Sports Image

ক্রিকেট হেলমেট



ক্রিকেট মাঠে ব্যাটসম্যানদের ব্যবহার্য সামগ্রী হেলমেট। পাঁচ আউন্স ওজনের বলের আঘাত থেকে মাথা ও মুখমণ্ডল বাঁচাতে হেলমেটের ব্যবহার অপরিহার্য। অনেক আগে থেকেই ব্যাটসম্যানরা বলের আঘাত থেকে মাথা বাঁচাতে নিজেদের উদ্ভাবিত সামগ্রী ব্যবহার করতেন।
কিন্তু সত্যিকারের ‘আধুনিক’ হেলমেট পরে প্রথমবারের মতো ব্যাট করতে নেমেছিলেন সম্ভবত অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার গ্রাহাম ইয়ালপ। ১৯৭৭ সালের ঘটনা এটি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ব্রিজটাউনে ইয়ালপের সেই উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে যে ক্রিকেটের ব্যবহার্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে একধরনের বিপ্লব সৃষ্টি করবে, সেটা বোধ হয় তখন কেউই ভাবেননি।
ইয়ালপ সেদিন যে হেলমেটটি পরেছিলেন, সেটা তিনি তৈরি করেছিলেন একটি মোটরগাড়ি মেরামতের গ্যারেজে, সম্পূর্ণ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে। ইয়ালপ পরিহিত সেই হেলমেটটি সে সময় কৌতুককর হলেও এর উপকারিতাকে কেউই অস্বীকার করতে পারেননি। এরপর সময় গড়িয়েছে, হেলমেট হয়েছে আধুনিক থেকে আধুনিকতর।
ইংল্যান্ডে ১৯৯৭ সালে প্রণীত এক নিয়ম অনুসরণ করে বানানো হয় হেলমেট। যে নিয়ম কিছুটা বদলানো হয়েছে গত বছর আর নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াতে এখনো ১৯৯৮ সালের এক নকশায় চলছে হেলমেট। বিশ্বজুড়ে মূলত এই দুই নকশার হেলমেটই প্রচলিত। দুটি নকশাই খেলোয়াড়দের শতভাগ নিরাপত্তা দিতে না পারায় অভিযুক্ত। তবে এবার বোধহয় ক্রিকেট হেলমেটের আকৃতিতে বড়সড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। ফিলিপ হিউজের মর্মান্তিক মৃত্যুতে তাগিদ বেড়ে গেছে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা গবেষকদের।

কার্ডিফ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্ট ড. ক্রেইগ র্যািনসন ২০১১ সালে হেলমেটের নিরাপত্তা নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে হেলমেটের আকৃতিতে মৌলিক কিছু ত্রুটি আছে। যার ফলে ব্যাটসম্যানের একাধিকভাবে ইনজুরিতে পড়ার আশঙ্কা আছে। ড. র্যা নসন পরবর্তীতে আইসিসির মেডিকেল টিমের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং হেলমেটের ডিজাইন ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে হেলমেটের নিরাপত্তা মান নির্ধারণের জন্যও কাজ করেছেন তিনি। ড. র্যা নসনের সুপারিশেই ২০১৩ সালে হেলমেটের ডিজাইনে কিছুটা বদল আসে। তবে তাতে পুরোপুরি তার সুপারিশ অনুসরণ করা হয়নি।

ড. র্যা নসনের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, হেলমেটের উপরিভাগের অংশ থেকে সামনের গ্রিলের মাঝখানের ফাঁকা ৫৫ মিলিমিটার আর বলের উচ্চতা ৭৫ মিলিমিটার; তারপরও জোরে আসা বল ওই ফাঁকা দিয়ে ঢুকে যেতে পারে। গত আগস্টে ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টে ভারতীয় সিমার অরুণ বরুণের বাউন্সারে নাক ভেঙে যায় স্টুয়ার্ট ব্রডের অথচ আধুনিক হেলমেটের সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করছিলেন তিনি। বেশিরভাগ হেলমেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হেলমেটের সামনের ভাগ নিয়ে গবেষণা করছে এবং এতে বেশ উন্নতিও এসেছে। কিন্তু পেছনের অংশ নিয়ে গবেষণা সেভাবে এগোয়নি। কিন্তু হিউজের মৃতু্যুতে নড়েচড়ে বসেছেন নিরাপত্তা বিষেশজ্ঞরা। ড. র্যা নসনের গবেষণায় চলমান হেলমেট ডিজাইনের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে মাথার পেছনের দিকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে না পারাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সম্প্রতি হিউজের মৃত্যুর পর ইংল্যান্ডভিত্তিক হেলমেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে। আইসিসি ও ইসিবিও নিরাপত্তার নতুন মানদণ্ড দাঁড় করানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। ফলে এখন থেকে হেলমেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হেলমেটের মান পরীক্ষা করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। হেলমেট তৈরির আগে ইসিবি ও আইসিসির কাছ থেকে অনুমোদন নেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় চলে আসছে।


হেলমেট নিয়ে মুনির নতুন চিন্তাধারা :
ক্রিকেট মাঠে আঘাত পেয়ে ফিলিপ হিউজ এর অপ্রত্যাশিত মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিলো পুরো ক্রীড়া জগতকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা অনুভব করেছিলেন ক্রিকেটাররাই। তাই আয়ারল্যান্ড এর জাতীয় দলের ক্রিকেটার জন মুনি উদ্ভাবন করেছেন আরো বেশি নিরাপদ আর উন্নত একধরনের হেলমেট।
কিভাবে এই নতুন হেলমেট এর চিন্তা মাথায় আসলো এ সম্পর্কে মুনি বলেন, "গত বছর ক্লাবের একটা খেলায় আমার এক কাজিন মাথার পিছনে আঘাত পান। তখনি আমি পরিকল্পনা করি নতুন কিছু করার। হিউজ এর ঘটনা দেখার পর আমি আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই কিছু একটা করার ব্যপারে।"
আগের হেলমেট এরই পেছনের দিকে নতুন ধরনের একটা গ্রিল সংযুক্ত করেই বানানো হয় এই হেলমেট। মুনি যার নাম দিয়েছেন, 'কন্ঠহার'। এই নতুন অংশটি ওজনেও খুব একটা ভারি নয়, আর খুব সহজেই যুক্ত করা যাবে বাজারের যেকোন হেলমেট এর সাথেই। হাতে নিয়ে অনুভব করলেই আগের হেলমেট এর সাথে ওজনেও খুব একটা পার্থ্যক্য বোঝা যাবে না।
মুনি বলেন, "স্কুপ এর মতো নতুন ধরনের শটগুলো আবিষ্কারের সাথে সাথে শুরু হয়েছে নতুন ধরনের ইনজুরির আশঙ্কা, তাই আপনাকে এধরনের নিরপত্তার নিতেই হবে!"
গত জানুয়ারীতে দুবাই তে সর্বপ্রথম এই হেলমেট ব্যবহার শুরু করেন তিনি। বিশ্বকাপে আরব আমিরাতের বিপক্ষে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচেই নেমেছিলেন এটি পরে। তবে মুনি'র বানানো এই 'কন্ঠহার' এখনো যথাযথ পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে অনুমোদন না পাওয়াতে আপাতত শুধু তিনি নিজেই এটি ব্যবহার করছেন। তবে তিন আশা করছেন ২০১৫ ইংলিশ ক্রিকেট মৌসুম শুরুর আগেই এটা সবার ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।