পেত্নী

 

ছোট বেলায় গ্রীষ্মের ছুটিতে নানার বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। আমার নানা বাড়ি সেতাবগঞ্জের চাপাইতোরে। সে অনেকদিন হল । চারদিক শুধু বন  জঙ্গল । বনে দেখা যেত বন মুরগি , খরগোশ , শিয়াল , খেঁক শিয়াল , ডাহুক আর হুতুম পেঁচা ! আরও কত কি ! রাতে শিয়ালের  “হুক্কা হুয়া ” ডাক শুনলেই নানী বলতেন এই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড় । সকাল হলে আবার শিয়াল “ হুক্কা হুয়া ” বলে তোদের ঘুম থেকে ডেকে দিবে । নানীর কথা শুনে আর শিয়ালের “ হুক্কা হুয়া”  ডাক শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম । তখন ছিল জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষের দিকে। নানাবাড়িতে মধুমাসের আম, কাঁঠাল ও লিচু খেতে যে কি আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা মুসকিল । এ  মৌসুম টাই মধুমাসের ভরা যৌবন । এই সুবাদে প্রতি বছরে যেতাম নানা বাড়িতে। সবাই বলাবলি করছিল সে সময় ওই এলাকায় ভূত পেতœীর আনাগোনা ছিল বেশি ! তাই রাতে কেউ ভয়ে বাড়ি থেকে বের হত না। আমি অবশ্য এগুলো বিশ্বাস খুব কম করি । চোখে ঘুম আসছিল না , এমন সময়ে খুব হৈ চৈ শুনতে পেলাম । আমার কৌতুহল একটু বেশি হল । বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম । নানা আর নানী হাতে হারিকেন জ্বালিয়ে পাড়ার সবাইকে ডাকছে আর বলছে তোমরা সবাই জেগে থাকো , মতি অজ্ঞান হয়ে গেছে ! মতি অজ্ঞান হয়ে গেছে ! ! আমার মামার চাচাতো বোনের জামাই মানে আমার সম্পর্কে হয় খালু। এই খালুর বাজার থেকে আসতে দেরি হচ্ছিল বলে সারা পাড়াময় হৈ চৈ পড়ে গেল । কোন বাজারে গিয়েছিল তা আমার সঠিক মনে নেই।
বাজার থেকে প্রতিবেশী এক মামা, হ্যাঁ হ্যাঁ ওই রতন মামা সাইকেল নিয়েই  বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ গাছ তলায় এসে দেখে মতি দুলাভাই রাস্তার পাশে পড়ে আছে!
আবছা অন্ধকারে রতন মামা খালুকে চিনতে দেরী করলো না । সে খালুকে রাস্তার ধার উঠিয়ে বসালো আর বলল কি হয়েছে দুলাভাই এ ভাবে সাইকেল একদিকে আর আপনি একদিকে ব্যাপার কি ?   
কিন্তু সে কোন কথায় বলল না, অন্য রকম ব্যবহার করছে , চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। আর শুধু হাঁপাচ্ছে।
তো খালু কোন কথা না বলে সাইকেলে উঠে চলতে লাগলো। মামাও তার পিছনে পিছনে সাইকেল চালাতে লাগলো।
মামা দেখলো খালু সাইকেল চালাচ্ছে তো চালাচ্ছেই ,আর  কি যেন বিরবির করে বলে যাচ্ছে ! আর মাঝে মাঝে জোরে জোরে কান্না করছিল আবার কখনো সাইকেলের উপরে লাফালাফি করছিল। মামার বুঝতে আর কষ্ট হলো না যে তাকে কোন কিছু ভড় করেছে।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই মামা দেখে খালু সাইকেল থেকে পড়ে যায়। কাছে এসে দেখলো  সে অজ্ঞান হয়ে গেছে, আর দেরি না করে তাকে তাড়াতাড়ি বাসায় পৌঁছে দিল।  ততণে এলাকার লোকজন ভীড় জমাতে শুরু করল।
আমার নানা বাড়ী থেকে খালুর বাসার দূরত্ব মাত্র ২০ গজের মত হবে। তখন রাত ৯ টা কি ১০টা বাজে হয়তো, আমি ভয়ে ভয়ে গেলাম খালুর বাসায়। গিয়ে দেখি অনেক লোকজন ভীড় করেছে। আর সবাই বলাবলি করছে মতি খালু  অজ্ঞান হয়ে গেছে।  এদিকে ওই রতন মামা ডাক্তার আনতে গেছে। তখনও খালু অজ্ঞান অবস্থায় ছিল।
প্রায় আধা ঘন্টা পরে মামা ডাক্তার নিয়ে আসার সাথে সাথে খালুর জ্ঞান ফিরেছে। আমি অবশ্য ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঘরের ভিতরে ৬ -৭ জনের মত লোক ছিল। হঠাৎ তার জ্ঞান ফিরলে সে সাথে সাথে চিৎকার করে বলতে লাগলো- তোমরা সবাই আমার সাথে বেঈমানী  করেছ ! আমি মাত্র ২৫ টা ভোট পাব কেন ? আমারতো ৫ হাজার ভোট পাবার কথা ? তোমারা সবাই আমার কাছে ভোট বিক্রি করেছ ! আমার বস্তার টাকা সব তোমাদের কাছে বিলিয়ে দিয়েছি ! আর ওই আমগাছটারও ভাগ চাচ্ছ ? আমার বাসার উপর তোমাদের লোভ কেন ?  আর খারাপ ভাষায় গালাগালি করছে, যা লেখা বা বলার মত নয়। সবাই তার কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। এতো তার কণ্ঠস্বর নয় ! খালুর কণ্ঠে মেয়েলি কণ্ঠস্বর ! আমিও শুনলাম খালু মেয়েলি কণ্ঠে কথা বলছে। আর বলছে ওই বদমাইশের বেটা আমার উপর সাইকেল চাপিয়ে দিয়েছে !
খালু ঘরের ভিতরের লোকজনকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ওই মুহুর্তে খালুকে ৫-৬ জন লোক ধরে ফেলল। সে জোড় করে ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিল।
এক পর্যায়ে ঘরের দরজাটা ভেঙ্গে গেলে সে আবারও অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে দেখলো তার কিছুই হয়নি, ওকে আমার চিকিৎসার প্রয়োজন নেই বরং আপনারা ভাল একজন হুজুর ডেকে তেল- তাবিজ করে নেন সে ভালো হয়ে যাবে । আমার মনে হয় তার উপরে পেত্নী ভর করেছে মানে পেত্নী ঘাড়ে চেপেছে  !
তারপর আর কি করা যায় ! সকলে মিলে তাকে বারান্দার এক খুঁটিতে বেঁধে রাখলো। সাথে সাথে গ্রামের  এক হুজুরকে ডেকে আনা হলো।
এর মধ্যে অবশ্য তার জ্ঞান ফিরেছে কিন্তু এবার কোন কথায় বলছে না শুধু চোখগুলো বড় বড় করে মাথাটা ঘুরাচ্ছিল।
হুজুর এসেই তাড়াতাড়ি সরিষার তেল, ডালিমের ডাল, গোলমরিচসহ আরো কি কি যেন চাইলেন! আর বললে তাকে (মতিকে) মাটিতে পাটি বিছিয়ে কাত করে শুয়াতে হবে ।
হুজুরের কথা তাই করা হলো । হুজুর তার দুইকানে সরিষার তেল লাগিয়ে দিল। তারপর খালুর এক হাতের আঙ্গুল ধরে কি যেন বলছিল আর ডালিমের ডাল দিয়ে খালুকে  মারছিল, আর জোরে জোরে ফু দিচ্ছিল।
এক পর্যায়ে খালু আবারও মেয়েলি কণ্ঠে বলছে- এই আমাকে ছেড়ে দে, ছেড়ে দে বলছি আমাকে। নইলে সবাইকে আমি মেরে ফেলবো।
হুজুর বলল -তোর সামনে কে আছে দেখতে পাসনি ? এই তুই আমাকে চিনিস না ? আমি কে ?
কিন্তু পেত্নী কথার কোন জবাব না দিলে হুজুর আবারো খালুকে মারতে শুরু করে। আর পেত্নী বার বার বলছে -আমাকে ছেড়ে দে , আমি তাকে মেরে ফেলব !
-তোর নাম কি ? কোথা থেকে এসেছিস ?
(পেত্নীতো কোন কথা বলছেই না। শুধু কান্না করছে আর বলছে আমাকে মারিস না।)
অনেকন পর বলল আমার নাম “ পেত্নী সুফিয়া ”।
-কেন একে ভর করেছিস ?
-ওই আম গাছের নিচে আমি বসেছিলাম , আম পাহাড়া দিচ্ছিলাম, পাকা আম খাচ্ছিলাম। আর ওই বেটা এসে আমার গায়ে  সাইকেল চাপিয়ে দিল !
-যা হওয়ার হয়েছে। এবার তুই ছেড়ে পালিয়ে যাবি না আমি কিছু তোর পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবো ? - ঠিক আছে আমি একাই যাব !
-কিভাবে যাবি ?
- ওই পানির বালতিটা কামড়ে ধরে যাব !
অবশেষে আমি দেখলাম খালু মুখ দিয়ে পানির বালতিটা কামড়ে ধরে আছে ! কিছুণ পরে তার মুখ থেকে বালতিটা পড়ে গেল ! তারপর সে আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল !
হুজুর বললেন পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে আপনারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান । মতি মিয়া ভাল হয়ে গেছে । আমি রতন মামার কাছে সব কথা ভাল মত জেনে আর সব্বার কাছে শুনে........................

