মালালার নোবেল পাওয়া নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে

আমার যতদূর মনে পড়ে গতবছর যখন বারাক ওবামাকে শান্তি নোবেল দেওয়া হয়েছিল তখন আমরা প্রায় কেউই মেনে নিতে পারিনি। কারণ উনি শান্তি প্রতিষ্ঠা না করেই আগাম পুরস্কার পেয়েছেন যা ছিল হাস্যকর। এবং অনেককেই বলতে শুনেছি, মালালাকে দিলেও তো হত বারাক ওবামাকে কেন দেওয়া হল? কিন্তু এবার দেওয়ার পর শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। মালালা ইউসুফজাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ের খবর পত্রিকায় আসার পর থেকেই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শুরু হয়েছে নিরন্তর বাণী প্রক্ষেপণের মহড়া। এর মধ্যে আবার কেউ কেউ মালালা সম্বন্ধে একবিন্দু না জেনে তার কাজ কিংবা অবদান সম্বন্ধে জ্ঞান না রেখে গালির তুবড়ি ছোটাচ্ছেন অহর্নিশি– “একটা গুলি খায়াই নোবেল পায়া গেল?” কেউ বা বলছেন, “মালালা একটা গুলি কেয়ে নোবেল পাইল, আমারে কামান মার।” কেউ আবার বলছে, “একটা গুলি খাওয়া ছাড়া মালালার শান্তিতে কী অবদান আছে কইবেন কেউ?”

‘সারাদিন নর্দমা ঘাটা যার স্বভাব, ফুলের গন্ধ তার নাকে যায় না’। মালালা প্রসঙ্গে বাঙালির ফেসবুকীয় বুদ্ধিজীবিতার নমুনা দেখে আমার নিরেট মাথায় কেন যেন এ কথাগুলোই বার বার ঘুরেফিরে উঠে আসছে।

বেচারি মালালা! মাত্র সতের বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী হয়েও গালি খাচ্ছেন তালিবানদের, ইসলামিস্টদের, মৌলবাদীদের। পাশাপাশি, দেশপ্রেমিক বাঙালিদের, জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশিদের, সেক্যুলারিস্টদের, কমিউনিস্টদের। সবার! তালিবানি ইসলামিস্ট ঘরানার লোকজন মালালার উপর কেন খ্যাপা তা বোধহয় সহজেই অনুমার করা যায়। কিন্তু অন্যরা? কিছু কারণ বের করেছি দেখেন আপনার সাথে মিলে কিনা?

-‘পাইক্কা-বিরোধী’ দেশপ্রেমিক বাঙালিরা,
-জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশিরা,
-সেক্যুলারিস্টদের কিছু অংশ খ্যাপা;
-‘পাইক্কার সঙ্গে সম্পৃক্ত’ যে কোনো কিছুতেই ‘গাইল’ দেওয়া লোক
-কমিউনিস্ট আর বাম ঘরানার লোকজনের কাছে মালালার পুরস্কার কেবলই ‘পশ্চিমা পুঁজিবাদী চাল’ । 


মালালা কেন পেলেন নোবেল?
-গুলি খাওয়ার তিন বছর আগে, মাত্র এগার বছর বয়সে বিবিসির সাইটে মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং তালিবানদের প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্লগিং শুরু করেছিলেন মালালা। সোয়াতের মতো পশতুন এলাকাগুলো আফগানি তালিবানরা ক্রমশ দখল করে নিচ্ছিল। মেয়েদের স্কুল জোর করে বন্ধ করে দিচ্ছিল। তালিবানরা জায়গাগুলো দখল করে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো নিষিদ্ধ করতে থাকে; তাদের বাধ্যতামূলকভাবে নিকাব, বোরকা প্রভৃতি পরার জন্য চাপ দিতে থাকে। ঠিক এই সময়টাতেই বিবিসির পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে ব্লগিংএর। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রীদের কেউ রাজি না হওয়াতে অনেকটা বাধ্য হয়েই মালালাকে এ দায়িত্ব নিতে হয়। 

-মালালা যা লিখছিলেন তা একটা ডায়েরির মতো। Gul Makai (পশতুন লোকগীতির এক বীর নারী) ছিল তার ‘পেন নেইম’। মালালা অবশ্য শুরু থেকেই ছিলেন কিছুটা বিদ্রোহী; মুখঢাকা, বোরকা-পরার বিরুদ্ধে সোচ্চার। I am Malala বইটি থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি–

I told my parents that no matter what other girls did, I would never cover my face like that. My face was my identity. My mother who is quite devout and traditional, was shocked. Our relatives thought I was very bold (some said rude). But my father said, I could do as I wished. “Malala will live as free bird” he told everyone.

