Sports Image

ডেভিস কাপ- টেনিসের বিশ্বকাপ



টেনিসের আবার বিশ্বকাপ কিসের? শিরোনাম দেখে অনেকের মনেই প্রশ্নটা জাগবে এবং জাগাটাই স্বাভাবিক। টেনিস স্বতন্ত্র খেলা। এখানে কোন দলীয় পারফর্মেন্সের সুযোগ নেই। বিশ্বের নামী-দামী টেনিস তারকারা নিজেদের জন্যই টেনিস খেলে থাকেন, টেনিস কোর্টে তারা নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন না বা বলা যায় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান না। তাহলে আবার বিশ্বকাপ কি করে হয়।

হ্যা, টেনিস পুরোপুরি স্বতন্ত্র খেলা হলেও এই খেলারও একটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আর সেই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ডাকসাইটে টেনিস তারকারা দলীয়ভাবে তাদের দেশের হয়ে টেনিস কোর্টে লড়াইয়ের সুযোগ পান।

টেনিসের বিশ্বকাপ বলে খ্যাত এই প্রতিযোগিতাটির নাম ডেভিস কাপ। যুক্তরাষ্ট্রের হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় লন টেনিস দলের একজন সদস্য ডিওয়েইট এফ ডেভিসের নামানুসারে এই প্রতিযোগিতার নামকরণ করা হয়েছে ডেভিস কাপ। বিশ্ব টেনিসের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেনিস ফেডারেশন (আইটিএফ) প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সারা বিশ্ব থেকে প্রতি বছর ১৩০টি দল ডেভিস কাপে অংশ গ্রহণ করে থাকে। নক আউট পদ্ধতিতে সারা বছর জুড়ে ডেভিস কাপের বাছাইপর্ব চলতে থাকে।

বর্তমানে মোট ১৬টি দল ডেভিস কাপের ওয়ার্ল্ড গ্রুপে প্রতিযোগিতা করছে। ডেভিস কাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চেক প্রজাতন্ত্র। এটি তাদের তৃতীয় ডেভিস কাপের শিরোপা ছিলো।

এপর্যায়ে চলুন জেনে নেয়া যাক কি করে এই ডেভিস কাপ টেনিসের বিশ্বকাপে পরিনত হল?

১৮৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন টেনিস খেলোয়াড় তাদের এবং বৃটিশ টেনিস প্লেয়ারদের মাঝে একটি টেনিস প্রতিযোগিতা খেলার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। বৃটিশ টেনিস খেলোয়াড়েরা মার্কিনিদের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার পরই মূলত জন্ম হয় ডেভিস কাপের।

হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চার টেনিস প্লেয়ারের মধ্যে ডিওয়েইট এফ ডেভিস নামে একজন ছিলেন। তিনিই প্রথম ডেভিস কাপের ফরম্যাটটি তৈরি করেছিলেন এবং প্রথম শিরোপাটি তৈরির খরচ বাবদ তিনি নিজের পকেট থেকে ১০০০ ডলার দিয়েছিলেন।

ডেভিস কাপের প্রথম শিরোপাটির নকশা করেছিলেন নিউ হ্যাম্পশায়ারের বাসিন্দা উইলিয়াম ডুরগিন এবং এটি তৈরি করেছিলেন আরেক বৃটিশ রোল্যান্ড রোডেস।

ইতিহাসের প্রথম ডেভিস কাপের ম্যাচটি খেলা হয়েছিলো ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনে অবস্থিত লংউড ক্রিকেট ক্লাব মাঠের একটি কোর্টে। ম্যাচের প্রথম তিনটি গেমে যুক্তরাষ্ট্র জিতে বৃটিশদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো সেদিন।

১৯০৫ সালে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া এবং অস্ট্রেলিশিয়া (অস্ট্রেলিয়া এভং নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে)প্রথমবারের মত যোগ দেয় এই প্রতিযোগিতায়।

প্রাথমিকভাবে প্রতিযোগিতাটি ইন্টারন্যাশনাল লন টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ নামে শুরু হলেও পরবর্তিতে এর ট্রফির নামেই (ডেভিস ট্রফি)প্রতিযোগিতাটি বেশি পরিচিতি লাভ করে।

