Site maintenance is running; thus you cannot login or sign up! We'll be back soon.

প্রীতীশ বল

২ বছর আগে

ধ্বংসোন্মুখ আদিবাসী শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশে নববর্ষের ভাবনা কুমার প্রীতীশ বল



প্রাককথন
সাধারণত বাংলা নববর্ষ আসলে এ জনপদের সচেতনমহল হিসাবে পরিচিত লোকসকল নিজেদের এবং চারপাশের জনগোষ্ঠীর লোকায়ত শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং বিকাশের ভাবনাক্রান্ত হয়ে পড়ে। আমরাও এর বাইরে আসতে না পেরে বহুজাতিক বাংলাদেশে যে ৪৫টি (মতান্তরে ৭৫টি) আদিবাসী জাতিসত্তার লোকসকল বসবাস করে, তাদের রয়েছে বৈচিত্র্যময় ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও বিকাশের ভাবনায় করণীয় নির্ধারণে সচেষ্ট হয়েছি। প্রকৃত সত্য হলো, আমার এবারের নববর্ষের ভাবনা মূলত আদিবাসীদের লোকায়ত শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং বিকাশকে কেন্দ্র করে তাড়িত হয়েছে। কারণ বর্তমানের আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসী থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে এসকল বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আর তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অগ্রসরমান অংশ তাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে উদ্বিগ্ন। বস্তুতপক্ষে এক ধরনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা থেকেই জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল (জাক) রাঙামাটিতে নববর্ষের প্রাক্কালে আয়োজন করে আসছে (যথাসম্ভব ১৯৯৮সাল থেকে) আদিবাসী সংস্কৃতি মেলা। যে পাঁচটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মেলার আয়োজন করে তা হলোÑ
ক. আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহের ইতিহাস, ঐতিহ্য বৈচিত্র্যময় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ বিকাশ ও লালন করা।
খ. আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহের বিলীনপ্রায় ঐতিয্যপূর্ণ সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা।
গ. বিলুপ্তপ্রায় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নানাবিধ উপাদান প্রদর্শনের মাধ্যমে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা।
ঘ. সচেতন অংশের সঙ্গে তৃণমূল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুদৃঢ় জনসংযোগ স্থাপন করা।
ঙ. আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতি তথা আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সেতু বন্ধন রচনা করা।
ধ্বংসোন্মুখ আদিবাসী সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের নিজস্ব উদ্যোগ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে এবং সরকার, বেসরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কাছে তাদের প্রত্যাশা এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে আমি একাধিক বার এই আদিবাসী সংস্কৃতি মেলায় অংশগ্রহণ করেছি। কথা বলেছি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অগ্রসরমান অংশের সঙ্গে।
এই অভিজ্ঞতার তুলে ধরতে চাই, এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ১৯৯৩ সাল থেকে বেসরকারি উদ্যোগে(স্পষ্ট করে বললে আদিবাসীদের নিজস্ব উদ্যোগে) আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়ে আসছে।

