শাহ আজিজ

২ বছর আগে

হযরত আলী (রা): উত্তাল গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মুসলিম বিশ্বের কর্ণধার

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) পরলোকগমনের ২৫ বছর পর ভয়ংকর এক পরিস্থিতিতে পড়ে মুসলিম বিশ্ব; সে অবস্থাতেই খলিফার দায়িত্ব পান হযরত আলী (রা)। অনেকেরই ধারণা ছিল প্রথম খলিফাই হয়ত আলী (রা) হবেন যেহেতু তিনি নবীজীর সরাসরি আত্মীয়, চাচাতো ভাই। কিন্তু যোগ্যতর হিসেবে আবু বকর (রা), উমার (রা) ও উসমান (রা) প্রথম তিন খলিফার দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে যখন আলী (রা) এর পালা এলো, তখন তাঁর উপর এক খড়গ- তিনি কি উসমান (রা) এর হত্যাকারীদের শাস্তি দেবেন? না দিলে কেন নয়? ওদিকে এই অন্যায় ও জঘন্য হত্যার বিচার চেয়ে বিশিষ্ট সাহাবীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে আন্দোলনের দাবানল শুরু হয়ে গেলো, এবং সেই আন্দোলনে যারা যোগ দিলেন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এমন কোনোদিনই কল্পনা করেননি আলী (রা)।

কেন হয়েছিল নবীর ভাই আলী (রা) আর নবীজীর স্ত্রী আইশা (রা) এর মাঝে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ? কী হয়েছিল মুসলিম ইতিহাসের রক্তাক্ততম গৃহযুদ্ধ ‘সিফফিনের যুদ্ধে’ যেখানে হযরত আলী (রা) তাঁর বাহিনী নিয়ে মুখোমুখি হন মুয়াবিয়া (রা) এর বিশাল বাহিনীর? অথচ দুজনেই কম-বেশি ছিলেন নবীর প্রিয়পাত্র, এমনকি দু’পক্ষের সাহাবীরাও ছিলেন নবীর চোখের মণি! কেন হযরত আলী (রা) এর বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী তাঁকে ত্যাগ করে চলে যায়? কী ছিল উভয় পক্ষের দাবি? কীভাবে ও কাদের হাতে শেষমেশ আলী (রা) নিহত হন?

ইসলামের ইতিহাসের ভয়াবহ এই অধ্যায় তুলে ধরবার জন্য আমরা শরণাপন্ন হয়েছি বিশুদ্ধতম ইতিহাসগ্রন্থগুলোর, যেন পাঠকদেরকে একটি নিরপেক্ষ ইতিহাস উপহার দেওয়া যায়। এ অধ্যায়ের কাহিনীগুলো বুঝবার জন্য পাঠকদেরকে পেছনের কিছু ঘটনা মনে করিয়ে দেওয়া হবে যেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছিল আলী (রা) এর শাসনামলে। চলুন তবে ডুবে যাওয়া যাক ১৪০০ বছর আগের আরবে, একটি অস্থির সময়ে, যখন সবে মাত্র নির্মমভাবে মারা গেলেন মুসলিম বিশ্বের খলিফা উসমান (রা)।

২০০৬ সালে ভ্যাটিকানের একজন আর্চবিশপ জনপ্রিয় হলিউড মুভি ‘দ্য ডা ভিঞ্চি কোড’ বয়কট করবার আহ্বান জানান খ্রিস্টান বিশ্বকে; মুভিটি একই নামের বই থেকে নির্মিত যার লেখক ড্যান ব্রাউন। কেন এ আহ্বান? কারণ আর্চবিশপের মতে, এ মুভিটি “ঐতিহাসিক ভুলে ভরা এবং অবমাননাকর“। এ বইতে (বা মুভিতে) বলা হয়েছে যে, যীশু খ্রিস্ট ছিলেন মেরী ম্যাগডালিন নামের একজন সঙ্গিনীর সাথে বিবাহিত এবং তাদের বংশধারা পরবর্তীতে ইউরোপে রাজকীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। ড্যান ব্রাউনের দাবিগুলো কতটা সঠিক সেটা আমরা অন্য পোস্টে আলোচনা করব, এখানে নয়; কেবল এটুকুই এখানে আমরা বলব যে, এ সুখপাঠ্য গল্পে আসলেই সত্যের সাথে মিশিয়ে ঐতিহাসিক ভুল তথ্য আছে। আপনি যখন উপন্যাস হিসেবেই পড়বেন, তখন কোনো আপত্তি নেই; আপত্তি তখনই যখন আপনি বিশ্বাস করে বসবেন ঘটনা সত্য। আপনি হয়ত ভাবছেন, আলী (রা) নিয়ে পড়তে এসে এ আমি কী পড়ছি।এ কারণে বললাম যে, আমাদের দেশেও একটি প্রায় কাছাকাছি একটি ঘটনা আছে। বলছি বাংলার প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১২) কথা। তাঁর সুখপাঠ্য উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’ একটি অসাধারণ গল্প- এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো এটাই যে আমাদের দেশে জনসাধারণের মাঝে ধারণা রয়েছে যে এ বইতে বর্ণিত ঘটনাগুলো ঐতিহাসিক সত্য। যেটা সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। যেহেতু তিনি শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী পরিবারে বড় হয়ে উঠেছেন, তাই তাঁর লেখাতেও ‘ড্রামাটিক’ প্রভাব আনবার ব্যাপারে স্পষ্ট প্রভাব ছিল শিয়া উপকথা ও লোককাহিনীর, শিয়া ইতিহাসগ্রন্থের নয়। এ পোস্টটি পড়বার আগে পাঠকদের কাছে অনুরোধ থাকবে এ বই বা এ বইয়ের সাথে মিল থাকা পূর্বলব্ধ যেকোনো বদ্ধমূল ধারণা থেকে থাকলে সেটি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে এবং ইতিহাস জানবার জন্য সত্যি সত্যি কোনো প্রামাণ্য ইতিহাস বই পাঠ করতে।

