Lifestyle Image

বটমূল ও বর্তমান



পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীতীরে। বাঙালির ক্ষেত্রে তা আরও সত্য। কারণ, তার ভূখ- নদীবহুল। ধনধান্য পুষ্পভরা। প্রকৃতি বাঙালিকে দিয়েছে বহুকিছু, সঙ্গে এমন এক ঐতিহ্য, যা জন্মসূত্রে দেয় সেক্যুলার হয়ে ওঠার মতো উদার মন। পয়লা বৈশাখ ধারণ করে সেই মনকে, যার দৃষ্টি তার মতোই উন্মুক্ত নদীতীরের প্রান্তরে। যেখানে বটের ছায়া, সেখানেই বাঙালির মনের নোঙর। গা জুড়ানো হাওয়ায় ক্লান্তি কাটানো। হাট-বাজার। কখনো-কখনো উৎসব। যেমন পয়লা বৈশাখ। তবে এটি শহর গড়ে ওঠার আগের ছবি, যখন যন্ত্র গ্রাস করেনি নদীবিধৌত লোকালয়ের প্রাণম্পন্দনকে। সত্য যে, উৎসব সব সময় সংক্রামক, ছড়িয়ে পড়াই তার ধর্ম। যেমন ছড়িয়েছে পয়লা বৈশাখ। গ্রাম থেকে শহরে, সারল্য থেকে জটিল নিকাশে। কিন্তু এখানে প্রকৃতির প্রতিনিধি হয়ে কেন্দ্রে রয়েছে কে? সে আদৌ কোনো মানুষ নয়, সাইকাস গোত্রের একটি বিশেষ গাছ। বট। বটতলা বা বটমূল।

স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কথা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বারবার চেষ্টা চালাচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার। মূল আক্রোশ ছিল রবীন্দ্রনাথে। কথিত আছে, তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক আইয়ুব খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে বলেছিলেন, আপনারা লিখতে পারেন না রবীন্দ্রসংগীত? একপর্যায়ে পাকিস্তান বেতারে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর প্রতিবাদে ছায়ানট ঢাকার রমনা উদ্যানের অশ্বত্থের নিচে ১৩৭৪ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রভাত এবং ১৯৬৭ সালের মধ্য এপ্রিলে আয়োজন করে পয়লা বৈশাখের প্রথম অনুষ্ঠানের। পঞ্চবটী বলতে অশ্বত্থ, বট, বিল্ব, আমলকী ও অশোক বোঝায়। ভালো শোনায় বলে অনুষ্ঠানস্থলের নাম দেয়া হয় বটমূল। ১৯৭১ সালে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পয়লা বৈশাখেই নতুন বছরকে সেখানে স্বাগত জানানো হচ্ছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়।

এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বটমূলের এই উদ্যাপন বাংলাদেশের ক্যানভাসে বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ব্রাশে অঙ্কিত। পেছনে ফিরলে দেখি, আমাদের একান্ত চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সময় থেকেই একটু একটু করে ফারসি-উর্দুর প্রবেশ ঘটছিল বাংলায়। আবদুল হাকিমের ‘যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী’র সময় থেকেই ব্যাপারটা রীতিমতো অনুপ্রবেশে রূপ নিচ্ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলা রাষ্ট্রীয় জবরদস্তির লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে এবং বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় উর্দু। ১৯৪৮ সালে বাঙালি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং ১৯৫২ সালে সংঘটিত হয় মহান ভাষা আন্দোলন। লক্ষণীয়, এর পর থেকেই বাংলায় নিজের সংস্কৃতি, নিজের শিকড়ের অনুসন্ধান আরও জোরদার হয়ে উঠলো। ঘরে-বাইরে বাঙালিদের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি হলো, যারা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত হতে জানে, এবং বাইরের সঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতি এবং জীবনধারার তুলনা করার অপশনগুলো তাদের নাগালে। পয়লা বৈশাখে মূলত এদের গন্তব্য ছিল রমনা বটমূল। শাখা-প্রশাখা পরে ছড়াতে থাকে শাহবাগের বাইরেও। ১৯৭২ সালের পর থেকে পয়লা বৈশাখ জাতীয় উৎসব হিসেবে স্বীকৃত হয়। এই উৎসবকে আরও রঙিন করে তুলতে প্রচলন হয় বৈশাখী শোভাযাত্রার। যশোরের চারুপীঠের উদ্যোগে প্রথম এই শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে; আর ঢাকায় চারুকলা অনুষদের একদল শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে প্রথম এই আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয়বার উৎসবের সময় শিল্পী ইমদাদ হোসেন এর নাম দেন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। একই সঙ্গে বদলে গেছে পয়লা বৈশাখের উদ্যাপন। বিটিভিতে মুক্তিযুদ্ধের পরে সরাসরি সম্প্রচারিত হতে থাকে রমনার বটমূলের অনুষ্ঠান। পূর্ব পাকিস্তানের গন্ধ ঝেড়ে সত্যিকারের বাংলাদেশ হয়ে ওঠার যাত্রাটি ত্বরান্বিত হতে থাকে সবেগে। জীবনযাপনের আধুনিকায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বটতলাকেন্দ্রিক পয়লা বৈশাখ হয়ে উঠতে থাকে শহুরে।

পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন সম্রাট আকবরের সময়ে যখন শুরু হয়, তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পর দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসব আর মেলার আয়োজন করা হতো। বলা বাহুল্য, তখন থেকেই প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ মেলার প্রাণকেন্দ্র ছিল পঞ্চবটী। আশির দশকেও আমাদের উৎসবগুলো ছিল প্রকৃতিকেন্দ্রিক। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থার ১৯৮৩ সালের জরিপ বলে, মেলার স্থান নির্বাচনে প্রাধান্য পেতো নদীর তীর, গ্রামের বট-পাকুড়াশ্রিত চত্বর কিংবা খোলা মাঠ, মঠ-মন্দিরসংলগ্ন প্রাঙ্গণ, সাধু-সন্ত-ফকির-দরবেশের সাধনপীঠ বা মাজার, প্রসিদ্ধ পুণ্য ‘থান’ বা তীর্থক্ষেত্র। কখনো স্কুল-কলেজ চত্বর বা খেলার মাঠেও বসতো মেলা। সেই ধারণা থেকেই রমনার বটতলা। কিন্তু কেমন ছিল রমনার পঁয়ষট্টির বটমূল? সেই সময়ের বাঙালিরাই বা কেমন ছিলেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর আখতার সুলতানা বলেন, ১৯৬০ সালে যখন আমি রাজধানী হাইস্কুলে পড়তাম, তখনকার পয়লা বৈশাখের চিত্র আজকের মতো এত ব্যাপক ছিল না। একটা বড় মাঠে মেলা আর সবার সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়েই বৈশাখের মজাটা আবর্তিত হতো। বাবা-মা কাউকে বকাঝকা করতেন না, বাড়িতে অন্য দিনগুলোর চেয়ে একটু ভালো খাবার-দাবারের আয়োজন থাকতো। বিকেলে বাবার সঙ্গে হালখাতা উপলক্ষে মিষ্টি খেতে যেতাম। এলাকার বন্ধুদের নিয়ে মেলায় গিয়ে পুতুল কিনতাম। ঈদের দিনের মতো বন্ধুদের বাসায় গিয়ে নানা পদের খাবার খেতাম।’ আরও যোগ করলেন, ‘একটা সময় প্রায় প্রতিবছর গিয়েছি বৈশাখের প্রথম দিনে রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীদের গান শুনতে। এখন বয়স বাড়ায় যেতে পারি না। তবে বাসায়ই নানা খাবারের আয়োজনের মাধ্যমে বন্ধুদের নিয়ে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন করি। তখনো অবস্থাপন্নরা বাসায় দাওয়াত করে এ দিনে পরিচিতদের মিষ্টিমুখ করাতেন।’

অভিনেতা আতাউর রহমানের মতে, এখন পয়লা বৈশাখের প্রকার ঠিক আছে, আঙ্গিকটা বেড়ে গেছে। বৈশাখের প্রতি হৃদয়ের টান কতোটা বেড়েছে, সেটা নিয়ে সংশয় আছে। এখনকার মতো আনন্দ তখন হতো না। নতুন প্রজন্মের ছেলেরা বৈশাখের আনন্দ শুরু করে বৈশাখের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তির রাত থেকে। অভিনেতা আলী যাকের বলেন, ‘ছোটবেলায় তখন বাবার হাত ধরে মেলায় যেতাম। তার সঙ্গে যাঁরই দেখা হতো, তিনি হাত ধরে কুশল বিনিময় করতেন। মেলায় যেতাম খেলনা কেনার জন্য। আমাদের তখন লোভ ছিল খাবার-দাবারের প্রতি। মেলায় গুড় দিয়ে বানানো একধরনের কটকটি পাওয়া যেত। সেগুলো দারুণ মজার ছিল। বড়রা যেগুলোতে বিরক্ত হতেন, সেগুলো আমরা বেশি করে করতাম। মাটির দুই চাকা লাগানো টমটম পাওয়া যেত, যেটা সুতা দিয়ে বেঁধে টেনে নিলে ডামডাম আওয়াজ হতো। সেই শব্দটা শুনে বড়রা কেন এত বিরক্ত হতেন, তা এখন বুঝি। একটু যখন বড় হয়েছি, তখন বন্ধুরা মিলে মেলায় গিয়ে একতারা কিনতাম। আমাদের মধ্যে অনেকেই তখন একতারায় সারগাম বাজাতে পারতো। পাড়ায় পাড়ায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বাষট্টি সালের দিকে মোটামুটি বড় আকারে ঢাকায় পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়ে গেছে। পুরান ঢাকায় সবচেয়ে বড় আয়োজনগুলো থাকতো। অবস্থাপন্ন সবার বাসায় এ দিনে নানান ধরনের মিঠাই-মন্ডা ও মুড়ি-মুড়কির ব্যবস্থা থাকতো। সবাই খুব আশা করতেন, যেন তার বাসায় অতিথি আসেন। হিন্দুরা এ দিনে বিভিন্ন ধরনের পূজার ব্যবস্থা করতো। তখনো এ উৎসব উদ্যাপনের কেন্দ্র ছিল রমনা ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। সবাই এখানে বেড়াতে আসতো। বটমূল আর শাহবাগকে ঘিরেই হতো যতো আয়োজন।’
আর এখন?

