Health Image

মূলার পুষ্টিগুণ



মুলা তরকারীর নাম শুনলেই আমরা অনেকেই নাক কুঁচকে ফেলি। এটা খাবারযোগ্য একটি তরকারী হতে পারে তা আমাদের অনেকেরই কল্পনার বাইরে।নাহ এত ফেলে দেয়ার মত সব্জী মুলা নয়। জাপানীদের অন্যতম প্রধান একটি খাবার মুলাতে আসুন দেখি কি আছে ? আমাদের দেশে সারাবছরই বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি ও ফলের চাষ করা হয়। তবে মূলা সাধারণত শীতকালে বেশি চাষ হয়। এর ইংরেজি নাম Radish ও বৈজ্ঞানিক নাম Raphanus sativus. প্রতিবছর আমাদের দেশে প্রচুর মূলা উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশে প্রায় সব অঞ্চলেই মূলা চাষ করা হয়।

আমাদের দেশের প্রায় সব শ্রেণীর মানুষের কাছে মূলা বেশ জনপ্রিয় সবজি। মূলা সালাদ, তরকারি ও ভাজি হিসেবে খাওয়া হয়ে থাকে। আবার মূলার পাতা শাক হিসেবেও খাওয়া হয়। তাই মূলা চাষ করে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদন বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব। এছাড়া দেশের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত উৎপাদন বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সহায়তা দিয়ে থাকে। মূলা বিদেশে রপ্তানি করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।



মূলা পাতা ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’, ও ‘সি’ সমৃদ্ধ।
মাংসল, খাবার উপযোগী মূলে আছে কিছুটা ভিটামিন ‘সি’, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। মুলা নানাভাবে ব্যবহূত হয়, পাতা শাক হিসেবে, মূল মাছ ও অন্যান্য সবজির সঙ্গে তরকারি হিসেবে এবং সালাদে, কখনও আচারে।

সাধারণত রবি-ফসল হিসেবে চাষ হয়, গ্রীষ্মকালেও কিছুটা ফলানো যায়। চাষাধীন প্রায় ২৪,৩৭২ হেক্টর জমিতে ফলন হয় প্রায় ২,২৩,৩০০ মে টন। নামী ভ্যারাইটির কয়েকটি Red Bombay, Minto Early, Mino Saki। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট তিনটি জাতের মুলা অবমুক্ত করেছে; তসোকিষান (লম্বা, সাদা মূল), পিংকি (বেশি ঝাঁঝালো, লালচে মূল), দ্রুতি (সাদা, রঙিন, আশু জাত)।


মুলার পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা:
মুলা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ শীতকালীন সবজি, যা দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। মুলা সাধারণত সাদা, লাল ও হালকা গোলাপি রঙের হয়ে থাকে।

পুষ্টিগুণ:
১০০ গ্রাম মুলা থেকে ১৬ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ১.৬ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ২৫ মাইক্রোগ্রাম ফলেট, ১৪.৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ২৩৩ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ২৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.২৮ মিলিগ্রাম জিংক এবং ১০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্যতথ্য:
* মুলার ক্যারোটিনয়েডস চোখের দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখে এবং ওরাল, পাকস্থলী, বৃহদন্ত, কিডনী এবং কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে।
* মুলার ফাইটোস্টেরলস হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
* জন্ডিস আক্রান্ত হলে মুলা রক্তের বিলিরুবিনের কমিয়ে তাকে একটি গ্রহনযোগ্য মাত্রায় নিয়ে আসে যা কিনা জন্ডিসের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী।
* মূলা মানুষের ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করে এবং নকম ক্যালরিযুক্ত সবজি হওয়ায় দেহের ওজন কমাতে সাহায্য করে।
* অর্শের প্রধান কারন হচ্ছে কোষ্ঠকাঠিন্য। প্রচুর আঁশ সমৃদ্ধ সব্জী মূলা খাদ্যের পরিপাক ক্রিয়াকে গতিশীল করে হজমে সহায়তা করে, যা অর্শ রোগের আশংকাকে নির্মুল করে দেয়।
* রক্ত পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে। সেই সাথে লিভার এবং পাকস্থলীর সমস্ত দুষন এবং বর্জ্য পরিস্কার করে থাকে।
* মুলা কিডনি রোগসহ মূত্রনালির অন্যান্য রোগে উপকারী।
* শ্বেত রোগের চিকিৎসায় মূলা ফলদায়ক। এন্টি কারসেনোজিনিক উপাদান সমৃদ্ধ মুলার বীজ আদার রস এবং ভিনেগারে ভিজিয়ে আক্রান্ত জায়গায় লাগাতে হবে। অথবা কাঁচা মূলা চিবিয়ে খেলেও কাজ হবে।
* মুলার রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে কফ, মাথাব্যথা, অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
* পোকামাকড়ের কামড় থেকে সৃষ্ট ক্ষত নিরাময়ে মুলার রস কার্যকরী।
* জ্বর এবং এর কারনে শরীর ফুলে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে অত্যন্ত উপকারী সব্জী মূলা।
* ত্বক পরিচর্যায়ও মুলা ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। কাঁচা মুলার পাতলা টুকরা ত্বকে লাগিয়ে রাখলে ব্রণ নিরাময় হয়। এছাড়া কাঁচা মুলা ফেস প্যাক এবং ক্লিন্সার হিসেবেও দারুন উপকারী।