আবু তালিবের ঔরসে জন্ম নেওয়া আলী (রা) ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আপন চাচাতো ভাই। তাঁর মা ছিলেন ফাতিমা বিনতে আসাদ। শিয়া মতবাদে বিশ্বাস করা হয় যে কাবা শরীফের ভেতরে তাঁর জন্ম হয় এবং ঐশ্বরিকভাবে তাঁর নাম রাখা হয় আলী। কিন্তু সুন্নি মতবাদে হাকিব ইবনে হিজাম-কেই ধরা হয় কাবার ভেতরে জন্মগ্রহণ করা একমাত্র ব্যক্তি, যিনি মহানবী (সা) এর মক্কা জীবনে তাঁর প্রতিবেশী ছিলেন।

আলী (রা) ছিলেন কম বয়সীদের মাঝে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী, তখন তাঁর বয়স প্রায় ১০। মদিনায় হিজরতের পর তিনি নবী কন্যা ফাতিমা (রা)-কে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে জন্ম নেন হাসান (রা) ও হুসাইন (রা)। ফাতিমা (রা)-এর মাধ্যমে চলে আসা এ বংশধারাকে ‘আহলে বাইত’ বলা হয় যার অর্থ ‘(নবীর) ঘরের মানুষ’/’নবী-পরিবার’। উসমান (রা) এর নিহত হবার পর অনেক কাহিনীর পর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আলী (রা)। সুন্নি মতবাদে এ ক্ষমতাগ্রহণ সঠিক হলেও, শিয়া মতবাদ অনুযায়ী পূর্বের তিন খলিফা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা নিয়েছিলেন যেখানে ক্ষমতার অধিকার একমাত্র আলী (রা) ও আহলে বাইতের। এ ধারণার পার্থক্য থেকেই মূলত এ শ্রেণীবিভাগ সৃষ্টি হয়েছিল। ‘শিয়া’ শব্দটি ‘শিয়াতু-আলী’ শব্দের সংক্ষেপ যার অর্থ ‘আলীর সমর্থক’। আর সুন্নি বলতে বোঝায় যারা ‘সুন্নাহ’ অনুসরণ করে, সুন্নাহকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এ বিভাগ পুরোপুরি বুঝবার জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হবে পেছনের কিছু কাহিনীর দিকে যেটা নিয়ে আমরা খুব সংক্ষেপে ধারণা দিয়ে যাব।

তাবীঈ থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে যে, “জুলফিকারের মতো কোনো তলোয়ার নেই, আলীর মতো কোনো বীর নেই।” ইংল্যান্ডের উপকথা কিং আর্থারের কাহিনীতে ‘এক্সকালিবার’ নামের জাদুকরি তরবারির যত খ্যাতি ছিল, মুসলিম বিশ্বে তার চেয়েও অনেক বেশি খ্যাতি আলী (রা) এর তরবারি জুলফিকারের। ইতিহাস অনুযায়ী, বদর যুদ্ধে লব্ধ সম্পদের মাঝে এ তরবারি ছিল, যেটি রাসুল (সা) উপহার দেন আলী (রা)-কে। কিন্তু শিয়ারা বিশ্বাস করে থাকেন, জিবরাঈল (আ) বেহেশত থেকে এ তরবারি নিয়ে আসেন। এ তরবারির মাথা দু’ভাগ করা ছিল, এ কারণে এর নাম ছিল ‘জুলফিকার’ (‘দু ভাগে ফাঁড়া’), যদিও ভাবানুবাদে এর অর্থ ‘যা ফেড়ে দেয়’। ঐতিহাসিক তরবারি হলেও ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে জুলফিকার, এর খোঁজ এখন পাওয়া যায় না। শিয়া মতবাদে বিশ্বাস করা হয়, দ্বাদশ ইমাম মাহদির কাছে এ তরবারি রক্ষিত আছে, তিনি নিয়ে আসবেন।


খায়বার অভিযানের আগে অসুস্থ থাকলেও, আলী (রা) দুর্গের দরজা নিজের হাতে তুলে নেন এবং সেটাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে করতে এগিয়ে যান। এ ঘটনা দেখে হতবাক সাহাবীরা পরে চেষ্টা করেন সেই দরজা নিজেরা তুলবার, কিন্তু সাতজন মিলেও তারা পারেননি। তিনি ‘আসাদুল্লাহ’ (আল্লাহ্‌র সিংহ) উপাধি পান। তাঁর আরেকটি উপাধি ছিল ‘আবু তোরাব’ (‘ধুলোবালির বাপ’), কারণ একদিন নবী (সা) মসজিদে গিয়ে দেখলেন আলী (রা) ধুলোবালি মাখা অবস্থায় মাটিতে শুয়ে আছেন। [মুসলিম শরিফ] তখন তিনি তাঁকে এ নাম দেন। তাছাড়া ‘আবুল হাসান’ (হাসানের বাবা) নামেও তাঁকে ডাকা হতো।

