Health Image

হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মাঝে মূল পার্থক্য



আমরা অনেক সময়ই বলতে শুনে থাকি ‘হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছেন’ বা ‘স্ট্রোক করে প্যারালাইসিস হয়েছেন/ হ্যামোরেজ হয়েছে’ কিংবা ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়েছেন’। কিন্তু এই মেডিক্যাল টার্মগুলোর সম্পর্কে কতোটা পরিচিত আপনি? অনেকেই জানেন না এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে। আপনি জানেন কি, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মধ্যেকার মূল পার্থক্য? অথবা এগুলো কখন এবং কোন অবস্থায় হয়ে থাকে? আজ চলুন, চিকিৎসকের ভাষায়, জেনে নেয়া যাক হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো।

হার্ট অ্যাটাক:
‘হার্ট অ্যাটাক মূলত হৃদপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা জনিত কারণে হয়ে থাকে। হৃদপিণ্ড আমাদের পুরো দেহে রক্ত সঞ্চালন করে থাকে। কিন্তু হার্টের রক্ত সঞ্চালনকারী শিরা যদি কোনো কারণে ব্লক হয়ে যায় তাহলে হার্ট পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত পায় না, আর একারণেই হার্ট অ্যাটাক হয়'।

- হৃদপিণ্ডের শিরা ব্লক হয়ে যাওয়ার কারণে হৃদপিণ্ডে কম রক্ত পৌছায় সেই সাথে অক্সিজেনের মাত্রাও কমে যায়, যার ফলে হার্ট ফেইল করে। আর একারণেই হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা দেখা দেয়।

- যদি কেউ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয় তাহলে যতো দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার প্রয়োজন, কারণ যতো দেরি হবে ততো ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়তে থাকে যা অনেক সময় রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

- হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হিসেবে, ‘বুকে চাপা ব্যথা, এবং চাপ অনুভব করা; হাত, কাধ, ঘাড়, চোয়াল ইত্যাদি ব্যথা করা; ঘন ঘন শ্বাস নেয়া; ঠাণ্ডা ঘাম হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখলে আমরা হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে বলে ধরে নিই। তবে হার্ট অ্যাটাক হলে হার্ট একেবারেই বিট করা বন্ধ করে দেয় না।

- পারিবাড়ে হার্টের রোগী থাকলে, উচ্চ রক্ত চাপের সমস্যা হলে, ডায়াবেটিস, অনেক বেশী ওজন, মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস রয়েছে যাদের তারা অনেক বেশী হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিতে থাকেন।

স্ট্রোক:
হার্ট অ্যাটাক যেমন হৃদপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা জনিত কারণে হয়ে থাকে তেমনই মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা জনিত কারণে স্ট্রোক হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে-
- মস্তিষ্কে একেবারেই কিংবা খুব কম রক্ত সঞ্চালনের কারণে মস্তিষ্কের যে কোনো অংশে অক্সিজেনের অভাব হয় এবং এ কারণেই রোগী স্ট্রোক করে থাকেন।

- স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনকারী শিরাতে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব জনিত কারণে হয়ে থাকে। রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার এই টার্মটিকেই মেডিক্যালের পরিভাষায় হেমোরেজ বলা হয়।

- স্ট্রোক হওয়ার সাথে সাথে যতো দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা করা প্রয়োজন। যতো বেশী দেরি হবে ততো বেশী রোগীর পুরো দেহ বা দেহের যে কোনো এক অংশ প্যারালাইসিস হওয়ার আশংকা থাকে এবং সেই সাথে অনেক সময় রোগী মৃত্যুমুখেও পতিত হতে পারেন।

- হুট করে কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত মাথাব্যথা হওয়া, দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে ব্যালান্স না থাকা, অতিরিক্ত মাথা ঘোরানো ও দুর্বলতা, কথা বলতে সমস্যা হওয়া এবং দেহের এক অংশ অসাড় হয়ে আসা ইত্যাদিকে স্ট্রোকের লক্ষণ ধরা হয়।

- পারিবারিক ইতিহাস, রক্ত সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান ও মদ্যপান, ডায়াবেটিসের কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে দেখা যায় অনেককে।

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট:
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট মূলত হৃদপিণ্ডের ইলেক্ট্রিক্যাল সিস্টেমের সমস্যা জনিত কারণে হয়ে থাকে। অনেকেই এটিকে হার্ট অ্যাটাক বলে ভুল বুঝে থাকেন।
- যখন অর্গান ম্যালফাংশনের কারনে হৃদপিণ্ড একেবারেই বিট করা বন্ধ করে দেয় তখন এই অবস্থাকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বলা হয়। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট মূলত অ্যারিদমিয়া অর্থাৎ অনিয়মিত হার্ট বিটের কারণে হয়ে থাকে।

- যদি কোনো ব্যাক্তি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হন তাহলে খুবই দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন, কারণ তা না হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই রোগী মৃত্যুবরণ করতে পারেন। কারণ হার্ট একেবারেই কাজ না করার কারণে পুরো দেহে বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে খুব অল্প সময়েই রোগী মৃত্যুমুখে পতিত হন।

- রোগীর একেবারে মুমূর্ষু অবস্থা, হার্ট বিট না থাকা এবং দেহের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কোনো ধরণের রেসপন্স না থাকার অবস্থাকেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।

- বয়স, লিঙ্গ, পারিবারিক ইতিহাস, করোনারি হার্ট ডিজিজ, অ্যারিদমিয়া, ধূমপান ও মদ্যপান ইত্যাদি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি বাড়ায়।

হৃদপিণ্ড এবং মস্তিষ্কের এই ৩ ধরণের মারাত্মক অবস্থা সম্পর্কে জেনে রাখা খুবই জরুরী। নিয়মিত চেকআপ করানো এবং সঠিক জীবন চর্চার মাধ্যমে এই তিনটি মারাত্মক অবস্থা এড়িয়ে চলা সম্ভব।