Entertainment Image

রবীন্দ্রসাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে পিছিয়ে বাংলাদেশ



বাঙালি জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বিরাট অংশজুড়ে আছে। প্রেম থেকে একেবারে বিরহ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের বিস্তার টের পাওয়া যায়। যাপিত জীবনে রবীন্দ্রনাথের অভাব ও প্রভাব বোধে আসলেও কিংবা প্রতিনিয়ত রবীন্দ্রনাথকে বাঙালি জীবনের একাটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেবে আসলেও কার্যত কি বাস্তবিক জীবনে তার দৃষ্টান্ত আমরা দেখাতে পারছি? তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কি আমরা পর্যাপ্ত কাজ করতে পেরেছি?

মোটেও না, প্রকৃতপক্ষে বাঙলায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হুজুগটা একটু বেশী থাকলেও রবীন্দ্র সাহিত্য নির্ভর শিল্পকর্ম সেই তুলনায় প্রায় অনুপস্থিত! বিশেষ করে চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র সাহিত্যের উপস্থিতি একবারে নেই বললেই চলে। এর প্রকৃত কারণ কি? দৈন্যতা কার? রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যনির্ভর সিনেমা নির্মাণ করলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে এইজন্যই কি আমাদের দেশের নির্মাতারা রবীন্দ্রনাথে আগ্রহী না, নাকি নির্মাতাদের মননশীলতার অভাব?

১৯৫৭ সালে এফডিসি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর ১৯৭১ পর্যন্ত প্রায় আড়াইশোর বেশী সিনেমা নির্মাণ হলেও রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ থাকায় তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। কিন্তু ৭১এর পর থেকে নির্মাতা চাষি নজরুল ইসলাম ও হাতেগোনা দুয়েকজন ছাড়া কাউকেই কি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য এতোটুকু আগ্রহী করলো না? নাকি পাকিস্তানিদের চাপিয়ে দেয়া সেই ভুত আমাদের গাড়ের উপর এখনো চড়ে বেড়াচ্ছে?

তবে যাই হোক, বাংলাদেশের নির্মাতাদের রবীন্দ্রসাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র বিশেষ আগ্রহী করতে না পারলেও পশ্চিম বাংলার নির্মাতারা কিন্তু ঠিকই এই কাজটি করেছেন। তারা রবীন্দ্রনির্ভর সাহিত্যকে প্রাধান্য দিয়ে পর্যাপ্ত কাজ করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন। তবে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য থেকে সেরা পাঁচ সিনেমার তালিকায় স্বপ্নগ্রস্ত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়কেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কারণ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের পাতা থেকে নেয়া চরিত্রগুলোকে সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে এতো নান্দনিকভাবে বাংলা সিনেমায় আর কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি। তারপর দুটি ‘নৌকাডুবি’ এবং ‘চোখের বালি’র জন্য সেরা পাঁচের তালিকায় রাখা হয়েছে মেধাবী নির্মাতা ও অভিনেতা ঋতুপর্ণ ঘোষকে। চরিত্রের বিকাশ, নান্দনিক ভাবনা ও ম্যাকিংয়ের বিবেচনায় পাঁচটি সিনেমা যথাক্রমে সত্যজিৎ রায়ের তিন কন্যা, চারুলতা, ঘরে বাইরে এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের নৌকা ডুবি ও চোখেরবালি।

তিন নারীর উপাখ্যান ‘তিন কন্যা’...
তিন কন্যা সত্যজিৎ রায় পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র যা ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তি পায়। এটি প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোট গল্প থেকে করা তিনটি চলচ্চিত্রের সংকলন। রবী ঠাকুরের তিনটি গল্পের তিনটি প্রধান চরিত্রই নারী, এই তিন নারী চরিত্রকে বোঝানোর জন্য সিনেমার নাম দেয়া হয়েছে তিন কন্যা। এর মধ্যে প্রথম সিনেমা পোস্টমাস্টার-এ কন্যা থাকে খুব ছোট, ৮-৯ বছরের হবে। দ্বিতীয় সিনেমা মণিহারা-তে কন্যা থাকে বিবাহিতা, ২০-২৫ তো হবেই। আর তৃতীয় ও শেষ সিনেমা সমাপ্তি-তে কন্যা থাকে ষোড়শী।

পরিপক্ক সম্পর্ক আর প্রেমের ছবি ‘চারুলতা’...
শুধু সত্যজিৎ -এর নয় রবীন্দ্র সাহিত্যনির্ভর এ যাবৎ নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যতম ভাবা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় গল্প নষ্টনীড় অবলম্বনে এর চিত্রনাট্য করা হয়েছে। ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি ইংরেজিভাষী বিশ্বে The Lonely Wife নামে পরিচিত। সার্থক চিত্রায়নের খাতিরে এতে গল্পের কাহিনী খানিকটা পরিবর্তন করা হয়েছে। সত্যজিৎ রায় তার নিজের ছবিগুলোর মধ্যে চারুলতাকে আলাদা গুরত্ব দিতেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি পরিষ্কার বলেছেন ‘এটিই একমাত্র ছবি যা আজও বানালে ঠিক এভাবেই বানাতাম। এমন মন্তব্যই আসলে বলে দেয় এ ছবির নির্মাণ নিয়ে তিনি কতোটা সন্তুষ্ট ছিলেন। মানব সম্পর্ক, মনোদৈহিক টানা-পোড়েন, ব্যক্তি প্রেম ও স্বকীয়তা ইত্যাদি পরিপক্ক বিষয় নিয়ে এ ছবিতে খেলেছেন তিনি। ১৯৬৫ সালে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এটি সেরা চলচ্চিত্রের পুরষ্কার পায়। আগের বছর বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার বেয়ার পুরস্কার জেতে এটি।

নারী মুক্তির বার্তা নিয়ে ‘ঘরে বাইরে’...
রবীন্দ্র সাহিত্য নির্ভর সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম একটি চলচ্চিত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত একই নামের একটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৮৪ সালে। এই ছবিতে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, জেনিফার কাপুর ও স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। সত্যজিৎ রায় ১৯৪০-এর দশকে তাঁর প্রথম ছবি পথের পাঁচালী নির্মাণেরও আগে এই ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন। এই ছবির বিষয়বস্তু নারীমুক্তি, যা সত্যজিতের বহু ছবিতে বহু ভাবে উঠে এসেছে। নারীর মুক্তিকামনার তার ভালবাসার পাত্রকে কিভাবে স্পর্শ করে, তা এই ছবিতে বিশেষভাবে পরিস্ফুট। ছবিটি ১৯৮৪ কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম ডি'অর-এর জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে দেখানো হয়।

ঝড়ের কবলে সম্পর্কের নৌকাডুবি...
ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র, যা জানুয়ারি ২০১১-তে মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে।

পুরুষের যৌন আধিপত্যের গল্প চোখের বালি...
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখের বালি উপন্যাস অবলম্বনে চিত্রায়িত। এটি পরিচালনা করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং অভিনয় করেছেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় রাইমা সেন। পরে এটি হিন্দিতে মুক্তি পায় এবং এই ভাষাতেই আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তির পরে, চোখের বালি ইতিবাচক সমালোচনা এবং ভালো ব্যবসা করে।