পেছনের যে ঘটনাগুলো জানা দরকার তার মাঝে প্রথম ঘটনা হলো ‘গাদির খুম’-এর ঘটনা। ‘গাদির’ অর্থ হ্রদ। খুম হ্রদের পাড়ে যে ঘটনা হয়েছিল সেটাই গাদির খুমের ঘটনা। বিদায় হজ্বের ভাষণ শেষ করে কাফেলা ৬৩২ সালের ১৫ মার্চ (১৮ জিলহজ্ব) রবিবার খুম হ্রদের তীরে এসে ভিড়ে। জায়গাটা মক্কা আর মদিনার মাঝামাঝি। ওদিকে একটি যুদ্ধ সেরে বিজয়ী আলী (রা) নিজেও এই জায়গায় এসে যোগ দিলেন। সহিহ মুসলিমের ২৪০৮ নং হাদিস থেকে এ ঘটনা জানা যায়। সেদিন আলী (রা) এর সাফল্যে খুশি হয়েছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (সা)। তিনি বললেন, “আমি তোমাদের মাঝে দুটো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রেখে যাচ্ছি- কুরআন এবং আহলে বাইত। আল্লাহ্‌র বইকে তোমরা ধরে রেখো (বা মেনে চলো)। আর আমার পরিবারের ব্যাপারে আল্লাহ্‌কে ভয় করো (তিনবার বললেন)।” একই হাদিসে উল্লেখ করা হয়, নবীর স্ত্রীরাও তাঁর পরিবারের মানুষ এবং নবী পরিবারের কেউ যাকাত নিতে পারবেন না। [তবে অন্য এক হাদিসে যে দুটো জিনিস রেখে যাবার কথা বলা হয়েছে সেগুলো ছিলো কুরআন ও সুন্নাহ। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)]

শিয়া ও সুন্নি উভয় মতবাদের মুসলিমরাই এক বাক্যে স্বীকার করে নেয় নবী পরিবারের সদস্যরা উচ্চ সম্মানের দাবিদার। নবী (সা) আরও বললেন, “তুমি আমার, আমি তোমার” (গাদির খুম ব্যতীত হয়ত অন্য এক সময় এটা বলে থাকতে পারেন) এবং “আমি যার মাওলা, আলীও তাঁর মাওলা” আরবি শব্দের বহু-অর্থ থাকবার কারণে এ বাক্য থেকে শিয়া ও সুন্নি মতবাদে ভিন্ন ব্যাখ্যা করা হয়। মাওলা অর্থ যেমন অভিভাবক হতে পারে, তেমন বন্ধুও হতে পারে। এ কথা থেকেই শিয়াগণ বলে থাকেন যে আলী (রা)-কে সেদিন নবী (সা) খলিফা নির্বাচিত করে যান। কিন্তু সুন্নিরা বিশ্বাস করে থাকেন যে, সেদিন হযরত মুহাম্মাদ (সা) আলী (রা)-কে সকল মুসলিমদের বন্ধু বলে সম্মানিত করেছিলেন। এটা মানতে কোনো সাহাবীরই আপত্তি ছিল না। সুন্নিরা বলে থাকেন, যদি আসলেই আলীকে হযরত মুহাম্মাদ (সা) নেতা নির্বাচন করে দিয়ে যান, তবে কি আবু বকর (রা), উমার (রা) বা উসমান (রা) এর মতো বড় সাহাবীরা জানতেন না সেটা? তাহলে তারা অবশ্যই শুরুতেই ক্ষমতা আলী (রা) এর হাতে সমর্পণ করতেন।

এরপর যে ঘটনা বলা প্রয়োজন সেটা হলো কাগজ-কলমের হাদিস। ঘটনাটা ঘটেছিল বৃহস্পতিবার, যখন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) মৃত্যুশয্যায়। বুখারি (৬৯৩২) ও মুসলিম (১৬৩৭) [কিংবা সহি ইন্টারন্যাশনাল ভার্শন বুখারি 7:70:573] শরীফের হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, সেদিন নবীজী (সা) হঠাৎ বলে উঠলেন, “এসো, আমি তোমাদের জন্য লিখে দিয়ে যাই এমন কিছু যার পরে তোমরা কেউ বিপথগামী হবে না।” তখন উমার (রা) অসুস্থ নবী (সা)-কে দেখে বললেন, “দেখো সবাই, রাসুল (সা) কত ব্যথায় আছেন, আমাদের কাছে থাকা কুরআনই যথেষ্ট।” কেউ কেউ বললেন, না, রাসুল (সা) লিখে দিন। আবার কেউ কেউ বললেন, উমার (রা) ঠিক বলেছেন, রাসুল (সা) কষ্টে আছেন। যখন এই উচ্চবাচ্য তর্ক বিতর্ক বেশি হয়ে গেলো, তখন রাসুল (সা) আর সইতে না পেরে বললেন, “তোমরা সরে যাও এখান থেকে।” এ ঘটনা থেকে শিয়ারা দাবি করে থাকেন সেদিন উচ্চবাচ্য না হলে রাসুল (সা) তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে আলী (রা) এর নাম লিখে দিয়ে যেতেন নিশ্চিতভাবে। সুন্নিরা বলে থাকেন, যদি সেটা এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতো, তবে আল্লাহ্‌ কখনো সেটা না লিখিয়ে নবী (সা)-কে পরলোকগমন করতে দিতেন না।

