আমির ইশতিয়াক

৩ বছর আগে

মায়ের স্বপ্ন (সৃজনশীল ব্লগিং প্রতিযোগিতার ২০১৬ - প্রথম পর্ব, ক্যাটাগরি-০২, ছোট গল্প)



খোদেজা বেগমের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন তার সন্তান শাকিল এদেশের একজন নামকরা ডাক্তার হবে। গরিব দু:খী মানুষের সেবা করবে। অভাবের সংসারে কত কষ্ট করে খোদেজা তার সংসার চালাচ্ছেন তা শুধু আল্লাই ভালো জানেন। তার সম্পদ বলতে কিছু নেই। রেললাইনের পাশেই এক বস্তিতে তিনি তার সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজে না খেয়ে শাকিলের লেখাপড়ার খরচ যোগাচ্ছেন।
খোদেজা বেগম একজন সহজ, সরল নারী। খুব সাদা-সিধে তার জীবন যাপন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তিনি পাননি। প্রকৃতি থেকেই শিক্ষা নিয়েছেন তিনি। অভাবের সংসারে বড় হয়েছেন বিধায় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে পারেননি বলে কি সন্তানকে শিক্ষিত করবেন না! তা কিছুতেই হতে পারে না। তিনি উপলব্ধি করেন শিক্ষার মর্ম। তাইতো ছেলেকে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন। তাকে শিক্ষিত করতে হবে। ছেলে শিক্ষিত হলে নিজের সম্মান বৃদ্ধি পাবে। সমাজে ভালো একটা স্থানে যেতে পারবে। ছেলে চাকুরী করবে সংসারের অভাব দূর হবে। তাইতো খোদেজা বেগম খেয়ে না খেয়ে ছেলের লেখাপড়ার খরচ যুগিয়েছেন। স্বপ্ন একটাই ছেলে শিক্ষিত হয়ে ডাক্তার হবে।
খোদেজা বেগম কখনো পেট পুরে তিন বেলা খেতে পারেননি। তিনি স্বামীকে বেশি ভালো বাসতেন। তাইতো অল্প বয়সেই স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। শাকিলের বয়স তখন দুই বছর। এমন সময় সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্বামী মারা যান। নির্বাক হয়ে গেলেন খোদেজা বেগম। হে খোদা একি করলে তুমি? কেন তুমি আমার নিষ্পাপ সন্তানকে এতিম করলে?
অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে ছেলে শাকিলকে নিয়ে বেঁচে আছেন। তাকে নিয়েই তার সমস্ত স্বপ্ন। শাকিল এবার এইচ.এস.সি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। শাকিল কি পাড়বে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে! মাকে খুশি করতে! দীর্ঘ ষোল বছর যাবত খোদেজা বেগম সংসারের ঘানি টানতে টানতে এখন ক্লান্ত। পৌঢ়তা তাকে টানছে মৃত্যুর দিকে। তারপরও ছেলের লেখাপড়ার প্রতি তার অনেক চেষ্টা। এই শাকিলকে নিয়েই তার সব স্বপ্ন। শাকিলই তার পৃথিবী। শাকিলের জন্য তিনি সব ত্যাগ স্বীকার করছেন। তার বিনিময়ে যেন শাকিল একজন শিক্ষিত মানুষ হয়। ভালো একজন ডাক্তার হয়। এই তার স্বপ্ন।
শাকিল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে। এমন মমতাময়ী মাকে শাকিল কি করে কষ্ট দিবে? শাকিল তার মায়ের স্বপ্ন পূরণে যথেষ্ট চেষ্টা করছে। সেই ছোট বেলা থেকেই শাকিল ছিল পড়াশুনার প্রতি মনোযোগী। অন্য আট/দশটি ছেলেদের মতো শাকিল নয়। সে ছিল খুবই মেধাবী। তাই খোদেজা বেগম এই ছেলেকে নিয়ে গর্ব করেন। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। শাকিল তার মাকে নিয়ে কতটা চিন্তা করে তা কি শাকিলের মা খোদেজা বেগমই জানে?
