ভূতুরে গোরস্থান

গ্রামের সরল মনা ছেলে নাজমুল, সে বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। কাস নাইনে লেখাপাড়া করে। তার বাবা কৃষির পাশাপাশি ছোটখাটো ব্যবসা করেন। তার বাবার নাম কলিমুলাহ। অভাবের সংসার। একদিন নাজমুল স্কুল  থেকে ফিরল বিকেল ৪ টার দিকে। বাড়ীতে ফিরেই  বই খাতা রেখে খেলতে বের হলো। তাদের বাড়ীর কাছেই একটি মাঠ আছে, সে মাঠে এপাড়ার ওপাড়ারসব ছেলেরা ফুটবল খেলে। সে দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার হাটের দিন। তাই নাজমুলের বাবা ধান কেনা বেচা নিয়ে বাজারে খুব ব্যস্ত ছিল। নাজমুলের বাবা বাজার শেষে বাড়ী ফিরল । বাড়ীতে গিয়ে তার স্ত্রী আখলেমাকে বলল নাজমুলকে ওই ধান কাটা শ্রমিকের বাড়ীতে মজুরীর টাকা দিয়ে আসার জন্য পাঠাতে বলেছিলাম।
- ও‘মা আমার কথাটা মনেই নেই ।
নাজমুলের বাবার খুব রেগে গিয়ে বলতে লাগলো
-আজকে বাজারের দিন তারা বাজার করতে পারলো কিনা। তারাতো দিনে আনে দিনে খায়। তাদের টাকা এখনো পাঠিয়ে দেওয়া হয়নি। ------ কই ওই বদমাইশটা কই?
এই বলে তিনি নাজমুলকে ডাকতে থাকলো। এই নাজমুল------- নাজমুল।
নাজমুলের মা বলল - সে খেলতে গেছে।
-তাকে আজ আমি মজা দেখাবে, সারাদিন শুধু খেলা খেলা আর খেলা।
এই বলতে বলতে তিনি মাঠে গেল নাজমুলকে আনার জন্য। মাঠে গিয়ে দেখে নাজমুল ফুটবল তখনো খেলছে। তিনি নাজমুলকে ডেকে বললেন তাড়াতাড়ি বাড়ী আসো কাজ আছে। নাজমুল তার বাবার কাছাকাছি আসতেই , তার বাবা নাজমুলের এক কান টেনে ধরে বলল শুধু খেলা আর খেলা, সারাদিন তোমার আর কাজ নেই। কথা বলতে বলতে নাজমুলকে একসময় মারতে লাগলো।
নাজমুলকে মারতে মারতে তার বাবা বাড়ীতে নিয়ে এল। আর বলল
-যাও এই টাকা দিয়ে এসো রামপুরের সেই ধান কাটা শ্রমিক “ভেলুর” বাড়ীতে। তারা গরিব, বাজার করবে কি দিয়ে ? এখনো টাকা পায়নি হাতে !
মাগরিবের আযান দিচ্ছিল । নাজমুল ভয়ে আর বলতে পারছেনা যে সে যেতে পারবেনা। কারণ সে ফুটবল খেলতে খেলতে পা ব্যাথা করে ফেলেছে। তাই নাজমুল বাধ্য হয়েই সাইকেল নিয়েই বের হলো রামপুরের উদ্দেশ্যে । তাদের বাড়ী থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার যেতে হবে। অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হবে রামপুরে। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে রামপুর যেতে হলে ওই বড় ও সবচেয়ে পুরাতন ভূতুরে গোরস্থান এর পাশের রাস্তা দিয়েই যেতে হবে। গোরস্থানের কাছাকাছি আসতেই নাজমুল সাইকেল জোড়ে চালাতে লাগলো। কোন রকম কবরস্থানটা পাড় হলো সে। আর ভাবলো যাক বাবা কোন রকমে যাওয়ার সময় কোন বিপদ হয়নি। গোরস্থানটা ছিল অনেকটা জায়গাজুড়ে। পুরো গোরস্থানটি বন জঙ্গলে ভরপুর। আর মাঝখান দিয়ে ছিল সুরু একটা রাস্তা। আর সেই রাস্তা দিয়ে গোরস্থানটি পার হলো কোন রকমে ।
“ ভেলু” শ্রমিকের বাসায় পৌঁছাতে নাজমুলের রাত ৮টা বেজে গেল। “ ভেলু” কে বাড়ির উঠানে পেয়ে গেল নাজমুল । নাজমুল বলর চাচা এই নিন আপনার মুজুরির টাকা।
- কেন বাবা এত কষ্ট করে টাকাটা দিতে এলে ?। টাকাটা কালকে সকাল দিলেই তো হতো।
- আর বলিয়েননা চাচা ,আমার হয়েছে যত জ্বালা। বাবা বললেন তাই আমাকে আসতে হলো।
-এত রাতে যাবে কিভাবে ? বাড়ীতে যেতে পথে যদি কোন বিপদ হয় ?
