Sports Image

ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৫ নিয়ে কিছু কথা

ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের এক নম্বর খেলা। কিন্তু কিছুদিন আগেও সে অবস্খা ছিল না। ঐতিহ্যগতভাবে ফুটবলই ছিল এ অঞ্চলের প্রধান খেলা। স্বাধীনতার পূর্বে পশ্চিম পাকিস্তানিরা সবকিছুর মতো ক্রিকেটেও চালিয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। চব্বিশ বছরে মাত্র একজন বাঙালি পাকিস্তান জাতীয় দলের দ্বাদশ খেলোয়াড় হবার সুযোগ পেয়েছিল। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ক্রিকেটামোদীরা ঢাকা স্টেডিয়ামে টেস্ট ম্যাচ দেখেছে ঠিকই; কিন্তু স্বজাতীয় কোন খেলোয়াড়কে দেখেনি ওয়েসলি হলের বল মোকাবেলা করতে; দেখেনি কোন বাঙালি বোলারকে রোহান কানহাইয়ের উদ্দেশ্যে বল করতে।

বাংলাদেশে ক্রিকেটের আগমন ইংরেজদের মাধ্যমে। অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ব্রিটিশরা এ এলাকায় ক্রিকেটের সূচনা করে। ব্রিটিশ আমলে বাংলার ক্রিকেট ছিল প্রধানত পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক। উইজডেনের ভাষ্যমতে কলকাতা ক্রিকেট ক্লাব গঠিত হয় ১৭৯২ সালে। ১৯২৬ সালে এম.সি.সি. কলকাতার ইডেন গার্ডেনে অবিভক্ত ভারতের সঙ্গে খেলে। ১৯৩৫ সালে বাংলা রঞ্জি ট্রফিতে প্রথমবারের মতো অংশ নেয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয় ১৯৯২ সালে। সেবার বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা সরাসরি দেখার সুযোগ পায় এদেশের দর্শকরা। ক্রীড়ামোদীদের দারুনভাবে নাড়া দেয় বিশ্বকাপ। পাশাপাশি আরেকটি ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেট নতুন দীগন্তে প্রবেশের উম্মোচন করে দেয়। জিম্বাবুয়েকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) পূর্ন সদস্যপদ বা টেস্ট স্ট্যাটাস দিয়ে দেয়। এবং সিদ্ধান্ত হয় পরবর্তী বিশ্বকাপে আইসিসি ট্রফির শীর্ষ তিন দল খেলার সুযোগ পাবে বিশ্বকাপ। আগে খেলত কেবল চ্যাম্পিয়ন দল। তিনবারের আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুয়ের কাছে দু’বার সেমি ফাইনালে হেরেছে বাংলাদেশ। সুতরাং জিম্বাবুয়ের অবর্তমানে বাংলাদেশ ফেভারিট দল আইসিসি ট্রফি ক্রিকেটে। দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা স্বপ্ন দেখতে থাকে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার। কোন ডিসিপ্লিনে বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা এই প্রথম। তাই দেশবাসীর মধ্যে দারুণ সাড়া পড়ে যায়। বাংলাদেশে ক্রিকেট এর জনপ্রিয়তা উর্ধ্বমুখি হয়ে ওঠে।

১৯৯৪ সালে কেনিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় আইসিসি ট্রফি। বাংলাদেশ অংশ নেয় ট্রফি জয়ে হট ফেভারিট হিসেবে। কিন্তু স্বপ্ন পুরণ হয় না বাংলাদেশের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অল্প ব্যবধানে কেনিয়ার কাছে হেরে হৃদয় ভেঙ্গে দেয় দেশবাসীর। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে খেলা হয় না বাংলাদেশের। আবার অপেক্ষা তিন বছরের জন্য। ১৯৯৭ সালে আকরাম খানের নেতৃত্বে যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আইসিসি ট্রফিতে অংশ নিতে মালয়েশিয়া রওনা হয় তখন তাদের সাথে ছিল দুটি প্রধান অস্ত্র। প্রথমত: এদেশের কোটি ক্রীড়ামোদীর অন্ত:স্খল থেকে বেরিয়ে আসা প্রার্থনা। দ্বিতীয়ত: গর্ডন গ্রিনিজের মতো একজন উচুমানের নিষ্ঠাবান কোচ। খেলোয়াড়দের দারুনভাবে অনুপ্রাণীত করেন গ্রীনিজ। গ্রুপ ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে অধিনায়ক আকরাম খান হল্যান্ডের হাতের মুঠো থেকে জয় ছিনিয়ে আনেন। এরপর স্কটল্যান্ডকে সহজেই সেমিফাইনালে হারিয়ে স্বপ্নের বিশ্বকাপে খেলার ছাড়পত্র পায়। সারা দেশে বাধভাঙ্গা আনন্দে ভেসে যায়। দলমত নির্বিশেষে সবাই হাতে হাত ধরে উল্লাসে মেতে ওঠে।