শাকিল অনেক কিছু ভাবে। একদিন সে ডাক্তার হবে। কোন হাসপাতালে তার চাকুরী হবে। তারপর তার মাকে নিয়ে ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট বাসা করে থাকবে। মাকে আর অন্যের বাড়িতে কাজ করতে দিবে না। একদিন তার একটি বাড়ি হবে। মায়ের পছন্দ অনুযায়ী সে বাড়ি বানাবে। মায়ের জন্য সুন্দর করে একটি রুম বানাবে। সেই রুমে মা জায়নামাজে বসে নামাজ পড়বে। আর ছেলের জন্য দোয়া করবে।
আজ শাকিলের স্বপ্নের মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা। শাকিলের জন্য দিনটি স্মরণীয় হতে পারে আবার দু:স্বপ্নও হতে পারে। যদি এখানে চান্স না হয় তবে মাকে আর মুখ দেখাতে পারবে না। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে না পাড়লে এ জীবন বৃথা যাবে। কিছুতেই মায়ের স্বপ্নকে ধুলিসাৎ করা যাবে না। তাইতো শাকিল দিনরাত পরিশ্রম করে লেখাপড়া করছে। অন্য ছেলে-মেয়েরা যেখানে দেশের নামিদামী কোচিং সেন্টারগুলোতে পড়ছে সেখানে শাকিল অর্থের অভাবে পড়তে পারছে না। শুধুমাত্র নিজের চেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে। কোন রকম প্রাইভেট ছাড়াই শাকিল এস.এস.সি ও এইচ.এস.সিতে গোল্ডেন এ প্লাস পায়।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই শাকিল দেখল তার মা জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে। হে আল্লাহ তুমি আমার ছেলেকে সমস্ত বিপদ আপদ থেকে রক্ষা কর। তুমি আমার ছেলেকে ডাক্তার হওয়ার সুযোগ করে দাও। আমার স্বপ্ন তুমি পূরণ করে দাও। আমার জীবনের সব কষ্টের বিনিময়ে তুমি তারে ডাক্তার বানিয়ে দাও।
শাকিল তার মায়ের পাশে গিয়ে বসলো। খোদেজা বেগম মুনাজাত শেষে ছেলের দিকে তাকালেন। কি বাবা কিছু বলবি।
শাকিল মাথা নাড়িয়ে বললো, হ্যাঁ মা।
– বল্।
– মা তুমি আমার জন্য এত চিন্তা কর কেন?
– বাহরে তুই আমার একমাত্র আদরের ধন, কইলজার টুকরা। তোরে নিয়ে চিন্তা করুমনাতো কারে নিয়া চিন্তা করুম?
– আমাকে নিয়ে তোমার এত চিন্তা করতে হবে না। দেখ মা আমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করবই ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ যদি সহায় থাকে তোমার স্বপ্ন আমি বৃথা যেতে দিব না। তুমি শুধু আমার জন্য দোয়া কর।
– তাই যেন হয় বাবা।
শাকিল চলে গেলো ভর্তি পরীক্ষা দিতে। যথারীতি পরীক্ষা দিয়ে বের হল। যতক্ষণ সে পরীক্ষার হলে ছিল ততক্ষণ খোদেজা বেগম নফল নামাজ পড়ছেন আর আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। শাকিল পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে আসল। শাকিলে মা জিজ্ঞেস করলো, বাবা কিরুম হইছে পরীক্ষা?
– শাকিল মুখে হাসির রেখা টেনে বললো, মা তোমার দোয়াই আল্লাহর রহমতে ভালো হয়েছে।
শাকিল এখন অপেক্ষার প্রহর গুণছে কখন ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে। কিছুদিন পরই ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো। শাকিল মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেল। এ খবর খোদেজা বেগম শুনতে পেয়ে ছেলেকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন।
শাকিল বললো, মা তুমি কাঁদছো কেন? আজতো খুশির দিন।
খোদেজা বেগম আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললো, হ্যাঁ বাবা আজ খুশির দিন। অতি দু:খে যেরম মানুষ কাঁদে আবার অতি খুশিতে মানুষ কাঁদে। আমি আজ খুশিতে কাঁদছি।

১ Likes ১০ Comments ০ Share ৬৯৪ Views