এক.
আদিবাসী সংস্কৃতির কথা বললে নানান কারণে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের কথা সবার আগে মনে পড়ে। পার্বত্য জনপদে শান্তিচুক্তির আগে থেকেই আমার যাতায়াত। কিন্তু শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর যাওয়াটা ছিল তাৎপর্যমন্ডিত। নববর্ষের প্রাক্কালে চৈত্রের রৌদ্রকরোজ্জ্বল কিংবা ঘনঘোর অমানিশায় রাতগভীরে (রাত ১২টা-১টা) রাঙামাটির পাহাড়ী জনপদে চলতে গিয়ে এতটুকু ক্লান্তি কিংবা ভয় আমার ভেতরে কাজ করেনি। অতীতে যা নাকি আমার না হলেও আমাদের স্বজন কিংবা গুণগ্রাহীদের ভেতর প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ছিল। কিন্তু নিজের স্বস্তির দিকটা নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করি, এখনো প্রতিটি জাতিসত্তা আশা-নিরাশার দোলাচলে বন্দি। এসব শান্ত, সজীব, উদারনৈতিক মানুষগুলো মুখ ফুটে যা কিছু প্রকাশ করছে, তার চেয়েও অনেক বেশি অনুচ্চারিত থেকে যাচ্ছে। ওরা এখনো ছাদ ফাটিয়ে হাসে না, বিলাপ করে কাঁদেও না। কারণ ওরা এখনো ভুলতে পারেনি, একদিন এই নিকট অতীতেই ‘তাদের জীবন থেকে জীবন হারিয়ে গিয়েছিল,ন্বপ্নহীন হয়ে পড়েছিল তারা। পাহাড়, অরণ্য, নদী, ঝর্ণা, রাঙামাটির হ্রদের পানি, ঘর, উঠান, জমি, বাগান, বাগিচা, পায়ে চলার বুনো পথ, কেয়াং, মন্দির, জুম ক্ষেত, মাচাং ঘর, গ্রাম, সংগীত, উৎসব সবকিছু অশুচি-অপবিত্র হয়ে গিয়েছেল। নোংরা রাজনীতি ও বহিরাগত বাঙালি পুনর্বাসনের মাধ্যমে পাহাড়ীদের জীবন হয়ে পড়েছিল দূষিত’ (সজ্ঞীব দ্রং)। এখনো, শান্তিচুক্তির পরও সেই কালিমার ছাপ ওদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধে একদিন জুম্মজনগোষ্ঠীর জীবন থেকে যে গেংখুলীরা বিদায় নিয়েছিল। তারা আজও ফিরেনি। অথচ আমাদের মাযেরা, আমাদের পিতারা এখনো তাদের অপেক্ষায়। তাঁরা আর্তস্বরে বিলাপ করছে, আমাদের গেংখুলীরা ফিরে আসুক। রাধামন ধনপুদি পালা, নরধন নরপুদি পালার মতো আবারও গেংখুলীরা নতুন পালা গান বাঁধুক। যেখানে আদিবাসী জনপদের সুঠাম কান্তি মানুষের বীরত্বগাথা, সমাজব্যবস্থা, সামাজিক রীতিনীতি, আচার-আচরণের কথাই শুধু থাকবে না। আরও থাকবে আদিবাসী জনপদের প্রতিটি জাতিসত্তার উন্নয়নের প্রাসঙ্গিক ভাবনা। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।

দুই.
উন্নয়নের পূর্বশর্ত যদি হয় পারস্পরিক বিশ্বাস অর্জন, আস্থা স্থপান। তবে আদিবাসী জনপদে তা এখনো অর্জিত হয়নি। যদি এই অর্জন অপূর্ণ থাকে, যদি ‘দেবে আর নেবে মিলাবে মেলাবো’Ñ এই গীতবাণী বাঙালিসহ প্রতিটি জাতিসত্তার ভেতরে সমস্বরে সঞ্চারিত না হয়, তবে কখনোই আদিবাসী মানুষের উন্নয়নের পু®পকরথ তর তর বেগে এগিয়ে যাবে না। আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নানা ধরনের সন্দেহ কিংবা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের যথেষ্ট ক্ষেত্র বিগত সময়ে প্রস্তুত হয়েছে। যা কিনা এখনো কঠিন শীলার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
রাঙামাটি শহরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সার্কিট হাইজ, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা। একদা এ অংশের নাম ছিল ‘ভেদভেদি’।
‘ভেদভেদি’-একট চাকমা শব্দ। এর অর্থ ‘বুদবুদ’। ‘ভেদভেদি’ নদীর নামানুসারে এ এলাকার নাম হয় ‘ভেদভেদি’। কথিত আছে, দৈত্যরাজ অবস্থা বেগতিক দেখে মাটি ফুঁড়ে পাতলপুরীতে গিয়ে লুকায়। এতে সেখানে বহুদিন মাটি ফুঁড়ে বুদবুদ উঠে একটি নদীর সৃষ্টি হয়। আর সে নদীর নাম হলো, ’ভেদভেদি।’
কিন্তু বাঙালি পুনর্বাসনের সময়ে জনৈক মেজর আমানতের নাম স্মরণে রাখতে ‘ভেদভেদি’ এলাকার নাম হয়ে যায় ‘আমানত বাগ’। এমনিভাবেই জুম্মজনগোষ্ঠীর মতামতকে উপেক্ষা করে ‘আলীয়াকেদম’ একদিন প্রত্যুষে হয়ে গেল ‘আলীকদম’। অথচ এসকল পাহাড়ি জনপদের নামের সঙ্গে শুধু চাকমা নয়, আদিবাসী জাতিসত্তার নানান জানা-অজানা জীবনকথার যোগসূত্র রয়েছে। এভাবে বিভিন্ন জনপদের কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের যে বেদনা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বুকের ভেতর তুষের আগুনের মতো জ্বলছে, তা নিভানো না গেলে অবশ্যই আদিবাসী জনপদের উন্নয়নের জয়যাত্রা বিঘিœত হবে।

