শফিক সোহাগ

৩ বছর আগে

২৩ জুলাইঃ একটি নক্ষত্রের জন্মকথা



আজ ২৩ জুলাই, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রীবঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের ৯১ তম জন্মবার্ষিকী ।১৯২৫ সালের ২৩ জুলাইগাজীপুর জেলার দরদরিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ।তাজউদ্দীন আহমদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দেয়া ।

তাজউদ্দীন আহমদের পড়াশোনা শুরু বাবার কাছে আরবি শিক্ষার মাধ্যমে। পরে বাড়ি থেকে ২ কিলোমিটার দূরের ভূলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১ম ও ২য় শ্রেণীতে ১ম স্থান অর্জন করেন। তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন বাড়ি থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরের কাপাসিয়া মাইনর ইংলিশ স্কুলে। এরপর পড়েছেন কালিগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশন, ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাই স্কুল  ও সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে। তিনি ম্যাট্রিক (১৯৪৪) ও ইন্টারমিডিয়েট (১৯৪৮) পরীক্ষায় অবিভক্ত বাংলার সম্মিলিত মেধাতালিকায় যথাক্রমে  দ্বাদশ ও চতুর্থ স্থান (ঢাকা বোর্ড) লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বি.এ (সম্মান) ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে কারাগারে থাকা অবস্থায় এল.এল.বি. ডিগ্রীর জন্য পরীক্ষা দেন এবং পাস করেন। [সূত্রঃ তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা ]

তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী।তিনি প্রথমে ছাত্রাবস্থায়  মুসলিমলীগের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করলেও পরবর্তীতে গণমানুষের আশাআকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারীপ্রগতিশীল রাজনীতি প্রবর্তনের জন্য প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রূপে  আওয়ামীলীগে  যোগদান করেন । প্রথমে ঢাকা জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৯৬৬ সালে  আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের একমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়ার পেছনে তাজউদ্দীন আহমদের শিক্ষা, বুদ্ধি ও সাংগঠনিক দক্ষতা বিশেষ ভূমিকা রাখে । এ প্রসঙ্গে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” এই অমর গানটির রচয়িতা সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, “শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত আওয়ামীলীগে শেখ মুজিবের পেছনে প্রকৃত বুদ্ধিদাতা ও কর্মী পুরুষ ছিলেন তাজউদ্দীন... ফর্সা গোলগাল চেহারা, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ মুখ, বেশি মানুষের ভিড়ে লাজুক এই শিক্ষিত ও মার্জিত রুচির মানুষটি প্রখর ব্যক্তিত্বশালী নেতা ছিলেন । তাঁর শিক্ষা বুদ্ধি ও সাংগঠনিক শক্তির সঙ্গে শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্ব, সাহস ও জনপ্রিয়তার মিশ্রণে আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের একমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়” । [সূত্রঃ তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা ] ।  প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদের ভাষায়, “তাজউদ্দীন ভাই বিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন । সেজন্যই বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন ভাইকে বেছে নিয়েছিলেন । বঙ্গবন্ধুর জীবনের একটা অংশ ছিল তাজউদ্দীন আহমদ এবং দুজনে মিলেই কিন্তু একটাই ইউনিট” । [সূত্রঃ তাজউদ্দীন আহমদ নিঃসঙ্গ সারথি, প্রামাণ্য চিত্র]

মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রত্যেকেই একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারী পর্যন্ত সময়কে একটি Historical Entity গণ্য করলে তার মহানায়ক তাজউদ্দীন আহমদ । ২৫ মার্চ ভয়াল কালো রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পরে নিরীহ বাঙ্গালীর উপর । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কারাবরণ করেন । বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সমগ্র নিপীড়িত জাতিহয়ে পড়ে অভিভাবকহীন । এই ক্লান্তিকালে জাতিকে রক্ষার জন্য হাল ধরেন তাজউদ্দীন আহমদ । তিনি তাৎক্ষনিক দুটি সিদ্ধান্ত নিলেন । (১) পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক আঘাতের মাধ্যমে যে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা থেকে বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাবার একমাত্র উপায় হলো সশস্ত্র প্রতিরোধ তথা মুক্তির লড়াই; (২) এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামকে সংগঠিত করার প্রাথমিক ও অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ হিসাবে ভারত ও অন্যান্য সহানুভূতিশীল মহলের সাহায্য-সহযোগিতা লাভের  জন্য অবিলম্বে সচেষ্ট হওয়া  [সুত্রঃ মূলধারা ৭১] ।