এখন যে পেছনের ঘটনাটার কথা বলব সেটি ইসলামি ইতিহাসে ‘নেকলেসের ঘটনা’ নামে পরিচিত। ঘটনাটি বুখারি শরীফে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নবী (সা) বিভিন্ন অভিযানের সময় একজন স্ত্রীকে নিয়ে যেতেন লটারি করে বাছাই করে। মুস্তালিক অভিযানের সময় ওঠে স্ত্রী আইশা (রা) এর নাম। হিজাবের আয়াত এর আগেই চলে আসার কারণে আইশা (রা)-কে যে উটে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তার পিঠে ছিল একটি হাওদা (পর্দা ঘেরা জায়গা যার ভেতরে তিনি বসতেন)। ফিরে আসার সময় মদিনার কাছাকাছি এক জায়গায় কাফেলা থামার পর প্রাকৃতিক ডাকে সারা দিতে আইশা (রা) কাছের ঝোপে গেলেন। যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন দেখলেন তাঁর গলায় নবীজীর উপহার দেওয়া ইয়েমেনি নেকলেসটি নেই! তিনি আবার খুঁজতে গেলেন, গিয়ে পেয়ে গেলেন নেকলেসটা। কিন্তু কাফেলার জায়গায় ফিরে আসতেই তিনি দেখলেন কাফেলা নেই! তাঁকে না নিয়েই চলে গেছে! (তিনি খুব হালকা হওয়ায় কেউ বুঝতে পারেনি তিনি যে নেই উটের পিঠে। কেউ খেয়ালও করেনি যে তিনি চলে গিয়েছিলেন।)

পেছনে পেছনে সাফওয়ান নামের এক সাহাবী আসছিলেন কাফেলা কিছু ফেলে গেল কিনা দেখার জন্য। তিনি আবিষ্কার করলেন স্বয়ং আইশা (রা)-কে! আইশা (রা) ধরেই নিয়েছিলেন কেউ না কেউ তো টের পাবেই তিনি যে নেই, তখন তাঁকে উদ্ধার করতে আসবে, এই ভেবে ঘুমিয়ে পড়েছেন ওখানেই। সাফওয়ানের ডাকে ঘুম ভাঙে, তিনি তাঁকে তাঁর উটে উঠতে বলেন এবং বাকি পথ তাঁকে নিয়ে চলেন হেঁটে। অনেকদূর যাবার পর তারা সেনাবাহিনীর সান্নিধ্যে পৌঁছালেন।

বড় কাহিনী সংক্ষেপে বলতে গেলে, গুজব রটিয়ে দেওয়া হলো যে, দীর্ঘ পথ নবীপত্নী আইশা (রা) এক অনাত্মীয়ের সাথে কী না কী করে এসেছেন! নবী (সা) এর কানে এ গুজব পৌঁছালে তিনি বিশ্বাস না করলেও কষ্ট পেয়েছিলেন। আর যখন আইশা (রা) এর কানে পৌঁছাল, তখন তাঁর অবস্থা পুরো খারাপ হয়ে গেলো। তিনি নাওয়াখাওয়া ছেড়েই দিলেন, কাঁদতে কাঁদতে জান শেষ।

এ পর্যায়ে ইবনে হিশাম রচিত নবী (সা) এর জীবনীগ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, আলী (রা) তখন নবীজীকে পরামর্শ দিলেন, এসব অপবাদ শোনার চেয়ে তিনি যেন তাঁকে তালাক দিয়ে দেন, অন্য কোনো নারী তিনি পাবেন।

কিন্তু আল্লাহ্‌ তখন ওহী নাজিল করলেন, যা কুরআনের আয়াত হিসেবে এখনো পঠিত হয়ঃ তোমরা যখন একথা শুনলে, তখন বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের মানুষ (আইশা) সম্পর্কে উত্তম ধারণা করোনি এবং বলোনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?” [সুরা নুর ২৪:১২] এবং আরো কিছু আয়াত। কুরআনের আয়াত দ্বারা অপবাদ মোচনের পর আইশা (রা) এর সম্মান আরো অনেক বেড়ে গেলো মদিনার মানুষদের মাঝে, কারণ স্বয়ং আল্লাহ্‌ তাঁকে নিয়ে কথা বলেছেন। আর যারা অপবাদ ছড়িয়েছিল তাদের শাস্তি দেওয়া হলো।

কিন্তু আলী (রা) এর সেই ‘পরামর্শ’ আইশা (রা) মনে রাখেন। অবশ্য আলী (রা) আইশা (রা)-এর প্রতি কিছুটা বিরূপ ধারণা রাখবারও হালকা কারণ ছিল। তরুণী স্ত্রী আইশা (রা) নবীর (সা) প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা (রা) সম্পর্কে ঈর্ষা পোষণ করতেন। এ ব্যাপারটা আলী (রা) হয়তো ঠিক মতো মেনে নিতে পারেননি। কারণ দুর্ভিক্ষের সময় মুহাম্মাদ (সা) শিশু আলী (রা)-কে নিজের পরিবারে নিয়ে মানুষ করেছিলেন, তখন খাদিজা (রা) তাঁর কাছে মায়ের মতোই ছিলেন। তাই এরকম ঈর্ষান্বিত কথা তাঁর কাছে খারাপ লাগবে। শিয়া মতবাদে এই হালকা বিরূপতাকে সরাসরি ‘শত্রুতা’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