প্রতিযোগিতার ফরম্যাট
প্রতি বছর আইটিএফের র্যাংকিংয়ে শীর্ষ ১৬টি দল বা দেশ ওয়ার্ল্ড গ্রুপের অংশ হিসেবে ডেভিস কাপের ফাইনাল রাউন্ডে অংশগ্রহণে সুযোগ পেয়ে থাকে। আর যে সকল দেশ ওয়ার্ল্ড গ্রুপের অংশ হতে ব্যর্থ হয় তারা তাদের আঞ্চলিক গ্রুপের দলগুলোর সাথে খেলার মাধ্যমে পরবর্তি বছর ওয়ার্ল্ড গ্রুপে অংশ নিতে চেষ্টা করে থাকে। বর্তমানে বিশ্বের আঞ্চলিক জোনগুলো হল আমেরিকা, ইউরোপ/আফ্রিকা এবং এশিয়া/ওশেনিয়া।

ডেভিস কাপের কিছু অজানা বিষয়

১. ডিওয়েইট এফ ডেভিস ১৯০০ সালে খেলা প্রথম ডেভিস কাপের ট্রফি তৈরির খরচ সম্পূর্ন নিজের পকেট থেকে প্রদান করেছিলেন। তখন ট্রফিটি তৈরিতে ব্যায় হয়েছিলো ১০০০ মার্কিন ডলার।

২. বর্তমানে ডেভিস কাপের ট্রফির মূল্য ৭ লক্ষ ডলারের চেয়েও বেশি।

৩. ডেভিস কাপের ট্রফিটি তৈরিতে মোট ২১৭ আউন্স সিলভার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ট্রফিটির উচ্চতা ১৩ ইঞ্চি এবং এর ব্যাস ১৮ ইঞ্চি।

৪. প্রতি বছর এই ট্রফিটিতে সে বছরের বিজয়ী এবং রানার্স আপ দলের নাম খোদাই করে লিখে রাখা হয়। যখন একটি পাত্রে লেখা শেষ হয় তখন নতুন আরেকটি পাত্র সেখানে যোগ করে দেয়া হয়। এমন করে প্রথম থেকে এ পর্যন্ত সবকটি দলের নাম এতে খোদাই করা রয়েছে।

৫. প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডেভিস কাপের জন্য মোট ১০১ বার লড়াইয়ে নেমেছে দলগুলো। আর এবারের ২০১৫ সালের আসরটি ১০৩ তম আসর।

৬. ডেভিস কাপই বিশ্বের একমাত্র দলীয় প্রতিযোগিতা যেটি পুরো একটি শতাব্দি ধরে খেলা হচ্ছে।

৭. ১৯০৫ সাল থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড অস্ট্রেলিশিয়া নামে একটি সম্মিলিত দল পাঠাতো ডেভিস কাপে।

৮. এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ সংখ্যকবার এই শিরোপাটি নিজেদের ঘরে তুলেছে। তারা মোট ৩২ বার ডেভিস কাপের শিরোপা জয় করেছে।

৯. ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া মোট ১৫ বার ডেভিস কাপের শিরোপা জিতেছে।

১০. ১৯৭৪ সালের আসরে প্রথমবারের মত আমেরিকা এবং ইউরোপের বাইরের দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতীয় দল ডেভিস কাপের ফাইনালে পৌছায়। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিবিদ্বেষী রাজনীতির প্রতি প্রতিবাদ স্বরূপ তাদের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় বিপক্ষ দল। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে আজ পর্যন্ত ডেভিস কাপের ফাইনালে পৌছাতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা বা ভারত কেউই।

১১. ডেভিস কাপের ম্যাচগুলোতে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কোন টাইব্রেকার চালু ছিলো না। ১৯৮৯ সালে প্রথম এই প্রতিযোগিতায় টাইব্রেকার চালু করা হয়। বর্তমানে শুধুমাত্র পঞ্চম সেটে কোন টাইব্রেকার থাকে না।

২০১৫ সালে ডেভিস কাপের ফাইনালে লড়াইয়ে নেমেছে গ্রেট ব্রিটেন এবং বেলজিয়াম। এবছর এন্ডি মারের কল্যাণে ৭৯ বছরের শিরোপা খড়া মিটাতে মড়িয়া গ্রেট ব্রিটেন।