জন্ডিস
রক্তের দুষন পরিস্কার করায় বিশাল এবং সেই সাথে শক্তিশালী এক ক্ষমতা রয়েছে মুলায়।যা আমাদের লিভার এবং পাকস্থলীর সমস্ত দুষন এবং বর্জ্য পরিস্কার করে থাকে।এছাড়াও মুলা জন্ডিসের অন্যতম কারন বিলিরুবিনের পরিমান কমিয়ে তাকে একটি গ্রহনযোগ্য মাত্রায় নিয়ে আসে যা কিনা জন্ডিসের চিকিতসার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এমনকি মুলা রক্ত কনিকায় অক্সিজেন সরবরাহের পরিমান বাড়িয়ে তুলে, ফলে জন্ডিস রোগটি যে আমাদের শরীরের রক্ত কনাগুলো ভেঙ্গে ফেলে তার পরিমান কমিয়ে আনে।

অর্শ
অর্শের প্রধান কারন হচ্ছে কোষ্ঠকাঠিন্য।প্রচুর আঁশ সমৃদ্ধ সব্জী মুলা অত্যন্ত সাফল্যের সাথে এই দিকটি মোকাবেলা করে থাকে। খাবার হজম করার এক শক্তিশালী উপাদান মুলা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই রোগের আশংকাকে নির্মুল করে দেয়।আর এর মাঝে যে পানি রয়েছে তা পরিপাক ক্রিয়াকে গতিশীল করে তোলে।

ওজন কমানো
আজকাল সবাই স্লিম ফিগারের অধিকারী হতে চায়। কেউ পছন্দ করে না সে মুটু হোক।তাছাড়া এই স্থুল স্বাস্থ্য অনেক রোগের আবাস। স্লিম হওয়ার জন্য কত প্রচেষ্টা, কত ডায়েট কত জিম কত কিছু। কিন্ত মুলা খুব সহজেই আপনাকে আপনার চাহিদামত স্বাস্থ্যের অধিকারী করে তুলবে। মুলা মানুষের ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে তাছাড়া এতে ক্যালোরীর পরিমান খুব কম। আরো রয়েছে প্রচুর পরিমান আঁশ, পানি এবং হজমযোগ্য শর্করা।এটা ডায়েটিং এর জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি উপাদান, কারন মুলায় ক্ষুধা নিবৃত্ত হয়।কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে শরীরের মেটাবলিজমে সাহায্য করে ওজন কমায়।

ক্যান্সার
ক্যান্সার শুনলেই আমরা ভয়ে শিউরে উঠি। আজ পর্যন্ত ক্যান্সারের পরিপুর্ন চিকিতসা আবিস্কৃত হাই লেভেল ভিটামিন সি,এন্টি অক্সিডেন্ট এবং শরীরের দুষন দূর করার ক্ষমতাসম্পন্ন মুলা ওরাল,পাকস্থলী,বৃহদন্ত,কিডনী এবং কোলন ক্যান্সার চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত। ক্যান্সারের সেল নির্মুলেও এর অবদান রয়েছে।

শ্বেতী রোগ
আমরা দেখি শ্বেত রোগ নিয়ে ভয়াবহ এক মানসিক দুঃশ্চিন্তায় জীবন অতিক্রম করছে অনেকেই । সমাজে মুখ দেখানো তাদের জন্য অসহনীয়। কিন্ত রোগটি ছোয়াচে নয়, শরীরের রং উদপাদনকারী তার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ায় এই বিপর্যয়।শ্বেত রোগের চিকিৎসায় মুলা অত্যন্ত কার্য্যকরী।এন্টি কারসেনোজিনিক উপাদান সম্বরদ্ধ মুলার বীজ আদার রস এবং ভিনেগারে ভিজিয়ে লাগাতে হবে। নাহলে কাঁচা মুলা চিবিয়ে খেলেও হবে।

স্কিনের সমস্যা
প্রচুর পরিমান খনিজ এবং ভিটামিনে পুর্ন মুলা স্কিনের বিভিন্ন সমস্যায় অত্যন্ত উপকারী। বিভিন্ন ক্ষত সারানো ছাড়াও কাচা মুলা ফেস প্যাক এবং ক্লিন্সার হিসেবেও দারুন উপকারী।

পোকার কামড়
মৌমাছির হুল অথবা যে কোন পোকা মাকড়ের কামড় দিলে মুলার রস লাগিয়ে দিবেন।সাথে সাথেই ফোলা এবং ব্যাথা কমে যাবে।

জ্বর
জ্বর এবং এর কারনে শরীর ফুলে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে অত্যন্ত উপকারী সব্জী মুলা।

কিডনী রোগ
কিডনীর অকার্যকরতায় মুলা অত্যন্ত্য উপকারী।কারন এতে রয়েছে সংক্রমন দূর, পরিস্কার করার ক্ষমতা এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মুলার প্রচুর পানি কিডনীর ভেতরে জমে থাকা সমস্ত দূষনকে দূর করে দেয়।

শ্বাস নালীর সংক্রমন
আমাদের শ্বাসনালী প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কারনে সংক্রমিত হচ্ছে।যেমন এলার্জি,ইনফেকশন, ঠান্ডা লাগা ইত্যাদি। মুলা এসব রোগ নির্মুল করে এছাড়াও বিভিন্ন সংক্রমন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

লিভার এবং গলব্লাডার
লিভার এবং গলব্লাডার চিকিতসায় মুলা অত্যন্ত কার্যকরী।মুলা বিলিরুবিন, বাইলস,এনজাইমস,এবং এসিড উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রন করে থাকে।
এছাড়াও নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ, ক্ষুধা বৃদ্ধি, হুপিং কফ, গলায় ক্ষত, এসিডিটি, বমিভাব, মুত্রনালীর প্রদাহ এবং মাথা ব্যাথার জন্য অত্যন্ত উপকারী। কাঁচা মুলা আলসার এবং বিভিন্ন সংক্রমন থেকেও রক্ষা করে।

সতর্কতা:
যাদের থাইরয়েড গ্রন্থি, বুকজ্বলার সমস্যা আছে তাদের মুলা খাওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।