লোডিং ...
শৈশবে পড়া একটি ছড়া আজও মনে আছে। ছড়াটির প্রথম দুই লাইন ছিল এমন, ‘দাদখানি চাল মসুরির ডাল চিনিপাতা দৈ/দুটি পাকা বেল সরিষার তেল ডিমভরা কই।’ শৈশবে বাজারে গিয়ে আমি দাদখানি চাল খুঁজতাম। কোথাও পাওয়া যেত না। একবার এক চালের আড়ৎদার বলেছিল, খোকা এই নামে কোনও চাল নেই। তুমি যারে ‘দাদখানি’ বলছ, সেটা আসলে দাঁতের সমান লম্বা চাল! (দাদখানি নামের ধান আসলেও আছে)। আমি অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, দাঁতের নামে কিংবা দাঁতের মাপেও চাল পাওয়া যায়! পরবর্তী সময়ে অবশ্য এই অবাক হওয়ার ব্যাপারটা আর থাকেনি। কারণ, তখন জেনে গেছি, মানুষের নামেও চালের অথবা চালের নামেও মানুষের নামকরণ করা হয়ে থাকে।

নদী, সংখ্যা, ফল, ফুল, মাছের নামে ধানের নাম তো আছেই। এমনকি ‘গাঁজা’ নামের ধানও রয়েছে। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, নিজামী নামের ধানও আছে! জানি না ‘গাঁজা’ আর ‘নিজামী’ ধান কোথায় চাষ হয় আর কারা চাষ করে!
বালাম একদা শুধু চালের নাম ছিল, এখন এদেশে এই নামে জনপ্রিয় গায়কও আছেন। ছেলেদের নামে আছে অনেক চাল বা ধানের নাম। যেমন, বিপ্লব, নিয়ামত, কিরণ, রহমত ও গাজী। আগে জনপ্রিয় চালের নাম ছিল ঝিঙা, দিঘা, বড়ন ও পাইজাম। এখন জনপ্রিয় চালের নাম হচ্ছে নাজির (এটাও মানুষের নাম, হয়তো এটা কোম্পানির নামও) শাইল, মিনিকেট। মিনিকেট নামে অবশ্য ধানের কোনও জাত নেই। বিআর-২৮ ও বিআর-৩২ নামের চালগুলো কেটে ছোট করা হয়, যে কারণে এই চালের নাম হয়ে যায় মিনিকেট। মিনিকেট অবশ্যই ‘মোটা স্বাস্থ্য চিকন বা স্লিম করিয়া থাকি’ টাইপ চাল!

মোটা স্বাস্থ্য যারা চিকন বা স্লিম করে থাকেন, সেই মেয়েদের নামেও আছে অনেক ধান বা চালের নাম। যেমন: শ্রাবণী, মালা (মালা ধান থেকে খুব ভালো মুড়ি হয়। মালা ধান একসময়ে এত জনপ্রিয় ছিল যে, নিন্দুকেরা বলে থাকেন, এই নামে শাড়িরও নাম রাখা হয়েছিল) আশা ও মোহিনী। এক সময়ে কৃষকদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল মহরম, ফুলমতি, কানবিবি, কবিরমনি, মধুমালা, জলকুমারী, মধুমালতি ও ময়ুরকণ্ঠী ধানের চাষ! তবে আমজনতা যতই মোটা নায়িকা পছন্দ করুক আর বাধ্য হয়ে হজম করুক মোটা চাল, স্লিম বা জিরো ফিগারের নায়িকাদের মতো চিকন চালের দাম বরাবরই বেশি। দাম থেকে বলা যায়, মোটা চাল গরিবের, চিকন চাল বড়লোকের। তবে চিকুনগুনিয়া রোগের মতো মোটা চালের দাম যদি চিকন চালের কাছাকাছি চলে যায়, তাহলেই বিপদ!

