রাজু আহমেদ

৪ বছর আগে

পরকে করেছে আপন তবে ঘরকে করেছে পর

বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ বাস্তব জগতের চেয়ে ঢের বেশি সময় ব্যয় করে ভার্চুয়াল জগতে । ভার্চুয়াল জগতের নির্দিষ্ট পরিধি নির্ধারণ করা সহজসাধ্য না হলেও সব বয়সের মানুষ এ জগৎ সম্পর্কে কম-বেশি ধারনা রাখে । অক্সফোর্ড ডিকশানারীতে ভার্চুয়াল শব্দের অর্থে লেখা হয়েছে, ‘কার‌্যতঃ কিন্তু বাহ্যতঃ নয়’ । ভার্চুয়াল শব্দের শাব্দিক অর্থ ও সংজ্ঞা যতই বিদঘুটে হোক, মানুষের জীবনকে দুটো পৃথক রাজ্যে ভাগ করে ফেলেছে এ শব্দটি । ভার্চুয়াল জগতে সময় অতিবাহিত করতে যতগুলো মাধ্যম ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ও জনপ্রিয় ফেসবুক । শুধু বাংলাদেশে নয় কিংবা গোটা বিশ্বের তরুণ-তরুণ, যুবক-যুবতীই শুধু নয় বরং সব বয়সের মানুষ যে ওয়েবসাইটটি সর্বাধিক ব্রাউজ করে সেটাও ফেসবুক । সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে । যে কোন পরিবর্তনেই যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে তেমনি নেতিবাচক দিকও কম নয় । যেখানে সম্ভাবনা বেশি সেখানে অবশ্বম্ভাবীভাবেই অনিশ্চয়তাও বেশি । সম্ভাবনাকে যদি জনকল্যানে ব্যবহার করা না যায় তখন সেটা হুমকি স্বরূপ আবিভূর্ত হয় । ফেসবুকের অবস্থাও ঠিক তেমন । যারা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফেসবুক ব্যবহার করতে পেরেছে তারা উপকৃত কিন্তু যারা এটাকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করেছে তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । অবশ্য যারা চরমভাবে ফেসবুকাসক্ত তারা লাভ-ক্ষতির হিস্যা কষার চেয়ে ফেসবুকে সময় কাটানোকেই বেশি প্রধান্য দেয় ।

 

পৃথিবীর জানা-অজানা মানুষকে সম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়ে আত্মীয় করেছে ফেসবুক । দূরকে টেনেছে কাছে আর পরকে করেছে আপন । গোটা বিশ্বকে এনেছে হাতের মুঠোয় । দূর দেশের ছেলে-মেয়ের মধ্যে ফেসবুক সূত্রে পরিচয় হয়ে তা পরিণয়ে রূপ লাভ করছে । আবার ফেসবুকের জন্যেই ভেঙ্গে যাচ্ছে অনেকের সাজানো সংসার । ফেসবুকাসক্ত একদল তরুন-তরুনী তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অহেতুক-অনর্থ হেলায় ফেলায় কাটিয়ে দিচ্ছে । ফেসবুক জ্বরে শুধু তরুন-তরুনীরা নয় বরং সব বয়সের ব্যবহারকারীরাই কম বেশি আক্রান্ত হয়ে পড়েছে বললেও বোধহয় অতিরঞ্জিত করে বলা হবে না । দিনের অন্যান্য কাজগুলো রুটিন অনুযায়ী না হলেও ফেসবুক ব্যবহার ঠিকই নিয়ম মাফিক হচ্ছে । ফেসবুকের পেইজে নির্ধারিত সময়ে প্রবেশ করা হলেও ঠিক সময়ে বের হওয়া অনেকের জন্যই অসাধ্য । বিভিন্ন কারনে অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তুলনায় ফেসবুকের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি । ফেসবুকের মাধ্যমে ছবি শেয়ার, খবর শেয়ার, বার্তা পাঠানো, দল ভিক্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি, বিজ্ঞাপণ কিংবা চ্যাটসহ বিভিন্ন কাজ অতি সহজে করা যায় । ২০০৪ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী মার্ক জুকারবার্গের নেতৃত্বে একদল প্রযুক্তিমনস্ক প্রতিভাধারী তরুন-ছাত্রের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত ফেসবুক তার যাত্রার প্রারম্ভকাল হতেই বিশ্বের বুকে সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক আন্তসংযোগ যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি ওয়েবসাইটে পরিনত হয়েছে । ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও ফেসবুকের কল্যানে বন্ধুদের সাথে মনের সবকিছু শেয়ার করছে । ফেসবুক আসক্ত অনেক পিতামাতা তাদের অনাগত সন্তানের কাল্পনিক নামে ফেসবুকে সদস্যপদ নিয়ে রাখেন যাতে তাদের সন্তানকে পৃথিবীর আলোয় এসে ফেসবুকের সদস্য হতে অতিরিক্ত সময় দিতে না হয় ! ফেসবুকের প্রতি মানুষের এক ধরনের ম্যানিয়া সৃষ্টি হয়েছে । যে ম্যানিয়া যেমন উপকার করছে তেমনি অপকারও কম করছে না । যদিও ফেসবুকের নিয়ম অনুসারে ন্যূণতম ১৩ বছরের কম বয়সী কোন শিশু ফেসবুকের সদস্য হতে পারবে না তবুও এ নীতি কেবল নিয়মেই সীমাবদ্ধ রয়েছে । বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ৪০০ মিলিয়ণ কার‌্যকরী ফেসবুক ব্যবহারকারী এই ওয়েবসাইটি ব্যবহার করছে । অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রচার এবং বিজ্ঞাপনের জন্য ফেসবুককে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে । নিমিষেই এখানে আনন্দ উপরকরণের সবকিছু পাওয়া যায় । তাই অন্যান্য সকল সামাজিক মাধ্যমের তুলনায় ফেসবুকের অগ্রযাত্রার গতি দুর্বার । ফেসবুককে পত্রিকার চেয়েও শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে ধারণার প্রথা চালু হয়েছে । সমগ্র বিশ্বের আনাচে-কানাচের সকল খবর ফেসবুকের কল্যানে মূহুর্তের মধ্যে দিগ-দিগন্তে ছড়িয়ে যাচ্ছে । রাজনৈতিক দল, নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বীয় কিংবা দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য ফেসবুক ব্যবহার করছে । বিশেষ কোন বাধ্যবাধকতা না থাকায় ফেসবুক অবর্ণনীয় সুনাম কুড়িয়েছে । তবে ভালো মানুষেরা তাদের সৎ উদ্দেশ্যকে যেভাবে ফেসবুকের মাধ্যমে অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছে তেমনি অসৎ কিছু মানুষ তাদের খারাপ উদ্দেশ্যকেও ফেসবুকের মাধ্যমে প্রসার ঘটাচ্ছে । ফেসবুক ব্যবহার করেই অপরাধীরা এমন কিছু অপরাধ করছে যার ফলে সামাজিক নিরাপত্তা হুমকীর সম্মূখীন । আমাদের দেশে ফেসবুক বাধাহীনভাবে ব্যবহার করা গেলেও বিশ্বের কিছু দেশে ফেসবুক বাধার সম্মূখীন হয়েছে । সিরিয়া, চায়না এবং ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশে এটা আংশিকভাবে কার‌্যকর আছে । এ সকল দেশের কর্তৃপক্ষ ফেসবুক ব্যবহারে সময় অপচয় হয় আখ্যা দিয়ে কর্মচারীদেরকে এটা ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে ফেসবুককে প্রায় নিষিদ্ধ করেছে ।