-না কোন সমস্যা হবে না। আমি যেভাবে এসছি সেভাবেই ফিরে  যেতে পারবো ।
এই বলে নাজমুল আর দেরি না করে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। নাজমুল সাইকেল চালাচ্ছে আর ভাবছে রাস্তায়তো আমি কোন মানুষ জনও দেখতে পাচ্ছিনা। গ্রামের রাস্তা , রাত ৯ টা বেজে গেছে । রাস্তায় আর কাউকে দেখা যায় না। এই কথা সেই কথা ভাবতে ভাবতে নাজমুল সেই ভূতুরে গোরস্থানের কাছাকাছি এসে পৌঁছাল।
এমন সময় দু‘টা শিয়াল হুক্কা হুয়া করতে করতে তার সামনে দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। আর নাজমুলও সাথে সাথে ভয়ে পেয়ে গেল। সমস্ত শরীরে মনে হয় শিহরণ জেগে উঠল । শরীরের লোম একবার খাড়া হয় একবার বসে যায় !
নাজমুল ভাবে আরে ধ্যাৎ আমি না পুরুষ মানুষ ! আমার কাছে ওসব কিছুই ভীরতে পারবে না । তবে ওই ব্যাটা শিয়ালের বাচ্চাগুলো-----------! আমাকে ধরতে পারলে হয়তো ছিড়ে খেয়ে খেলতো!
নাজমুল আর পিছনে না তাকিয়ে সামনে গোরস্থানের দিকে তাকালো আর ভাবলো একটা মানুষও দেখা যায় না। শুধু শিয়ালের হুক্কা হুয়া ডাক ছাড়া কিছুই শুনা যাচ্ছে না। নাজমুল ভয়ে ভয়ে এগোতে লাগলো গোরস্থানের দিকে।পূর্বেই বলেছি গোরস্থানের রাস্তাটি ছিল খুব সুরু। কখনও রাস্তাটা পরিষ্কার মনে হচ্ছে কখনও অন্ধকার ! ভালোমত দেখা না গেলেও বুঝা যাচ্ছে কোন রকমে একটা ছোট রাস্তা। তাই নাজমুল সাইকেল জোড়ে চালাতে পারছেনা। ইস! একটা গাছের লতা মনে হয় নাজমুলের গলাটা পেঁচিয়ে ধরল । আসলে লতাপাতা জড়ানো বুনোপথ হয়তো তাই ! একটু যেতে না যেতেই নাজমুল দেখতে পেল এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড। তার পিছনে পিছনে অনেকগুলো মানুষের মাথার খুলি লাফাতে লাফাতে আসছে। আর বলছে ,
“কে যায় রে এত রাতে আমার রাস্তা দিয়া-
একবার যদি সামনে পাই তারে দিবরে ফেলিয়া !”
নাজমুল এই দেখে আর শুনে সাইকেল জোড়ে চালাতে লাগলো। তার সমস্ত শরীর ঘেমে ভিজে গেছে !
কিন্তু সামনে রাস্তায় কিসের সঙ্গে যেন ধাক্কা লেগে সাইকেল থেকে পড়ে গেল রাস্তার পাশে পুরাতন এক  ভাঙ্গা কবরের মাঝখানে। ওই কবর থেকে উঠার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা।
আর উঠবেই বা কেমন করে কারণ তার অলরেডি একটা পা কেউ মনে হয় ধরে আছে ! বরফের মত ঠান্ডা লতাগাছের মত আঙুল গুলো সমস্ত পায়ের নিচের অংশটা জাপটে ধরে আছে !
উহ ! পা ছুটাতে পারছে না নাজমুল !  সে বুঝতে পারলো তার  পায়ে প্রচন্ড আঘাত লেগেছে , পায়ে ব্যাথা শুরু হয়েছে ! সমস্ত শরীরটা যেন অবশ হয়ে আসছে !