শৈশবে বেশি চোখে পড়তো, এখনও মাঝে মাঝে রাস্তাঘাটে চোখে পড়ে, বাসের গায়ে লেখা, প্রগতির তৈরি। এই প্রগতি নামেরও ধান আছে। ধানের নাম আছে দিশারী! প্রগতির তৈরি বাস যেমন বিভিন্ন জায়গায় যায় জায়গার নামেও তেমনি আছে ধানের নাম। বটেশ্বর, হাতিয়া, ময়নামতি, পটুয়াখালি, ফরাসডাঙা, লক্ষ্মীপুরা নামে ধান আছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েনের সময়ে সেখান থেকে আতপ চাল আমদানির সিদ্ধান্তে ফেসবুকে অনেকেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। একজনের উক্তি খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, ‘শুনেছি ময়নামতি আর লক্ষ্মীপুরার নামে চাল আছে। বার্মা থেকে আতপ চাল আমদানির পর এই চালের নাম দেওয়া হোক, নোয়াখাইল্লা চাল! উল্লেখ্য চান্দিনা (কুমিল্লার একটি এলাকা) নামেরও ধান বা চাল রয়েছে!’

মানুষের ভেতর যেমন গরিব-ধনী আছে, চালের ভেতরেও আছে তেমন! কয়েক বছর ধরে বাসমতি, কালিজিরা কিংবা চিনিগুঁড়া ছিল ধনী বা বড়লোক চাল। এসবই চিকন প্রজাতির চাল। তবে বড়লোকদের চালের নামই আলাদা। নাম শুনলেই বোঝা যায়, চালের মাহাত্ম্য। যেমন– বাদশাভোগ, রানীভোগ ও সুলতানভোগ চাল। দামি এসব চাল যেন রাজা, বাদশা, রানি বা সুলতানদের জন্যই! ধর্মটাও যেন আছে ধানে। দু’টি জনপ্রিয় ধান হচ্ছে গোপালভোগ ও গীতাভোগ। এমন আরেকটা চালের নাম রসুলভোগ!

এতকিছুই যখন হলো, তখন ফুল, পাখি ও গাছের নামে ধানের নামকরণ করা আর বাদ যাবে কেন? সুতরাং ধানের নামকরণ করা হলো কামিনী, নয়নতারা, সূর্যমুখী, জবা ও কদম। জানি না এই নামের ধানগুলো এখন কোথায় চাষ হয়, কী তাদের খাদ্যগুণ। আছে ঘুঘুশাইল, চড়ুই, ময়না, বকফুল আর মাছরাঙা নামের ধান। তেমনি আছে গাছের নামে ধানের নাম। যেমন–বটশাইল, কেওড়া চাল ও বাগতুলসী। ফলের নামে আছে লিচু ধান, ডুমুর, কামরাঙা ও জামরুল ধান। আছে মরিচ ও লাল মরিচ ধান। ১৯২৭ সাল থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত বিশিষ্ট ধান বিজ্ঞানী ডক্টর হেক্টর এই উপমহাদেশের ধান নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। তার দেওয়া তথ্যমতে, ওই সময়ে ভারতবর্ষের কৃষকেরা মোট ১৮ হাজার রকমের ধানের চাষ করতো। ১৯৭১ সালের পর থেকে এক দশক পর্যন্ত ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট আবদুল হামিদের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশে যে জরিপ ও নিরীক্ষা চালিয়েছিল, সেই জরিপ ও নিরীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশে ১২ হাজার ৪৮৭ রকমের ধান চাষ হয়! বিআর সিরিজের ধানই আছে এক থেকে অন্তত ষাট পর্যন্ত! জানি না, এত ধান দেশের কোথায়, কারা চাষ করে, কারাই বা খায়। আমজনতা শুধু কম দামে মোটা চাল কিনতে পারলেই খুশি। চাল থেকে পাওয়া মুড়ি এদেশের জনপ্রিয়ত খাবারের একটি, তবে খই এখন অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য। মুড়ির মতো এত সহজলভ্য না!