-মালালা তার প্রথম ব্লগটি লিখেন ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে, I am afraid শিরোনামে। তালিবানদের বিরুদ্ধে ব্লগিং যখন শুরু করলেন, মৃত্যু-হুমকি পেয়েছিলেন অজস্র। তার লেখায় এমনই আক্রান্ত বোধ করেছিল তালিবানি জঙ্গিরা যে, যে বাসে করে মালালা স্কুল থেকে ফিরত সেখানে তারা হামলা করে বসে। দু’জন তালিবানি যুবক বাসে উঠে রাইফেল তাক করে তার সহপাঠীদের দিকে। তাদের বাধ্য করা হয় বাসের মধ্যে মালালা কোন জন সেটা চিনিয়ে দিতে। সহপাঠীদের একজন ভয় পেয়ে মালালাকে চিনিয়ে দিলে তৎক্ষণাৎ তাকে গুলি করে ওরা।হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তিন দিন মালালা সংজ্ঞাহীন ছিলেন। জ্ঞান ফিরেছিল ইংল্যান্ডে নেওয়ার পর। সেখানে সার্জারি করে তার গলার কাছ থেকে বুলেট অপসারণ করা হয়। তার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ থামাতে খুলির কিছু অংশ কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। যারা মালালাকে আজ উঠতে-বসতে গাল দিচ্ছেন, তাদের কেউ কি অনুধাবন করতে পারছেন যে, যে সময়টা হেসে-খেলে বেড়াবার বয়স, সেই কৈশোরেই কী রকম ‘চাইল্ডহুড ট্রমা’র মধ্য দিয়ে মেয়েটাকে যেতে হয়েছিল!শুধু এই কারণেই তো মালালা শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা পেতে পারেন আমাদের কাছ থেকে। তার আগের কিংবা পরের কাজ ও পুরস্কারগুলো– যেমন, নারীশিক্ষার জন্য মালালা ফান্ড গঠন, মৌলবাদ বিরোধিতা, ২০১৩ সালে ইউএনএ তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা, ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস পিস প্রাইজের জন্য ডেসমন্ড টুটুর নমিনেশন, শাখারভ পুরস্কার, টাইম ম্যাগাজিনের চোখে ২০১৩ সালের ‘অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তি’ নির্বাচিত হওয়া।

 

গত বছর টিভিতে জন স্টুয়ার্টের ‘ডেইলি শো’ এর একটি পর্বে মালালাকে আনা হয়েছিল। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল– ‘‘তোমাকে যারা গুলি করেছিল, আবার যদি তাদের কারও সঙ্গে মুখোমুখি হতে হয়, তবে তুমি কী বলবে?’’

উত্তরে মালালা বলেছিলেন-–

‘‘আমি বলব, মেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি তোমার মেয়ের শিক্ষার জন্যও আমি লড়ব।’’

আমরা বুড়ো হাবড়ারা যখন এ-ওর পেছনে লাগতে ব্যস্ত, ব্যস্ত কথার তুবড়ি ছোটাতে আর কিছু না পড়ে না জেনে ফেসবুকীয় বুদ্ধিজীবিতা জাহির করতে– তখন এই ষোল-সতের বছরের মেয়েটা আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে কাজ করতে হয়।

আমি আমার স্ট্যাটাসটা ফেসবুকে দেওয়ার পর অবধারিতভাবে সেই স্পর্শকাতর বিষয়টিও উঠে এসেছে যে, যে পাকিস্তান, তার মিলিটারি ত্রিশ লক্ষ বাঙালির হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তার সবকিছু অস্বীকার করাটা দোষের কোথায়? এমনটি লিখেছেন এক ফেসবুক বন্ধু স্ট্যাটাসের মন্তব্যে। আমি বলব, কেউ কিন্তু অস্বীকার করছে না যে, পাকিস্তানি সেনারা আমাদের ত্রিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। আমরা তার প্রতিবাদ করছি, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তিও চাচ্ছি। ঘৃণিত পাকসেনাদের বিচার দাাব করছি, দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও।

 

 

০ Likes ৩ Comments ০ Share ৫৩৬ Views

Comments (3)

  • - ফারজানা মৌরি

    কুলিদের দৌরাত্ন!