নাজমুল ভাবছে বাবা মার সাথে হয়তো আর দেখা হবে না ! রাত গভীর হচ্ছে ! গোরস্থানে এসে ভুত আর মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ চলছে ! তার মাথা ঘুরছে, পিপাসায় গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে !
পানি চাই , শুধু পানি চাই ! তৃষ্ণা পাচ্ছে ! হাজার কষ্ট হলেও নাজমুল পুনরায় বুকে সাহস নিয়ে চিৎকার করে  বলছে, এ আমার কি হলো ? আমাকে বাঁচাও বাঁচাও ! চিৎকার করছে আর কান্না করছে ! কিন্তু  কেউ তার ডাক শুনতে পাচ্ছে না। এক পর্যায়ে নাজমুল আলাহর নাম স্মরণ করে জোড়ে দিল এক লাফ ! ব্যাস ! লাফিয়ে উঠলো কবর থেকে। আর সাইকেল কোথায় পড়ে আছে সে দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধকারে খোঁজার চেষ্টা করল কিন্তু পারলো না। তাই বাধ্যহয়ে ওই রাস্তা দিয়ে কোন রকমে ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। এবার দু’জন লোক পিছন থেকে তার দুই হাত ধরে ফেলল ! নাজমুল দেখে ওরে বাপরে বাপ ! এ দুটো লোকের কোন মাথা নেই ! ওহ ! এ বিপদের শেষ কোথায় ? সে তাদেরকে আরো ভয় পেয়ে যায়। কি অদ্ভূত মানুষ ভাবতেই গা শিউরে উঠে। সে এমনিতে খুব কান্ত তার উপর এই দৃশ্য দেখে অজ্ঞান প্রায়। ভয়ে তার কান্না পাচ্ছিল কিন্তু কাঁদতে পারছেনা সে। ওই দু‘জন লোক তার হাত ধরে নিয়ে গেল এক গাছের নিচে । তারপর তারা পিছনের ফেলে আসা রাস্তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় উধাও হয়ে গেল। কিন্তু তার আর উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই। কোন কিছু বলার শক্তি নেই। অবচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। তার এখন সাহায্যের প্রয়োজন। কিন্তু কে করবে তাকে সাহায্য ! এদিকে রাত প্রায় ১ টা বেজে গেছে। নাজমুলের বাবা কলিমুলাহ আর তার মা আখলেমা বেগম ভাবছে তাদের ছেলে এখনও বাড়ী ফিরলনা !  এবার নাজমুলের মা তার বাবাকে বলল
-এখনও তুমি বাড়িতে বসে আছো ? ছেলেটা সেই সন্ধ্যেবেলা বাড়ি থেকে বের হলো এখনও ফিরল না ?
-আমিওতো তাই চিন্তুা করছি এখনও কেন সে বাড়ী  ফিরল না ?  
তাই নাজমুলের বাবা দেরি না করে বের হলো নাজমুলকে খুঁজতে । প্রতিবেশী আবুল ,সবুর ,বাবু , রহিম সঙ্গেললম আর হারিকেন জ্বালিয়ে নিল ! সকলেই নাজমুলকে খুঁজতে খুঁজতে  সেই ভূতুরে গোরস্থানের দিকে আসতেই চোখে পড়ল নাজমুল অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে গাছতলায়।সবাই ধরাধরি করে নাজমুলকে বাড়িতে নিয়ে এল ! কিন্তু তার জ্ঞান ফিরছে না !
সবাই বলাবলি করছে আর অপোয় থাকা যায় না। তাকে হাসপাতালে নিতে হবে।
তাকে হাসপাতালে নেয়া হলো। হাসপাতালের চিকিৎসক বলল তার একটা পায়ে খুব ব্যাথা পেয়েছে । এটা এক্স-রে করতে হবে । তাছাড়া নাজমুল খুব ভয় পেয়েছে ! তার এখনো জ্ঞান ফিরছেনা। জ্ঞান ফিরলেই সমস্ত ঘটনা আমরা তার কাছ থেকেই শুনবো । এখন তার প্রচুর বিশ্রামের প্রয়োজন !

০ Likes ১১ Comments ০ Share ৫৬১ Views