‘খুব ভোরে হয়তো ওঠা হয় না, তবু পয়লা বৈশাখে অন্তত একবার চেষ্টা করি রমনার বটমূলে যেতে। যদিও ২০০১-এ বোমা হামলার পরে অনেক বছর যাইনি, বাসার অনুমতি ছিল না।’ বলছিলেন ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া। যোগ করলেন, ‘শিকড়ের টানে যাই কি না জানি না, তবু ভালো লাগে ওখানে যেতে। মনে হয়, অন্তত একবার রমনার বটতলে না দাঁড়ালে ওই দিনটি পয়লা বৈশাখই হয়ে উঠলো না। শাড়ি পরি, ঘুরি। কনসার্ট দেখি। সবচেয়ে মজার হলো বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে গেট টুগেদার। এই তো।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামি আল মেহেদী বটতলায় নয়, পয়লা বৈশাখকে ধারণ করতে চান মনে। তবে চারুকলার শিক্ষার্থী দিপা মনে করেন, শিকড়ের সঙ্গে জুড়ে থাকার অভ্যেস না থাকলে কিছুই মনে দাগ কাটে না। একটু কষ্ট হলেও প্রত্যেক বাঙালির উচিত পয়লা বৈশাখের মূল উৎসবে অংশগ্রহণ করা। কারণ, শিকড়ে জুড়তে না পারলে কোনো দিনই নিজের অস্তিত্ব নিয়ে গর্বিত হওয়া যায় না।

কে জানে, হয়তো এটাই আমাদের ভবিষ্যৎ। মনে মনে জুড়ে থাকা। শিকড়ে। বটমূলের ঝুরিতে। বটমূলকে উপলক্ষ করে কী কী হয় পয়লা বৈশাখে, ভাবুন একবার। বৈশাখ আবাহন শেষ হতে না-হতেই পান্তা ইলিশ আর শতপদী ভর্তার আয়োজন। চিড়া, খই, বাতাসা আর মুড়ি-মুড়কিতে সাদা রমনার সবুজ ঘাস। খোঁপায় ফুল গুঁজে অথবা পাঞ্জাবির আস্তিনটা গুটিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা এলোমেলো আড্ডায় গড়িয়ে যাওয়া নাগরিক বৈশাখ। মঞ্চ, বেদি থেকে শুরু করে বসার আয়োজন সবই পরিবর্তিত হয়েছে সময়ের পালাবদলে।


কিন্তু এই কি সব? আদতেই কি এভাবে শিকড় মরে আসবে আমাদের? বটপাতা হয়ে আসবে হলদে, লালচে, ধূসর? ‘মনে তো হয় না।’ বললেন সাদিয়া, সামি আর দিপা তিনজনেই। তাঁদের একই কথা এটা ঠিক যে দিন দিন আমরা প্রকৃতিবিমুখ হয়ে উঠছি, নিজেরাই কেটে সাবাড় করছি সবুজ গাছপালা। নদীর পাড়ে ও পাকুড়তলায় রথের মেলাও হয়তো হারিয়ে যাবে। একদিন হয়তো রমনার এই বটগাছও স্মৃতি হয়ে যাবে। তবে বটমূল কোনো দিনই মন থেকে হারানোর নয়। আমাদের অনুভবে সব সময় রয়ে যাবে সেই বটতলার বাউলগানের উৎসব, যাত্রাপালা, পয়লা ফাল্গুন, পয়লা বৈশাখ, চড়কের মাঠ। শিকড় ছাড়া তো গাছও বেঁচে থাকতে পারে না, মানুষ কীভাবে বাঁচবে?