শুধু বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করে মন ভরেনি আকরাম বাহিনীর। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফাইনালে তারা হারিয়ে দেয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কেনিয়াকে। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই তারা অংশ নেয় ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে প্রতিযোগিতার রানার্সআপ পাকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা উপহার দেয় প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় চমক। ব্যাস! কাজ যা হবার হয়ে যায়। মাঠের সাফল্যের সাথে যুক্ত হয় সফল ক্রিকেট কূটনীতির এবং নতুন শতাব্দীর শুরুতেই বাংলাদেশে লাল-সবুজ পতাকা ক্রিকেটের এলিট শ্রেণী অর্থাৎ টেস্ট দলসমূহের দশম সদস্য হিসেবে নিজের স্খান করে নেয়।

এবারের মানে ২০১৫ বিশ্বকাপ খুব একটা দূরে নয় অতি সংন্নিকটে এসে পড়েছে। গত বিশ্বকাপের চেয়ে অবশ্যই আমাদের প্রত্যাশা বেশি। আর এমন আশা করতেই পারি। সোনার বাংলায় এখন অনেক নামিদামী ক্রিকেটার রয়েছে। তাদের নিকট আমাদের এমনটাই চাওয়া। গত বিশ্বকাপের মোট ৬ জন খেলোয়াড় এবারের বিশ্বকাপে আছে। বাকি ৯জন নতুন হলেও তারা সবাই খুব ভাল উপহার দিয়েছে সোনার বাংলার জনগণকে। নতুনদের প্রত্যাশাও তেমন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ১৫ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করে। এ দলের ১৫ ক্রিকেটারের মধ্যে ৯ জনই এবার প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেবেন। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও তামিম ইকবালের তৃতীয় বিশ্বকাপ এবং মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও রুবেল হোসেনের দ্বিতীয়।



সৌম্য সরকার
বিশ্বকাপে ডাক পাবো এ রকম একটা আত্মবিশ্বাস শুরু থেকেই ছিল। ভালো খেলার চেষ্টাও শুরু থেকেই ছিল। যেভাবে খেলা শুরু করেছি এবং এখন যেভাবে খেলছি, এটা আমার জন্যে অনেক কিছু। এ জন্য পুরো কৃতিত্ব দিতে চাই আমার পরিবারকে। আমার পরিবার আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছে। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আছি সেটা আমার জন্যে অনেক কিছু। একাদশে সুযোগ পেলে ভালো কিছু করে দেখাব।

সাব্বির রহমান রুম্মান
অনেক ভালো লাগছে। বিশ্বকাপে খেলবো ভেবেই ভালো লাগছে। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। জিম্বাবুয়ে সিরিজে ভালো খেলার পর আশা করেছিলাম, বিশ্বকাপে খেলবো। আশা তো প্রত্যেকেই করে, আমিও করেছিলাম। এবার বিশ্বকাপে খেলবো এ রকমটা স্বপ্ন ছিল আমার। জিম্বাবুয়ে সিরিজে ভালো করার পর আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়। এরপর প্রিমিয়ার লিগেও বেশ কয়েকটি ম্যাচে ভালো করেছি। সব মিলিয়ে নির্বাচকরা আমার পারফরমেন্স বিবেচনা করেই দলে সুযোগ করে দিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়াতে এখনো খেলা হয়নি। নিউজিল্যান্ডে অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছি। সেখানকার কন্ডিশন কিছুটা সাহায্য করতে পারে। ব্যক্তিগত কোন লক্ষ্য নেই; যখন যে রকম ব্যাটিং করা প্রয়োজন সেটা করার চেষ্টা থাকবে। ফিল্ডিং কিংবা বোলিং যেখানেই খেলি না কেন, দলের জন্যে কিছু করার চেষ্টা থাকবে।

এনামুল হক বিজয়
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আমার প্রথম আইসিসির কোন ইভেন্ট। এর আগে অনুর্ধ্ব-১৯ দলে বিশ্বকাপ খেলেছি। কিন্তু এবারই ওয়ানডে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছি। এটা আমার প্রথম বিশ্বকাপ। তাই অনুভূতিটা অন্য রকম। ছুটি পেয়েছি বলে বাবা-মার কাছে যাচ্ছি। একসঙ্গে আনন্দ করবো। নির্বাচকদের ধন্যবাদ, আমাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য। ভাল খেলে দেশের মানুষের প্রত্যাশা পুরণে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।