 

শত-সহস্র কল্যানের মধ্যেও ফেসুবক এমন কিছু নিরব ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটাচ্ছে যার খেসারত দিয়ে শেষ করা যাবে না । প্রতিযোগীতামূলক বিশ্বে গতির সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষ ক্রমশ যান্ত্রিকতায় রুপ নিচ্ছে । এ কারনে পরিবার, সমাজের সাথে সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটছে । অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার বাইরে যেটুকু পালন করলেই নয় মানুষ শুধু সেটুকুই দায়সারাভাবে পালন করে যাচ্ছে । যে কারনে পারিবারিক দৃঢ় বন্ধনে ছেদ পড়তে শুরু হয়েছে, সামাজিক সম্প্রীতি প্রায় বিলীনমূখী । স্বামী-স্ত্রীর, পিতামাতা-সন্তানের, ভাই-বোনের মধ্যকার সম্পর্কে দূরত্ব বেড়েই চলছে । শত ব্যস্ততার মধ্যেও যেটুকু অবসর সময় পাওয়া যায়, যে সময়টুকু অতীতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আড্ডা ও গল্পে কেটে যেত কিন্তু এখন আর পূর্বের মত সময় কাটানো হচ্ছে না । অবসর সময় কাটানোর ধরণেও এসেছে পরিবর্তন । স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি বসে কিংবা শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে কিন্তু তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপাড়ায় দূরত্বের পাহাড় সৃষ্টি করেছে ফেসবুক । স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ফেসবুকে তাদের বন্ধুদের সাথে আলাপে ব্যস্ত । পরের খবর রাখতে গিয়ে আপন ঘরের খবর যেন বহুদূরে । সন্তানের সাথে পিতামাতার পূর্বের মত যোগাযোগ কিংবা সামান্যতম আন্তরিকতাও অবশিষ্ট নেই । ভাই-বোনের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টির সময় হচ্ছে না । সবাই সবার মত নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত । ফেসবুকে বন্ধুর স্ত্রী-সন্তানের যতটুকু খবর রাখা হচ্ছে তার সামান্য অংশও রাখা হচ্ছেনা নিজ-স্ত্রী, সন্তান কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের । পরকে আপন করতে গিয়ে আপনের কাছে যে চিরতেরে পর হয়ে যাচ্ছে তার খবর কেউ রাখছে না । ভাব দেখে মনে হয়, আপনের খবর রাখা যেন দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে না । অন্যের চাল-চুলো অর্থ্যাৎ গোটা বিশ্বের খবর নখদর্পণে অথচ আপন নীড়ের খবর জানা নাই । পরিবারের সদস্যরা কোন পথে চলছে, তাদের কোথায় সমস্যা সে বিষয়ে কোন মাথা ব্যাথা নাই । সবাই সবার থেকে যেন মুক্ত । 