তবে ধান নিয়ে বাঙালির গর্ব ও সৃষ্টিশীলতার শেষ নেই। প্রায় মধ্যযুগে অন্নাদামঙ্গল কাব্যে ভারতচন্দ্র রায় লিখেছিলেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ দুধ আর ভাত এখানে কী বরাবরই ছিল শান্তি আর প্রাচুর্যের প্রতীক? তাই কি ধান আগলে রাখার বাসনা বাঙালির চিরকালীন? হয়তো এ কারণেই গানে আছে–‘তবু দেব না দেব না দেব না গোলার ধান।’ বাংলা চলচ্চিত্রের নাম আছে ‘এক মুঠো ভাত’ কিংবা ‘ভাত দে’। গল্পে আমরা শুনেছি বাঙালির গোলা ভরা ধান থাকতো আর পুকুর ভরা মাছ থাকতো। অবশ্য বাস্তবের কবিতা অন্যরকম। যেমন– ‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে/বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?’ কারা বুলবুলি আর কারা বর্গী? খুব সাধারণের ধান তারা কিভাবে খেয়ে ফেলে? নিজের গোলার ধান কেন বেশি দামের চাল হিসেবে কিনতে হয় তাদের? নাকি এটাই বাংলার চিরকালীন নিয়তি?

বাঙালির মান অভিমান, দুঃখ বিরহ, বিপ্লব কিংবা বেদনার জন্ম যেন এক মুঠোভাত পাওয়া না পাওয়া নিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণে পাকিস্তানি হায়েনাদের ভাতে মারার হুমকি দিয়েছিলেন। ঠিকমতো ভাত খেতে না পারার বেদনাটা তাই বাঙালির বুকে বড় বেশি বাজে। আর দু’মুঠো ভাত পেটে পড়লেই বাঙালি হাসে, দাওয়ায় বসে গান গেয়ে ওঠে। চাল নিয়েও আছে বাঙালির হাসির গল্প। যেমন–

এক. এক লোক চালের আড়তে কাজ করে। তার কাজ ট্রাক থেকে চাল নামিয়ে আড়তে তোলা আর বিক্রি হয়ে যাওয়া চালের বস্তা আড়ৎ থেকে বের করা। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে লোকটির কাঁধ থেকে চালের বস্তা পড়ে যেত। একদিন আড়তের মালিক দোকান থেকে তাকে বের করে দিল। লোকটির সহকর্মীরা যখন মালিকের কাছে বের করে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলো, তখন মালিক উত্তর দিলো, লোকটির ‘চালচলন’ ভালো ছিল না!

দুই. ইরা আর ইফতির বিয়ে হয়েছে তিন দিন হলো। ইফতি ইরাদের বাসায় এসেছে। রোমান্টিক এক মুহূর্তে ইফতি জানতে চাইলো, ইরা বিয়ের আগে প্রেমটেম হয়নি? ইরা বললো, হবে না কেন? প্রেম ছাড়া মানুষ বাঁচে? তবে আমি যত প্রেম করেছি, ততগুলো চাল রেখে দিয়েছি খাটের নিচের এক ব্যাগে। ইফতির রোমান্টিসিজম কেটে গেল। সে খাটের নিচ থেকে ব্যাগটা বের করে আনলো। দেখলো সেখানে পাঁচটা বিন্নী ধানের চাল আর তিনশত ত্রিশ টাকা রাখা আছে। ইফতি কয়েকবার করে চালগুলো গুনে বললো, ধন্যবাদ ইরা। এই যুগে পাঁচটা প্রেম কোনও ব্যাপারই না। কিন্তু এই তিনশত ত্রিশ টাকা কিসের? ইরার উত্তর, বিয়ের দুই দিন আগে এমন করে জমানো তিন কেজি বিন্নী ধানের চাল বিক্রি করেছি।

ইফতি জ্ঞান হারালো!

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বিন্নী ধানের চাল খুবই জনপ্রিয়। এই চাল দিয়েই ক্ষীর, পায়েস, কুলি, চিতই বা ভাপা পিঠা বানানো হয়। আমাশয় হলে বিন্নী চালের ভাত খেলে আমাশয় নিরাময় হয়।

ভাত পেটে পড়লে নাকি বাঙালি এমন সুখেই থাকে। আর না পড়লে? রফিক আজাদের সেই অমর কবিতাটা স্মরণ করা যেতে পারে:

গ্রাম-গঞ্জ-ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব প্রধান নারী

উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি

আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ

ভাত দে হারামজাদা

তা না হলে মানচিত্র খাবো।

-----
বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত
রব্বানী চৌধুরী মন্তব্য করেছেন ৪ দিন আগে

চমৎকার লেখাটি।

আপনার সমস্যা সম্পর্কে দয়া করে আমাদের জানান