আমাদের কেবল আর একটি পেছনের ঘটনা বলা বাকি রয়েছে। সেটি হলো ‘মুবাহালা’র ঘটনা। আইশা (রা)-এর সম্মান অনেক বেড়ে যাবার পর, আহলে বাইত বলে পরিচিত আলী (রা) বা ফাতিমা (রা) অনুভব করলেন তারা হয়ত কিছুটা কম প্রাধান্য পাচ্ছেন নবীর কাছে। আইশা (রা) তখন নবীজীর ‘প্রিয়তম স্ত্রী’ হিসেবে পরিচিত। ফাতিমা (রা) এর মৃদু এক অভিযোগ তখন নবী (সা) এর মনে থেকে যায়। প্রাসঙ্গিকভাবে ৬৩২ সালের মার্চ মাসে ইয়েমেন (তৎকালীন নাজরান) থেকে একদল খ্রিস্টান এলো মদিনাতে নবী মুহাম্মাদ (সা) এর সাথে ধর্মীয় বিতর্ক করতে। তারা যীশুর ঐশ্বরিকতা নিয়ে তর্ক করল, নবীও (সা) তাদের ইসলামের আহ্বান জানালেন। তারা নিজেদের তত্ত্বমাফিক তর্ক চালিয়ে গেলেন। তখন মুহাম্মাদ (সা) মুবাহালা (‘অভিসম্পাত প্রার্থনা’) করবার কথা বললেন। ব্যাপারটা এরকম- উভয় পক্ষ নিজেদের প্রিয়জন নিয়ে আসবে, এরপর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবে যে, যে পক্ষ মিথ্যেবাদী তাদের উপরে যেন তিনি অভিশাপ প্রেরণ করেন। “এসো, আমরা ডেকে নেই আমাদের পুত্রদের এবং তোমাদের পুত্রদের এবং আমাদের স্ত্রীদের ও তোমাদের স্ত্রীদের এবং আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের আর তারপর চল আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি এবং তাদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত করি যারা মিথ্যাবাদী।” [আলে ইমরান ৩:৬১]

পরদিন নবী (সা) হাজির হলেন ফাতিমা (রা), আলী (রা), হাসান (রা) ও হুসাইন (রা)-কে নিয়ে। অর্থাৎ তাঁর আহলে বাইতকে নিয়ে। তাঁর কোনো স্ত্রী তাঁর অন্তর্ভুক্ত হলেন না, এমনকি প্রিয়তম আইশা (রা) পর্যন্ত না। একটি কালো চাদরে তিনি ঢেকে দিলেন আহলে বাইতকে। এ দৃশ্যটা দুটো কারণে খুব প্রভাব ফেলেছিল খ্রিস্টানদের উপর। কারণ আরব খ্রিস্টানদের মাঝে একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, প্রথম নবী আদম (আ) এভাবে তাঁর পরিবারের উপর চাদর ঢেকে দিয়েছিলেন। এই একই দৃশ্য থেকে তাদের মনে পড়ে গেল আদম (আ) এর কথা; তবে কি তিনি আসলেই সত্য বলছেন? তার চেয়েও বড় ব্যাপার, মুহাম্মাদ (সা) নিজের সন্তান পৌত্রদের নিয়ে এসেছেন! তিনি সত্য বলছেন দেখেই তার মানে ভয় করছেন না যে কোনো অভিসম্পাত তাঁর বা আহলে বাইতের উপর পড়বে। কিন্তু একই নিশ্চয়তা খ্রিস্টানরা দিতে পারেনি। তারা পরামর্শ করে মুবাহালার প্রস্তাব থেকে সরে আসে এবং জানায় যে, মুহাম্মাদ (সা) যা বলবেন সেটাই মেনে নিবেন। [ইবনে সাদ, তাবারি, ইবনে ইসহাক, বুখারি] এই ঘটনা থেকেও শিয়াগণ আলী (রা)-কে প্রথম খলিফা হবার দাবিদার করে।

আমাদের পেছনের কাহিনী সব বলা শেষ। যদি পাঠকের মনে থাকে যে উসমান (রা) হত্যার সময় কী ভয়ংকর পরিস্থিতি ছিল মদিনাতে তবে এখনের ঘটনাগুলো বুঝতে সুবিধা হবে। আর মনে না থাকলে, আগের পোস্টগুলো পড়ে আসবার অনুরোধ থাকলো।

