নাজনীন পলি

৩ বছর আগে লিখেছেন

একজন মা ও একজন বাবা

একজন সন্তানের জীবনে নাকি মা ও বাবার সমান প্রয়োজনীয়তা রয়েছে । কেন এই কথাটা জ্ঞানীরা বলে গিয়েছেন এটা আমি মাঝে মাঝে  বুঝতে পারি না । হ্যাঁ , এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভ্রূণ তৈরীর জন্য শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন দরকার এবং এটা একক কোন নারী ও পুরুষের শরীরে থাকে না । তাই নারী এবং পুরুষ দুজন মিলে সন্তান জন্মের প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকেন । কিন্তু তার পর বাবার কি প্রয়োজন ? সন্তান জন্ম দানের অর্থ সংস্থানের জন্য ? নাকি সন্তানের লেখাপড়া, কাপড় চোপড় ও ডাক্তারের খরচ যোগানের জন্য ?

এবার আসুন দেখি সন্তান জন্মদানের খরচের জন্য আসলেই বাবার দরকার আছে কিনা ? এক কথায় না , বাবার দরকার নাই । কারণ সন্তান জন্ম নেওয়ার সময় মেয়েরা তার নিজের মা বাবার কাছেই বেশির ভাগ সময় থাকে ( যাদের মা বাবা একেবারে গ্রামে থাকে বা অন্য দেশে থাকে তাদের কথা আমি বলছি না ) । মেয়েরা নিজের মায়ের কাছে থাকে এটা বেশিরভাগ সময় শখ করে নয় উপায়হীন হয়ে । শ্বশুর বাড়িতে নিজের মা যেভাবে যত্ন করেন সেটা পাওয়া সম্ভব হয় না । আর যদি স্বামী স্ত্রী দুজন থাকেন সেখানে স্ত্রীর নিজের যত্ন ও স্বামীর কাপড় ধোয়া , খারার রেডি করা , ঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা , ঘর গোছানো , অতিথি সেবা ইত্যাদি সংসারে যেসব কাজ থাকে সবই নিজে নিজে করা লাগে । যেহেতু গর্ভকালীন সময়ে নারীদের শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে তাই এসময়ে সবাই কম বেশি অসুস্থ থাকে এবং তাকে অন্যের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হয় ।

এতক্ষণে নিশ্চয় প্রমাণ হল সন্তান জন্মদানের অর্থ সংস্থানের জন্য বাবার প্রয়োজন নেই ।

নারীরা কি শুধু নিজের বাবা মায়ের সম্পত্তির ভাগ থেকেই অর্থ সংস্থান করতে পারে নাকি অর্থ আয় করার যোগ্যতা ও নারীর আছে ? সবাই বলবেন , নারীরা ও এখন শিক্ষিত হচ্ছে এবং চাকরি ও ব্যবসায় পরিচালনা ও করছে । যাদের শিক্ষা নাই তারা গৃহকর্মী বা গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে । তারমানে এটাই প্রমাণ হল সন্তানের যাবতীয় খরচ যোগানের ক্ষমতা নারীর একারই আছে তাই সন্তানের বাবার কোন প্রয়োজন নাই ।

এতক্ষণের আলোচনা থেকে আমাকে নিশ্চয়ই আপনাদের পুরুষ বিদ্বেষী মনে হচ্ছে । কিন্তু আমি মোটেও পুরুষ বিদ্বেষী নই । আর আমি মনে করি কোন মেয়েই আসলে পুরুষ বিদ্বেষী নয় । উপরে যে কথাগুলো আমি বলেছি এসব কথা কোন মেয়ে শুধুমাত্র ক্ষোভ থেকেই বলে থাকে । গর্ভকালীন সময়ে কোন মেয়ে যখন তার মায়ের কাছে এসে থাকে তার স্বামী মনে করে তার স্ত্রীকে সময় দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই । স্ত্রী তার মায়ের কাছে যত্নে আছে । স্ত্রী এখন আর তাকে বিনোদন দিতে পারে না । স্ত্রীর বেঢপ শরীর তার ভাল লাগে না । স্ত্রীর হবু সন্তান নিয়ে নানান স্বপ্নের কথা শুনতে ভাল লাগে না ।

একজন নারী গর্ভধারণের দিন থেকেই মা । তার জীবনের সব সুখ সুবিধা , স্বপ্ন ক্যারিয়ার সব উৎসর্গিত হয় সন্তানের মঙ্গলের জন্য । আর যিনি বাবা হবেন তার জীবনের কোন পরিবর্তনটা আসে কেউ কি বলতে পারবেন । তিনি বাবা হবেন বলে নিজের কোন সুখ সুবিধা তার সন্তানের জন্য ত্যাগ করেন ? তার বিনোদনের মাত্রা বরং বেড়ে যায় । ঘরে স্ত্রী থাকে না বলে অধিক রাত পর্যন্ত ঘরের বাইরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া চলে , রাত জেগে টিভি দেখা , অনলাইনে সময় কাটানো চলে । বিয়ের দাওয়াত অন্যান্য দাওয়াত কোনটাই তার জীবন থেকে মিস যায় না । এসব পুরুষেরা কখনোই মনে করে না তার গর্ভবতী স্ত্রীর পাশে একটু বসি, সন্তান নিয়ে আলোচনা করি ।স্ত্রীর শরীরে খারাপ লাগলে কিছু না শুধুমাত্র হাতটা ধরে একটু বসি । হবু মা যখন ভয়ঙ্কার স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে ওঠে তখন তার ইচ্ছে করে স্বামীর বুকে মাথা রেখে সান্ত্বনা খুঁজতে । কিন্তু কোথায় স্বামী ? তিনিতো স্ত্রীর সাথে ঘুমাতে পছন্দ করেন না ।  কতজন হবু বাবা বলতে পারবেন তার স্ত্রী কত দিনের গর্ভবতী ? তার সন্তান জন্ম নেওয়ার সম্ভাব্য তারিখ কোনটা ? এসব কিছুই যদি না বলতে পারেন , সন্তান জন্মদানের এই সময়ে যদি হবু বাবা কে কাছে না পাওয়া যায় তবে এই পুরুষ নারীর জীবনে থাকলেই বা কি আর না থাকলেই বা কি ? এই পুরুষ সন্তানের বাবা হবেন কবে , যখন বাচ্চাকে স্কুলে দেওয়া হবে তখন ?এ দেশে স্কুলে সন্তান ভর্তি করতে বাবার প্রয়োজন হয় । কিন্তু সন্তানকে স্কুলে আনা নেওয়া , স্কুলের হোম টাস্ক করানো এসব কিন্তু মা’ই করে থাকেন । তার মানে বাবা হওয়া মানে সার্টিফিকেটে একটা পুরুষবাচক নাম ? আর দাদা দাদি হওয়া মানে কি ? গর্ভকালীন সময়ে ছেলের বউয়ের খবর  কোনদিন  না নেওয়া কিন্তু যখন সন্তান জন্ম দেওয়া হয়ে যাবে তখন এসে দাবী করা এটা আমাদের বংশধর - এর নাম আমরা ঠিক করে দিবো , এ কিভাবে ঘুমাবে খাটে নাকি দোলনায় আমরা ঠিক করবো । আমাদের বংশের বাচ্চা ডায়াপার পরবে কি পরবে না এটা আমরা ঠিক করবো । দাদা দাদীর দায়িত্ব তাহলে বংশধর জন্ম নেওয়ার পর থেকে শুরু ? আর মায়েরা শুধু সন্তানের প্রতি কতগুলো দায়িত্বই পালন করতে থাকবে কিন্তু কোন অধিকার মা পাবে না, এটাই কি আপনাদের সমাজের নিয়ম ? অনেক কষ্ট সহ্য করে অনেক কিছু উৎসর্গ করেই তবে একজন নারী হবেন মা । আর বাবা স্ত্রীকে একফোঁটা বীর্য দিবেন এজন্য তিনি বাবা ।  অথবা তিনি কখনোই বাবা নন শুধুই একজন জন্মদাতা ।

Likes Comments
০ Share