তারপর দিন খালুকে রাতের ঘটনার কথা বললে খালু বললেন তার বাজার করতে দেরি হয়েছিল, ঠিক সন্ধ্যার পর পরেই সাইকেল নিয়ে বাজার থেকে আসার সময় রাস্তার পাশে এক আম গাছের নিচে সাইকেলের চেইন পড়ে যায় ! কি আর করবে সে , বাধ্য হয়ে সাইকেল থেকে নেমে সাইকেলের চেইন তোলা শুরু করে ! সে নির্ভয়ে ওই আম গাছের নিচে সাইকেলের চেইন তোলার কাজ করছিল। ঠিক সেই মুহুর্তে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কে যেন সামনে থেকে লাথি মারলে সে উল্টে পড়ে যায় । তারপর থেকে আমার কিছুই মনে নেই---------।

০ Likes ১৭ Comments ০ Share ৭৯৩ Views

Comments (17)

  • - ঘাস ফুল

    গোপাল ভাঁড়ের গল্প যতই পড়ি, ততই মজা পাই। এতো পড়েছি, তারপরও হাতের কাছে পেলে আবার পড়ে নেই। শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ ইসমাইল। 

    যদি পারেন মাঝে মাঝে নাসিরউদ্দিন হোজ্জার গল্প আমাদের জন্য পোষ্ট দিতে পারেন।