উসমান (রা) এর শাসনামলে যোগ্য শাসকের অভাব ছিল, যেমন জানা যায় যে একজন গভর্নর মদ্যপান করে জনগণের সামনে এসেছিলেন। কিন্তু শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে উসমান (রা) ছিলেন উমার (রা) এর সরাসরি বিপরীতে। অর্থাৎ তিনি এতই কোমল মনের ছিলেন যে তিনি শাস্তি দেননি। এসব রাষ্ট্র পরিচালনার হাঙ্গামার চেয়ে নীরবে কুরআন পড়তেই বেশি পছন্দ করেন বয়স্ক উসমান (রা)। তাছাড়া মিসরের গভর্নরের সীমাহীন দুর্নীতির জন্য মিসর থেকে শয়ে শয়ে মানুষ এসেছিল বিদ্রোহী হয়ে। এমনকি আইশা (রা) পর্যন্ত রাগে কথা শুনিয়েছিলেন উসমান (রা)-কে। আর এই উসমান (রা) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং আবু বকর (রা) এর পুত্র মুহাম্মাদ (রা)। কিন্তু তথাকথিত মারওয়ানের চিঠির পর ফিরে আসা বিদ্রোহীদের রক্তপিপাসা দেখে মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা) তাঁর বিদ্রোহ ত্যাগ করেন। কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে। উসমান (রা)-কে বিদ্রোহীরা হত্যা করে ফেলল। যদিও আমরা জানি না কে সেই মরণ-আঘাত হেনেছিল। কিন্তু বিদ্রোহীরা এবং বিদ্রোহের পক্ষের নবীর সাহাবীরা সত্যি সত্যি বিশ্বাস করতেন যে এই বিদ্রোহ সঠিক, এবং উসমান (রা) নাকি কুরআন মেনে শাসন করছেন না। এজন্য তারা তার পদত্যাগ চাইতো, কিন্তু মৃত্যু কেউ ঘুণাক্ষরেও সত্যি সত্যি চায়নি। একজনই কেবল নিজে এগিয়ে আসতে চেয়েছিলেন উসমান (রা)-কে রক্ষা করতে, তিনি ছিলেন মুয়াবিয়া (রা)।

আমরা যখন উভয় পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী সাহাবীদের কথা বলব তখন চেষ্টা করব তাদের উচ্চ-ধার্মিকতা আর মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আমলের একাগ্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। যেমন মুহাম্মাদ বিন আবু বকর (রা) কেবল যে আবু বকর (রা) এর সন্তান ছিলেন তা-ই নয়, পাশাপাশি তিনি আলী (রা) এর সৎপুত্রও ছিলেন। কারণ আলী (রা) বিয়ে করেছিলেন আবু বকর (রা) এর বিধবা স্ত্রী আসমা (রা)-কে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুহাম্মাদ (রা) ছিলেন নবীপত্নী আইশা (রা) এর ভাই। পরবর্তীতে আলী (রা) এর বিশ্বস্ত জেনারেল।

[আলী (রা) এর ঘটনাগুলো বর্ণনার সময় আমরা ইবনে কাসিরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (‘শুরু ও শেষ’) নামক প্রামাণ্যতম ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থ থেকে বর্ণনা করা হবে। এ ঘটনাগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করবার জন্য এ কয়দিনে আমরা অনেকগুলো গ্রন্থের সহায়তা নিয়েছি পাঠকদের বিশুদ্ধ ইতিহাস উপহার দেবার জন্য।]

উসমান (রা) শহীদ হবার পর মিসরীয় বিদ্রোহীরা আলী (রা)-কে খুঁজছিলেন। আর ইরাকের বসরার বিদ্রোহীরা খুঁজছিলেন তালহা (রা)-কে। আর কুফাবাসীরা (কুফী-রা) খুঁজছিল জুবাইর (রা)-কে। পাঁচদিন ধরে মদিনা নেতাশূন্য ছিল, তখন মদিনার আমির ছিলেন গাফেফী ইবনে হারব।

আলী (রা) চাননি খলিফা হতে, তিনি পালিয়ে বাগানবাড়িতে চলে যান। কিন্তু পরে তাঁকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করা হয়। চাপের বশে তখন তিনি শাসনকাজ হাতে নিলেন। একে একে মানুষ এসে বাইয়াত (আনুগত্য) দিতে লাগল। কিন্তু সাতজন প্রধান সাহাবী বিরত থাকলেন। তারা এটা মানতে পারলেন না যে একদিকে উসমান (রা) মারা গেলেন, এমনকি ঠিকমত দাফন পেলেন না, আর এদিকে আলী (রা) ক্ষমতা নিয়ে বসে থাকবেন খুনিদের শাস্তি না দিয়েই? কিন্তু পরিতাপের বিষয় এটাই ছিল যে, সেই বিদ্রোহী বা খুনিরাই সবার আগে ছুটে যায় আলী (রা)-কে খলিফা করতে।

তালহা (রা) তাঁর অবশ হাতে বাইয়াত দিলেন আলী (রা)-কে। তারপর করলেন জুবাইর (রা)। কিন্তু তাঁরাই জোরপূর্বক অনুগত হলেন, তাদের মাথার উপর বিদ্রোহীদের তরবারি ঝুলছিল।

ওদিকে ঘটলো আরেক ঘটনা। নিহত উসমান (রা) এর রক্তমাখা জামা আর স্ত্রী নাইলার কাটা আঙুলগুলো নিয়ে নুমান বিন বশির মদিনা ত্যাগ করেন। তিনি উমার (রা) কর্তৃক নিয়োগ দেয়া সিরিয়ার গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর নিকট উপস্থিত করেন ওগুলো। মুয়াবিয়া তখন সেগুলো সবাইকে দেখাতে মিম্বরে স্থাপন করলেন। সে জামা আর আঙুলগুলো দেখে কান্নাকাটি আর প্রতিশোধের আগুন জেগে ওঠে। উল্লেখ্য উসমান (রা) আর মুয়াবিয়া (রা) ছিলেন আত্মীয়। পুরো এক বছর ধরে ‘স্ত্রীশয্যায় যাবেন না প্রতিশোধ না নিয়ে’- এরকম শপথ করে সেনারা।