নাসির হোসেন
প্রত্যেক ক্রিকেটারের একটা স্বপ্ন থাকে বিশ্বকাপ খেলার। সেই সুযোগটি আসায় খুবই ভালো লাগছে। ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট এটা। জিম্বাবুয়ে সিরিজে দলে ছিলাম না। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর বেশ কঠিন সময় পার করেছি। এ সময় আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছি। ফর্মে ফেরার জন্যে সব চেষ্টাই করেছি। হার্ডওয়ার্ক করেছি। নেটে সময় দিয়েছি। কীভাবে উন্নতি করা যায়- সে সম্পর্কে কোচ ও সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের পরামর্শগুলো কাজে লাগিয়েই উন্নতি করেছি। বিশ্বকাপেই ফিরতে হবে এমন কোন টার্গেট ছিল না। আমি আমার স্বাভাবিক খেলাটা খেলার চেষ্টা করেছি। ব্যাটিংটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করেছি। যার কারণে সফল হয়েছি। বেশ কয়েকটা ম্যাচে রান করেছি। এতটুকু বিশ্বাস ছিল যদি ভালো পারফর্ম করি তাহলে দলে অবশ্যই সুযোগ পাবো।

তাসকিন আহমেদ
১৫ জনের দলে সুযোগ পেয়ে ভালো লাগছে। এবার ১১ জনের দলে থাকার চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশ দলে খেলার স্বপ্নটা পূরণ হওয়ার পর আস্তে আস্তে সব স্বপ্নই বেড়ে যাচ্ছে। এখন বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে। এখানে যদি ভাল করতে পারি অনেক বড় একটা অর্জন হবে। অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলে উইকেট সম্পর্কে কিছুটা ধারনা রয়েছে। এটা আসলে ব্যাটিং ও বোলিং দুইটার জন্যই ভাল।

তাইজুল ইসলাম
বিশ্বকাপ ক্রিকেটে থাকতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। দুটি সিরিজ এবং ঘরোয়া লিগে ভালো খেলে বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছি। সে জন্য বেশ ভালো লাগছে। আসলে ওখানকার কন্ডিশনে কোন সুবিধা পাবো কিনা- তা নিয়ে কোন চিন্তা করছি না। এখন ভারত-অস্ট্রেলিয়া এবং বিগ ব্যাশের খেলাগুলো দেখছি। স্পিনাররা কি রকম বল করছেন সেগুলোও দেখছি। ওখানে গেলে এবং বল করলে বাকিটা বোঝা যাবে। তারপরও নিজের থেকে ভালো করার জন্যে যতটুকু করার তার সবটুকুই চেষ্টা করবো। বিশ্বকাপে অবশ্যই একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাবো। ইনশাআল্লাহ বোলিংয়ে সেরা দশে থাকার চেষ্টা করবো।

আল আমিন হোসেন
৪ বছর পরপর একবার বিশ্বকাপ হয়। এবারে খেলতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। একটু কনফিউজ ছিলাম দলে থাকব কি, থাকবো না। শেষ পর্যন্ত আছি। গত বছর ১১ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়েছি। খুব ভালো একটা সময় কেটেছে। আশা করছি বিশ্বকাপ দিয়ে বছরটা বেশ ভালোমতোই শুরু করতে পারবো।

আরাফাত সানি
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে এবারই প্রথম খেলবো। এরপর বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টে। খুব উৎফুল্ল আমি। সবারই এখানে খেলার স্বপ্ন থাকে। আমারও ছিল; আর সেটা পূর্ণ হয়েছে বলে ভালো লাগছে। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে কীভাবে বোলিং করতে হবে, সে বিষয়গুলোকে নিয়ে এখন থেকেই কাজ করতে হবে। সাকিব এখন বিগ ব্যাশে খেলবেন। যা আমাদের জন্যে প্লাস পয়েন্ট। উনি (সাকিব) আগেভাগেই কন্ডিশন সম্পর্কে ধারনা নিতে পারবেন। আমি চেষ্টা করব ওনার কাছ থেকে কন্ডিশন সম্পর্কে ধারনা নিতে। আর এগুলো যদি নিতে পারি, তবে আমাদের দলের জন্যই ভাল হবে।

২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফিকচার