নাজনীন পলি

৪ বছর আগে লিখেছেন

অসম্পূর্ণ (প্রতিযোগিতা-২০১৫, ৩য় পর্ব, ক্যাটাগরি-২)

গল্পঃঅসম্পূর্ণ

 

এক

নীল তার হাতের মধ্যে যে নারীর উত্তাপ টের পাচ্ছে সেই নারী কোনদিন এভাবে ওর হাত ধরে থাকবে তা ছিল স্বপ্নাতীত । আজকের দিনের সব কিছু ওর স্বপ্ন মনে হচ্ছে ।একটা ভয় এসে আবিষ্ট করে ফেলছে ওর মনকে । ভয়টা স্বপ্ন ভাঙ্গার ভয়।যদি এমন হয় এতক্ষণ বা এ কয়দিনে যা যা ঘটেছে সব ছিল ওর দিবা স্বপ্ন ; বাস্তবে এসব কিছুই ঘটেনি ।

লাবণ্য অনেকক্ষণ ধরে নীলকে ডাকছে কিন্তু নীল একই  রকম বোবা দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে। লাবণ্য শক্ত করে নীলের হাতটা চেপে ধরে । আঃ বলে ককিয়ে উঠে নীল । নীল আমরা কেসে জিতে গেছি , আজ আমি মুক্ত-  নীল , এসব কিছু সম্ভব হয়েছে তোমার জন্য উচ্ছ্বসিত হয়ে লাবণ্য বলতে থাকে । নীল গম্ভির হয়ে বলে স্বাধীন দেশের নাগরিক তুমি তোমার তো সুবিচার পাওয়ার অধিকার আছে এবং তুমি সুবিচার পেয়েছ; ব্যস এটুকুই । কিন্তু তুমি না থাকলে  এপর্যন্ত আসার শক্তি আমি পেতাম না । তুমি আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু আর যাদেরকে  আমি আপনার ভেবেছিলাম তারা সবাই ছিল আমার সুসময়ের বন্ধু; বিপদের দিনে তারা ফিরে তাকায়নি আমার দিকে । আমি  আসলে হিরার চেয়ে কাঁচকেই মূল্যবান ভেবেছিলাম । তাইতো আজ আমি সব হারিয়ে নিঃস্ব । লাবণ্য তুমি নিঃস্ব নও , যা কিছু তুমি হারিয়েছ তার সব তুমি ফিরে পাবে নীল লাবণ্যকে সান্ত্বনা দিতে থাকে । তোমার কথায় যেন সত্য হয় নীল ।

 

দুই

নীল একমনে একা একা  হেঁটে চলেছে । লাবণ্যকে এইমাত্র বাসে তুলে দিয়ে আসলো । পুরানো স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছে । আজ এতক্ষণ যে নারী পরম নির্ভরতায় তার হাত ধরেছিল একদিন সেইতো ওর সাথে পথ চলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল । কারণ নীল কোন সম্পূর্ণ মানুষ নয় । সম্পূর্ণ হতে হলে দুপায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি থাকতো ওর কিন্তু ও তো কোনরকমে এক পা দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলে । ছেলেবেলায় রাস্তায় বের হলে পাড়ার ছেলেরা  বলতো ‘এই দ্যাখ দ্যাখ ল্যাংড়া ছেলেটা যায় ।’  হাই স্কুলে বন্ধুরা সব বাইসাইকেলে করে যেতো । নীল কতদিন স্বপ্ন দেখেছে ও বাইসাইকেল চালাচ্ছে কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গিয়েছে । ফুটবল খেলা , সাঁতার কাটা , গোল্লাছুট খেলা সবই স্বপ্নের মাঝেই খেলে গেছে নীল । বাস্তবে শুধুই বইয়ের মাঝে মুখ ডুবিয়ে মনে মনে স্বপ্নের জগত থেকে ঘুরে আসা । নীল তার জীবনে খুব বেশি বন্ধু পায়নি  । বলতে গেলে মাই ওর বড় বন্ধু । নীলের মায়ের মনে অপরাধবোধ ছিল নীলকে সঠিক সময়ে পোলিও ভ্যাক্সিন দিলে আজ আর এই পঙ্গু জীবন কাটাতে হত না । মা ছাড়া আর যে নারীকে নীল খুব কাছ থেকে দেখেছে সে লাবণ্য ।

 

তিন

নীলের সাথে লাবণ্যের পরিচয় কলেজে পড়ার সময়ে । দুজন সহপাঠী ছিল । তারপর কেমন করে যেন দুজনের বন্ধুত্ব হল । নীল ভদ্র শান্ত সারাদিন বই পড়ে সময় কাটানো একটা ছেলে আর লাবণ্য কলেজের সেরা সুন্দরী যাকে দেখলে ছেলেদের হৃদয়ে ঝড় উঠত । দুজনের মধ্যে কোন মিল নেই তারপরও কেন বন্ধুত্ব হল সেটা সত্যি বিস্ময় । নীল কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে আগ্রহী ছিল না কখনোই । নীল ওর অসম্পূর্ণ জীবনে কোন নারী আসবেনা বলেই ধরে নিয়েছিল । নীলের জীবনে লাবণ্যের আগমন লাবণ্যের ইচ্ছেতে আবার ছেড়ে যাওয়াটাও লাবণ্যেরই ইচ্ছেতেই ।

নীল ছোটবেলা থেকে একটু একটু করে যে মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল সে মনোবল লাবণ্যর সাহচার্য্যে আবার ফিরে পেয়েছিল । নীলের কাছ থেকে নোট নেওয়া , হঠাৎ হঠাৎ নীলের বাসায় চলে আসা, নীলের ঘর গোছানো , পোশাক পছন্দ করে দেওয়া ইত্যাদি দেখে নীলের মার মনে হল লাবণ্য তার ছেলেকে ভালোবাসে আর মায়ের মুখে ভালোবাসার কথা শুনে শুনে নীলের ও মনে হল লাবণ্য বুঝি তাকে ভালোবাসে । তবে নীল কখনো মুখ ফুটে ওর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেনি ।

 

চার

ছয় বছর পর নিয়তি আবার নীলের সাথে লাবণ্যের দেখা করিয়ে দিলো । লাবণ্যর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর নারীর ভালোবাসার প্রতি কোন আগ্রহ আর দেখায়নি নীল । যদি আগ্রহ দেখাতো তাহলে অনেক নারীই ওর জীবনে আসতে পারতো । প্রতি বছর বইমেলাতে ওর অটোগ্রাফ নিতে লাইন ধরে অপেক্ষারত নারীদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই ওর জীবনসঙ্গী ও হতে চায়বে । সারাদিন বই পড়া নীল নামের সেই অতি সাধারণ ছেলেটি আজ প্রতিষ্ঠিত তার মেধা দিয়ে । দুপায়ে দাঁড়াতে না পেরেও মানুষ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তার স্বপ্নের কথা লিখে । নীল এখন দেশের নামকরা সাহিত্যিকদের একজন । লাবণ্যর দেওয়া দুঃখকে সইতে না পেরেই হয়তো নীল কলম ধরেছিল । তার মনের মাঝে যত কষ্ট ছিল তা বের হয়ে এসেছে উপন্যাসে যা পড়ে পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে ।

নীল কখনোই লাবণ্যকে অভিশাপ দেয়নি বরং নিজের অসম্পূর্ণটাই ও মেনে নিয়েছিল । লাবণ্যের বিয়ের খবর ও নীল পেয়েছিল – ছেলে প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি । সুখের সংসার হওয়ারইতো কথা ছিল লাবণ্যের কিন্তু এমন কেন হল ? প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতির হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য নিতে হল নীলের যাকে কিনা সে অসম্পূর্ণ বলে ছুড়ে ফেলেছিল । নীল কখনো প্রতিশোধ নিতে চায়নি বরং লাবণ্যকে সাহায্য করতে পেরে নীলের মনে শান্তি এসেছে । নীল এই ভেবে শান্তি পেয়েছে যাক শয়তান স্বামীর হাত থেকে লাবণ্য শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেলো ।

 

পাঁচ  

লাবণ্যর শিল্পপতি স্বামী সুন্দরী মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েকে বিয়ে করেছিল ব্যবসায়ীক সুবিধার জন্য । তা না হলে হুরপরীদের যখন তখন কেনার মত পয়সা ও ক্ষমতা দুটোই তার আছে । লাবণ্য অনেক সহ্য করেছে , স্বামীর কথায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্য পুরুষদের কথা দিয়ে মুগ্ধ করেছে । তবে লাবণ্যর আত্মসম্মান বোধ স্বামীর আদেশে পরপুরুষের সাথে রাত কাটানোর মত কাজ করতে সায় দেয়নি । লাবণ্য স্বামীর ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে তবে কোন আত্মীয় বন্ধু ওর ক্ষমতাবান স্বামীর বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করেনি । যখনই কারো সাহায্য চেয়েছে সকলেই একই কথা এমন ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে যেয়ে আমরা নিজেদের বিপদ ডেকে আনতে পারবো না, তুমি বরং স্বামীর ঘরে ফিরে যাও । লাবণ্য নিরুপায় হয়ে নীলের কাছে সাহায্য চেয়েছে । নীল তার সর্বস্ব শক্তি দিয়ে লাবণ্যকে সাহায্য করেছে । জীবন নাশের হুমকি , জনপ্রিয়তা হারানোর সম্ভাবনা কোন কিছুই নীল তোয়াক্কা করেনি । সে রাজকুমারের মত রাক্ষসপুরী থেকে রাজকন্যাকে উদ্ধার করে এনেছে ।

 

শেষ

নীল অনেকক্ষণ বসে আছে ওদের কলেজের পাশের পার্কে । যেখানে একটা সময়ে নীল আর লাবণ্য আড্ডা দিতো । পার্কের গাছগুলোতে নতুন পাতা গজাচ্ছে , এইতো আর মাত্র কদিন পরেই বসন্ত আসবে । বসন্তকে অভিবাদন জানাতেই বুঝি প্রকৃতির এই প্রস্তুতি । নীল জানেনা লাবণ্য কেন আজ এখানে দেখা করতে চেয়েছে । লাবণ্য কি নীলকে জীবনসঙ্গী করতে চায়বে ? উত্তরে নীল কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না । নীলের মা কিছুতেই লাবণ্যকে মেনে নিবে না । নীলের মা লাবণ্যর বাবা মায়ের করা অপমান এখনো ভুলতে পারেনি । ‘ আপনি কোন সাহসে নিজের ল্যাংড়া ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ের কথা ভাবলেন ?আমরা কিছুতেই একটা অসম্পূর্ণ ছেলের সাথে আমাদের মেয়ের বিয়ে দেবো না ।’ সেদিন দূরে দাঁড়িয়ে লাবণ্য সব শুনেও কোন প্রতিবাদ করেনি ।  

© নাজনীন পলি ।

৪/২/১৫ ।

 

 

 

Likes ২৫ Comments
০ Share