খলিফা হবার পর হযরত আলী (রা)-কে বড় বড় সাহাবীরা এসে অনুরোধ করলেন খুনিদের মৃত্যুদণ্ড দেবার। কিন্তু আলী (রা) সেটা করতে অস্বীকৃতি জানালেন, বললেন সন্ত্রাসীদের সাঙ্গপাঙ্গ আছে, আছে তাদের সহায়তাকারী। আপাতত তিনি এটা করতে পারবেন না। তখন মুগিরা (রা), তালহা (রা) ও জুবাইর (রা) মদিনা ত্যাগ করে মক্কা চলে গেলেন।

রাসুল (সা)-এর চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রা) আলী (রা)-কে পরামর্শ দিলেন, তিনি যেন মুয়াবিয়া (রা)-কে অপসারণ না করেন। তাছাড়া আলী (রা) এর বিরুদ্ধে তালহা (রা) ও জুবাইর (রা) উঠে পড়ে লাগতে পারে। কিন্তু আলী (রা) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-কেই সিরিয়ার গভর্নর করার কথা বললেন মুয়াবিয়াকে সরিয়ে। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা) সেটা মানতে রাজি হলেন না। ইবনে আব্বাস (রা) এর কোনো পরামর্শ আলী (রা) শুনলেন না, বরং আগত বিদ্রোহী খারেজি নেতাদের পরামর্শ মেনে নিলেন।

মুয়াবিয়া (রা) এর দূত যখন আলি (রা) এর দরবারে এসে সিরিয়ার মানুষের প্রতিশোধ পিপাসা নিয়ে জানালেন, তখন আলী (রা) বললেন, উসমান (রা) এর রক্ত ঝরানোতে তিনি দায়ী নন। তখন বিদ্রোহীরা মুয়াবিয়ার দূতকে খুন করে ফেলতে চাইলো। অনেক কষ্ট করে সেই দূত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আলী (রা) তখন সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার চিন্তা করলেন, না করলে মুসলিম বিশ্ব দু’ভাগে ভাগ হয়ে থাকবে। তিনি সেজন্য মিসর আর কুফা থেকে সেনা চাইলেন।

পুত্র হাসান (রা) এসে তাঁর কাছে বললেন, “বাবা! এ পরিকল্পনা বাদ দিন। এতে মুসলিমদের মাঝে রক্তপাত হবে। মতভেদ হবে।” আলী (রা) তাঁর কথা শুনলেন না। কিন্তু সিরিয়ার জন্য তিনি বের হয়ে গেলেও পথিমধ্যে এমন কিছু হলো যা সিরিয়া অভিযানকে পিছিয়ে দিল। আর সেটি ছিল কুখ্যাত জামাল যুদ্ধ (Battle of the Camel) (‘জামাল’ অর্থ ‘উট’) যা সংঘটিত হয় আইশা (রা) ও আলী (রা) এর মাঝে- এটি ছিল মুসলিমদের প্রথম গৃহযুদ্ধ (প্রথম ফিতনা)।

আলী (রা) সিরিয়াবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য মদিনাবাসীদের আহবান করেন, কিন্তু তারা মানা করে দেয়। ওদিকে আইশা (রা), তালহা (রা), জুবাইর (রা) প্রমুখ মক্কা থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন উসমানের (রা) রক্তের বদলা নেয়ার ব্যাপারে জানাতে একসাথে মদিনা যাবেন আলী (রা) এর কাছে। কিন্তু কেউ কেউ বলল ইরাকের বসরায় গিয়ে সেনা যোগাড় করতে এবং বসরার বিদ্রোহীদের দমন করতে আগে। অন্যান্য নবীপত্নীগণ মদিনা ফিরে যান। কিন্তু আইশা (রা) বসরা যেতে রাজি হন। আলী (রা) মুয়াবিয়া (রা)-কে হারিয়ে উসমান (রা) হত্যার বিচার পাবার রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছেন জানতে পেরে তারা সকলেই আলী (রা)-কে বোঝাতে রওনা দিয়ে দেন। তবে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছা তখনো ছিল না, কিন্তু তাদের অবস্থান যে আলী (রা) এর বিরুদ্ধে সেটা পরিষ্কার ছিল।

রাতের বেলা ‘হাওয়াব’ নামের এক কুয়ার কাছে আসবার পর তারা কুকুরের আওয়াজ পেতে থাকলেন। আইশা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, এ জায়গার নাম কী? তারা বলল, হাওয়াব। সাথে সাথে আইশা (রা) চিৎকার করে বললেন, ইন্নালিল্লাহ! আমি ফিরে যেতে চাই। রাসুল (সা) একবার তাঁর স্ত্রীদের নিয়ে বলছিলেন, “হায়! আমি যদি জানতাম তোমাদের মাঝে কার জন্য হাওয়াবের কুকুরগুলো ক্রন্দন করবে!” আমিই সেই স্ত্রী!