 

ফেসবুকের উপকারের কথা বর্ণনায় শেষ হবে হয়ত কিন্তু ক্ষতির প্রভাব শেষ হবার নয় । ফেসবুক আমাদের চিরাচরিত জীবনকাঠামোতেও প্রভাব ফেলেছে । সুদূঢ় অতীতকাল থেকে এদেশের মানুষ সন্ধ্যা রাতে নিদ্রায় যেত যাতে খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে কাজে যেতে পারে । চিরাচরিত এ নিয়মে প্রবল ধাক্কা দিয়েছে ফেসবুক । এখন রাতের শেষ প্রহরে নিদ্রায় যায় এবং দ্বিপ্রহরে জাগে । সাধারণ মানুষের ওপর ঘুমরীতির পরিবর্তনে যে প্রভাব পড়ুক কিন্তু তরুণ, যুব ও ছাত্র সমাজে পরিবতির্ত প্রভাবে যে ভয়াবহ ক্ষতির হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । তরুণ, যুব ও শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের প্রাণ । তারা ক্ষতিগ্রস্থ হলে রাষ্ট্র সঠিক পথে হাঁটবে কিভাবে ? অফিস আওয়ারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ফেসুবক ব্যবহার অভ্যাসের রীতিতে পরিণত হয়েছে । সীমিত অফিস টাইমের একটি নির্বারিত সময় যদি ফেসবুকে ব্যয় হয় তবে রাষ্ট্রের কাঙ্খিত উন্নয়ন তো বাধাগ্রস্থ হবেই । ধর্মকে কটাক্ষ করার মাধ্যম হিসেবেও ফেসবুক ব্যবহৃত হচ্ছে । বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গকে হত্যার হুমকির মাধ্যম হিসেবেও ফেসবুকের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে । সব কিছুর পরেও মনে রাখতে হবে, আমাদের সার্বিক জীবনের সাথে ফেসবুক আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে । কোনভাবেই ফেসবুকহীন কাটানোর কল্পনাও করা যায়না । সুতরাং ফেসবুকের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো দূর করে কিভাবে এটাকে কল্যানমূখী করা যায় তার প্রচেষ্টা থাকতে হবে । পরকে আপন করার মত গৌরবের কিছু নাই কিন্তু পরকে আপন করতে গিয়ে যেন চিরতরে আপন পর হয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে । ব্যক্তি ও জাতীয় উন্নতির জন্য ফেসবুকাসক্তি থেকে দূরে থাকতেই হবে । মনে রাখতে হবে, ফেসবুক আমাদের জীবনের একটি সহযোগী সংঘঠন মাত্র । সম্ভাবনার ভবিষ্যতে যেন ফেসবুকের ক্ষতিকারক তীব্রতা কোনভাবেই হানা দিতে না পারে । অধিক স্মার্ট হতে গিয়ে যেন চিরতরে আনস্মার্ট হয়ে না যাই । 

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

www.facebook.com/raju69mathbaria/

১ Likes ১ Comments ০ Share ৩৭৮ Views

Comments (1)

  • - বাঁকের ভাই

    এভাবেই একজন বাবার পুনর্জনম হল।
    সব বাবারা সময়ের ঘ্রাণে উদ্বেলিত অসময়কে যেকোনো সময়েই অতিক্রম করে একজন 'বাবায়' পরিণত হয়ে থাকেন। একজন বাবা কখনোই হারেন না। অন্তত নিজের সন্তানের কাছে।

    চমৎকার অনুভূতি হল!! অসাধারণ লিখেছেন।emoticons

    • - মামুন

      ধন্যবাদ ভাই আপনার সুন্দর মন্তব্য রেখে যাবার জন্য। ভালো থাকুন।emoticons

    - টি.আই.সরকার (তৌহিদ)

    ওর মনের ভিতরের ‘আমার আব্বু এমন কেন’ সেই অনুভূতি ইতোমধ্যে কখন যেন নেই হয়ে গেছে। সেখানে বিরাজ করছে ‘ এই তো আমার বাবা!’

    চমৎকার প্রিয় !

    • - মামুন

      আপয়ান্র অনুভূতি জেনে অনেক ভালো লাগল প্রিয়!

      শুভেচ্ছা রইলো।

    - মোঃ শহীদুল ইসলাম

    বেশ বড় হয়েছে। তারপরও ভালো লাগল। ধন্যবাদ আপনাকে।

    • - মামুন

      হ্যা, একটু কষ্ট হয়েছে আপনার। সাথে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ ভাই।

    Load more comments...