৩ এপ্রিল রাত ১০ টায় ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাজউদ্দীন আহমদ সাক্ষাৎ করেন । তিনি ইন্দিরা গান্ধীর নিকট মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলার জন্য ভারতে আশ্রয়, ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা এবং অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য আহ্বান জানান । এছাড়াও দুই-এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রচুর শরণার্থী ভারতে ঠাই নেবে, তাদের আশ্রয় ও আহারের ব্যবস্থা করার জন্য আহ্বান জানান । তিনি বলেন এই  মুক্তির লড়াইয়ে তিনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে সহায়তা কামনা করছেন অপর স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই স্বাধীনতার যুদ্ধ একান্ত বাংলাদেশের যুদ্ধ এবং ভারত যেন এই যুদ্ধে না জড়ায়।  ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন । ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাফল্যজনক সাক্ষাতের আলোকে ভারতসহ বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার এবং মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে তাকে পরিচালনার জন্য অবিলম্বে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় ।১০ এপ্রিল শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয় ।

যুদ্ধ চলাকালীন সময় সকল মন্ত্রীগণ পরিবার নিয়ে কলকাতায় ফ্ল্যাটে থাকতেন । কিন্তু কলকাতায় পরিবার-পরিজন থাকা সত্ত্বেও তাজউদ্দীন আহমদ তাদের সাথে থাকতেন না । তিনি একটি প্রতিজ্ঞা নিলেন যে, যতদিন পর্যন্ত দেশ স্বাধীন না হবে ততদিন পর্যন্ত তিনি পারিবারিক জীবন যাপন করবেন না । পরিবার পরিজনের প্রতি দুর্বলতা যেন তাঁকে যুদ্ধ পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য তিনি যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পরিবারের কাছ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেন । অফিসেই ছিল তাঁর শয্যা। নিজের একটি মাত্র জামা ধুয়ে সেটাই তিনি পড়তেন। এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম বলেন, “তাজউদ্দীন সাহেব একটি প্রতিজ্ঞা নিলেন যে, যতদিন পর্যন্ত দেশ স্বাধীন না হবে ততদিন পর্যন্ত উনি পারিবারিক জীবন যাপন করবেন না ।বিশেষ করে তাঁর মনে এটাই লাগছিল যে, সমস্ত ইয়াং ছেলেরা যাদের এখন সংসার করার বয়স তারা এখন যুদ্ধ করছে । তো সে সময় তাদের পরিবার পরিজন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন । আমি এ যুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী । আমি কি করে সংসার লালন পালন করবো”?তাজউদ্দীন আহমদের এমন জীবন যাপন স্বচক্ষে দেখেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী । তিনি বলেন, “তিনি (তাজউদ্দীন আহমদ) এটাকে মনে করেছেন সমর বিচরণ । একজন সেনাপতিকে সমর পরিচালনা করতে হলে বাড়ির আয়েশের মধ্যে থেকে তা হয় না । সৈনিকরা যে অবস্থায় আছে, তাকেও সে অবস্থায় থাকতে হবে । তারা যা-ই খান, তিনিও তা-ই খান । এই গুণই প্রথমে আমাকে তাঁর প্রতি আগ্রহী করে তোলে” । (মাসিক গণস্বাস্থ্য, ৩৫ বর্ষ, ২য় সংখ্যা)

দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানের পাশাপাশি তাজউদ্দীনকে "যেমন প্রতিহত করতে হয়েছিল আন্তর্জাতিক চক্রান্ত তেমনি আওয়ামীলীগের একাংশের ষড়যন্ত্র, অন্তর্কলহ ও কোন্দল"  [ সূত্রঃ তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা] । ওদিকে মুজিবনগর সরকারেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোপনে আঁতাত করলো । শুরু করলো মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ।  এসকল চতুরমুখি বাঁধা সত্ত্বেও তাজউদ্দীন আহমদ দৃঢ়তার সাথে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে যান এবং চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করেন । নবজাত এই দেশকে পুনর্গঠন এবং অবকাঠামো পুনস্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ । তিনি সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ‘জাতীয় মিলিশিয়া’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন ।

শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি তাজউদ্দীন আহমদের ছিল অগাধ বিশ্বাস । ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করারপরদিন তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে একান্ত আলাপে বসেন । পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কোন কার্যকরী ক্ষমতা না থাকায় তিনি শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার আহ্বান জানান ।১২ জানুয়ারিসন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবর রহমানের কাছে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার সমর্পণ করলেন । উদ্দীপ্ত ঝলমলে হাসিভরা মুখে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, “আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন । নেতার অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত থেকে দেশকে স্বাধীন করেছি । আবার নেতাকে মুক্ত করে তাঁরই হাতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার তুলে দিয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি । অন্তত ইতিহাসের পাতার এককোণায় আমার নামটা লেখা থাকবে”। ক্ষমতা নির্লোভী আত্মপ্রচার বিমুখ তাজউদ্দীন আহমদের এই ত্যাগ ইতিহাসে সত্যিই বিরল ! 

আমার আদর্শ-বাংলাদেশের নক্ষত্র বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের জন্মদিনেই আমার জন্ম হওয়ায় আমি ধন্য; সৌভাগ্যবান ।এই মহান ব্যক্তির ৯১তম জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ।          

                                      

শফিক সোহাগ

সভাপতি- বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ

Email: shafiq_shohag@yahoo.com
২ Likes ০ Comments ০ Share ৪৬৩ Views