলা যাবে না। কারণ এসব সম্মেলন থেকে কার্বনডাইঅক্সাইড কম নিঃসরণের জন্যে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে যে পরিমানের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল বাস্তবে সেটা আলো দেখেনি। ফলে পরিবেশের দূষণ রোধের প্রধান এই উদ্যোগ হয়তো কিছুটা হোঁচট খেল।

তবে আশার কথা হলো বিজ্ঞানীরা কিন্তু থেমে নেই। কারণ সবকিছু রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তেমনি পরিবেশের দূষণও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে কমানো সম্ভব না। এসব কারণেই হয়তো বিজ্ঞানীরা নিজ উদ্যোগেই পরিবেশ রক্ষার জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

তেমনই একটি উদ্যোগ নিয়েছেন অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির কিছু বিজ্ঞানী। তাদের একটি উদ্ভাবন সম্প্রতি বেশ আলোড়ন তুলেছে। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিরেক্টর ক্লজ লেকনার একটি মডেল নিয়ে তার সতির্থদের সঙ্গে কাজ করছেন। এই মডেল অনুযায়ী কৃত্রিম গাছ বানানো হবে। যা রাখা হবে প্রচুর যানবাহন চলাচল করে এমন রাস্তার ধারে। বিশেষভাবে নির্মিত এই গাছগুলো প্রচুর পরিমানে কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণ করতে পারে।

মজার ব্যাপার হলো এসব গাছ প্রাকৃতিক গাছের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণ করতে পারে। এখন কথা হলো এসব কার্বনডাইঅক্সাইড দিয়ে কি করা হবে? তাছাড়া এগুলো কোথায় ডাম্প বা কিভাবে ধ্বংস করা হবে? এরও একটি উপায় বের করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের কথায়, এই কৃত্রিম গাছ যেসব কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণ করবে তাকে এক ধরনের ‘ফাইবার’ বা আঁশে রুপান্তর করা সম্ভব। যা পরবর্তীতে বাড়ি-ঘর নির্মাণ বা বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য।

তবে কিছু কিছু বিজ্ঞানী এই থিওরি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলছেন, এই কার্বনডাইঅক্সাইড আদতেই এমন কোনো ফাইবারে রুপ দেয়া সম্ভব কিনা? আর যদি এই কার্বনডাইঅক্সাইড দিয়ে সেরকম কোনো ফাইবার একান্তই বানানো না যায়, তবে এর বিকল্প কি? কারণ এই বিপুল পরিমান কার্বনডাইঅক্সাইড নিয়ে তখন বর্তমানের চেয়ে আরো বেশি বিপদ হতে পারে।

কেননা এক পরীক্ষায় দেখা গেছে একটি গাড়ি এক কিলোমিটার পথ চলতে এক পাউন্ডের মতো কার্বনডাইঅক্সাইড ত্যাগ করে। এই হিসাবে একটি গাড়ি বছরে প্রায় ১৫ টন কার্বনডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করে! অর্থাৎ যে পরিমানে কার্বনডাইঅক্সাইড কৃত্রিম গাছের বা ডিভাইসের মাধ্যমে গ্রহণ বা আহরণ করা হবে তাকে নিরাপদে ধ্বংস করা বা তার বিকল্প ব্যবহার করাটাই এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়।



কৃত্রিম গাছের যে মডেল উদ্ভাবন করা হয়েছে তা এক প্রকার সফল বলা চলে। অন্তত তাত্ত্বিকভাবে এই মডেল সফল। সুতরাং কাজ হচ্ছে সেই কথিত ‘ফাইবার’ বা এর বিকল্প ব্যবহার নিয়ে। এ ব্যাপারে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিরেক্টর ক্লজ লেকনার বলেন, তিনি এর অন্য একটি বিকল্প নিয়েও চিন্তা করছেন। এই আহরিত কার্বনডাইঅক্সাইডকে তিনি ব্যবহার করতে চান ইউরোপ আমেরিকার ‘গ্রিন হাউজ’ প্রকল্পগুলোতে।

গ্রিন হাউজ প্রকল্পে কার্বনডাইঅক্সাইডের ব্যবহার নতুন নয়। তবে এই কৃত্রিম গাছের মাধ্যমে আহরণ কার্বনডাইঅক্সাইড যদি গ্রিন হাউজ প্রকল্পে ব্যবহার করা যায় তবে তা পরিবেশের জন্যে সুখবর। এবার আসি এই কৃত্রিম গাছগুলো কিভাবে কাজ করে বা কি দিয়ে তৈরি?

প্লাস্টিক রেসিন নামক পদার্থের দ্বারা এসব গাছের পাতা তৈরি করা হবে। এই গাছগুলোর নাম দেয়া হয়েছে ‘বোস্টন ট্রি পডস’ যা শুকনো অবস্থায় কার্বনডাইঅক্সাইড গ্রহণ করবে। তবে এই আহরণ কার্বনডাইঅক্সাইডকে সংরক্ষণের সময় এই পাতাগুলো ভেজাতে হবে। গাছের মডেল দেয়ার পূর্বের অবস্থায় এই ডিভাইসটি ছিল একটি বিরাট আকৃতির বক্সের মতো যার ওপরে থাকবে প্লাস্টিক রেসিনের তৈরি নৌকার পালের মতো দেখতে কার্বনডাইঅক্সাইড আহরণকারী সেই পাতা।

তবে অনেকেই এই উদ্ভাবনকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। কারো কারো মতে এভাবে যেচে নাকি বিপদ ডেকে আনা হচ্ছে। তাদের মতে এই বিপুল পরিমানের কার্বনডাইঅক্সাইড নিয়ে একসময় বিরাট বিপদেই পড়তে হতে পারে। তখন এই বিপদ সামাল দেয়া কঠিন হতে পারে। যাক, পাল্টাপাল্টি মতবাদ থাকতেই পারে। আমরা চাই সকল সমস্যা সফলভাবে মোকাবেলা করে পরিবেশ রক্ষার এই চমৎকার উদ্যোগ সফল হোক। যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুস্থ বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারে।

নইলে কানাডার এক কোম্পানি যেমন বিশুদ্ধ ‘হাওয়া বা বাতাস’ বিক্রি করছে। সেরকম আরো কোম্পানি যাতে আর বিশ্বে প্রয়োজন না পড়ে। কেননা এই কোম্পানি নাকি প্রথমে এই হাওয়া ভর্তি ক্যান বিক্রি করেছিল মজা করে। কিন্তু পরবর্তীতে এর ব্যাপক চাহিদার ভিত্তিতে এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। আর উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই কোম্পানির সম্ভাব্য গ্রাহক দেশের তালিকায় ভারত, বাংলাদেশ সহ এশিয়ার দেশগুলো রয়েছে। যদিও তারা তাদের ব্যবসা বর্তমানে শুধু চিন দেশেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। আমরা চাইনা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম টাকা দিয়ে কিনে বিশুদ্ধ হাওয়া নিক। কৃত্রিম বিশুদ্ধ হাওয়ার চেয়ে ‘কৃত্রিম গাছ’ সফলতা পাক সেই কামনাই থাকলো।