আইশা (রা) ফিরে গেলে উসমান (রা) এর হত্যার বদলা নেওয়া হবে না। আর বিদ্রোহীরা আলী (রা)-কে জেঁকে বসেই থাকবে, ক্ষমতার অপব্যবহার চলতে থাকবে। এগুলো প্রতিহত করবার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা) লোক হাজির করে তাদের দিয়ে বলালেন যে, এটি হাওয়াব কুয়ো নয়। কারণ আইশা (রা) এর ভাগ্নে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা)-এর কাছে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছিল (ইনি কিন্তু পূর্বে উল্লেখিত তালহা (রা) এর সাথের জুবাইর (রা) নন)। তিনি ছিলেন সেই সাহাবী যার জন্মের সময় মুসলিমরা খুশিতে ফেটে পড়ে। কারণ হিজরতের পর কোনো মুসলিম পরিবারে বহুদিন কোনো শিশু জন্মাচ্ছিল না। ইবনে জুবাইর (রা) এর জন্মের পর এজন্য মুসলিমরা আনন্দিত হয়। তাঁকে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর কাছে নিয়ে আসা হয়। নবী (সা) একটা খেজুর আনতে বললেন, আইশা (রা) অনেক খুঁজে খেজুর পেলেন না, ঘণ্টাখানেক পর কোথা থেকে যেন খেজুর নিয়ে আসলেন। এরপর মুহাম্মাদ (সা) সেই খেজুর মুখে চাবিয়ে নরম করে সেটা ইবনে জুবাইর (রা) এর মুখে পুরে দিলেন, যেন প্রথম যে জিনিস তাঁর মুখে প্রবেশ করে সেটি যেন হয় নবী (সা) এর লালা। তাঁকে তিনি নবীগৃহে বড় করবার আদেশ দিয়েছিলেন।

যা-ই হোক, আইশা (রা) পরে শান্ত হবার পর আবার বসরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো। সেখানে গিয়ে তাঁর বাহিনী বসরার গভর্নরকে পরাজিত করে সেখানে অবস্থিত উসমান (রা) এর হত্যাকারী বা হত্যার সমর্থকদের হত্যা করে।

আলী (রা)-কে পুনরায় হাসান (রা) বললেন, “বাবা, আমি তোমাকে নিষেধ করেছি, কিন্তু তুমি শোনোনি!” উত্তরে আলী (রা) বললেন, “তুমি সব সময় দেখি মেয়েদের মতো মায়াকান্না কেঁদে থাকো!” তখন হাসান (রা) তাঁকে উসমান (রা) এর হত্যার সময় হওয়া কিছু ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তবে আলী (রা) এ কথা বলে বক্তব্য শেষ করলেন, “প্রিয় সন্তান, আমাকে আমার কর্তব্য পালন করতে দাও।

আলী (রা) ২০ হাজার সেনা নিয়ে বসরা আসলেন এবং দূত মারফত জানালেন, ৫০০ লোকের শাস্তি দিতে ৫০০০ মুসলিমের রক্তক্ষয় ঠিক নয়। আইশা (রা) রাজি হলেন আলোচনা করে পরিস্থিতি মেটাতে, তালহা (রা) ও জুবাইর (রা)-ও চাননি যুদ্ধ হোক। কিন্তু এতে বিদ্রোহীরা রেগে যায়, কারণ সালিশ হলে কিংবা শান্তিপূর্ণ উপায়ে ঘটনা মিটে গেলে তাদের ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে পরে এবং এদের মধ্যে একজন ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামের এক নেতা। এর আগ পর্যন্ত কেবল হালকা প্রস্তর নিক্ষেপ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল উভয় পক্ষের দ্বন্দ্ব।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা আগে একজন ইয়েমেনি ইহুদী ছিলেন। পরে ইসলাম গ্রহণ করেন (তবে সুন্নি ও শিয়ারা তাকে মুনাফিক/hypocrite বলে থাকেন)। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে আমরা শান্তিপ্রস্তাবে তার অনাস্থাজ্ঞাপন সম্পর্কে জানতে পারি। তাবারির গ্রন্থ অনুযায়ী, ইবনে সাবা আলী (রা) এর একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন এবং তিনি ও তাঁর অনুসারীরাই প্রথম আলীর ঐশ্বরিক গুণ এবং অন্যান্য নতুন বিশ্বাস প্রচলন করেন, যা বর্তমানে শিয়ারা বিশ্বাস করে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই ইবনে সাবা’র প্রভাব শিয়াগণ অস্বীকার করে থাকেন এবং বলে থাকেন যে আলী (রা) ইবনে সাবা-কে হত্যা করেন যখন তিনি প্রচার করা শুরু করেন যে আলী (রা)-ই হলেন ঈশ্বর। তবে অনেক ইতিহাসবেত্তা উটের যুদ্ধে ইবনে সাবা’র প্রভাব বর্ণনা করেছেন, আবার কেউ কেউ অস্বীকার করেছেন। মোট কথা শিয়া ও সুন্নি উভয় মতবাদেই ইবনে সাবা-কে নিকৃষ্ট মনে করা হয়।

বলা হয়েছে, শান্তিপ্রস্তাবের রাতে এই খারেজি বিদ্রোহীরা (কারো মতে, ইবনে সাবার নেতৃত্বে) লুকিয়ে আলী (রা) এর শিবির থেকে এসে আইশা (রা) এর শিবিরের তাঁবুগুলো পুড়িয়ে দেন। সবাই বুঝে

০ Likes ০ Comments ০ Share ৩০৯ Views

Comments (0)

  • - এই মেঘ এই রোদ্দুর

    ভোট দিলাম

    - দীপঙ্কর বেরা

    ভোট দিলাম