তিন.
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারীদের মধ্যে পর্দা প্রথার কোনো প্রচলন নেই। লেখাপড়া থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত আদিবাসী নারী-পুরুষ ঐক্যবদ্ধভাবে সম্পাদনে অভ্যস্থ। তাই পাহাড়ী জনপদে মহিলা শিক্ষালয় স্থাপন জুম্মজনগোষ্ঠী মানতে পারছে না। এটাকে তারা তাদের ‘জেন্ডার’ কনসেপ্ট ধ্বংসের পায়তারা বলে ধরে নিচ্ছে। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে চৈত্রের শেষ সপ্তাহে এক তপ্ত দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী উত্তেজিত, ক্ষুব্ধ, অভিমানী যুবক সুখেশ্বর চাকমা পল্টু আমাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে শুনিয়ে দিলেন, চাকমা বা অন্য আদিবাসী ভাষায় ‘ধষর্ণ’ শব্দটাই আপনি পাবেন না। কারণ এ ধরনের কোনো ঘটনাই আদিবাসীদের মধ্যে কখনো ঘটে না। শুধু তা নয়, বিগত দিনে শত শত আদিবাসী নারী বাঙালিদের হাতে ধর্ষিত হলেও কখনোই একজন আদিবাসী পুরুষ একই ধরনের অপকর্ম করেনি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আদিবাসীদের জাতিসত্তাগত নৈতিকতার এই দৃঢ়তা আমাদের মধ্যে সামান্যটুকুও প্রভাব ফেলেনি। তাই সেদিন সুরেশ্বর চাকমার সেই প্রত্যয়দীপ্ত উচ্চারণের সামনে নিজেকে নিতান্তই কাপুরুষ, পিশাচ, দানব বোধ হয়েছে। কারণ আমরা যদি তাদের কাছ থেকে অন্তত এই একটা নৈতিক দৃঢ়তা অর্জন করতে পারতাম, তবে আমাদের শাজনীন আর খুন হতো না। আমাদের সীমা নিহত হতো না। মার বুক খালি করে নূরজাহান হারিযে যেত না। দেশ জঙ্গি হামলার শিকার হতো না। নারীর প্রতি এই সম্মানটুকু আমরা এখনো প্রদর্শন করতে পারিনি।

চার.
সমতল ভূমির উন্নয়ন পদ্ধতির সঙ্গে আদিবাসী জনপদকে মিলালে সমস্যা হতে পারে। জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি ঝিমিত ঝিমিত চাকমার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান দেয়, উন্নয়ন কর্মসূচির কারণে আদিবাসী জনপদের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। যার প্রেক্ষিতে আগে অরণ্যের ঝর্ণার শীতল পানি পান করে তৃষ্ণার্ত জুম্মজনগোষ্ঠী পিপাসা মিটাত। এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক উপায়ে বনায়নের নামে প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট বন, জঙ্গল নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে। এর ফলে একে একে চাপা পড়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক ঝর্ণার যতসব উৎসমুখ। ঝিমিত ঝিমিত চাকমার এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তবে তা হবে আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে ভয়াবহ এক অশনিসংকেত। এখানে তখন আধুনিকতা হবে মারাত্মক এক অভিমাপ। এ থেকে সমতল ভূমি অধিবাসীরাও রেহায় পাবে না। এসব কারণে উন্নয়নের কথা শুনে আদিবাসী জনগোষ্ঠী যদি ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায়, তবে কী করে তাদের আমরা অভিসম্পাত দেব? আবার এতদিনে যদি এদের মধ্যে কোনো ভুল ধারণা জন্ম নিয়ে থাকে, তার জন্যও এই আমরাই দায়ী। এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত, এই ভুল ভাঙানো।
আবহমান কাল ধরে পাহাড় অরণ্যকে কেন্দ্র করে যে আদিবাসী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সে সংস্কৃতিতে ‘শোষণ’ ছিল না। তারা ‘শোষণ’ শব্দের অর্থই জানত না। আদিবাসী ভাষায় ‘শোষণ’ বলে কোনো শব্দ নেই। ওখানে দারিদ্র্য ছিল না। ছিল না বঞ্চনা। তখন এই পাহাড়ি জনপদ ছিল শুধু আদিবাসী মানুষের। কিন্তু আজ সেখানে ভিন্ন জনপদের মানুষ এসেছে। তাদের সংস্কৃতি এসেছে। এসেছে নানান অবক্ষয়। এসব অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে আদিবাসী মানুষ, আদিবাসী সংস্কৃতি। এখন শোষণ, বঞ্চনা, দারিদ্র্য তাদের আষ্টেপৃষ্টে বন্দি করে রাখতে চাইছে।

পাঁচ.
আদিবাসী জাতিসত্তার লোকসকলের মধ্যে সব সময় একটা আকুতি ফুটে উঠে, ‘আমরা শিক্ষা চাই’। যদিও-বা জাতিগত দিক থেকে বিবেচনা করলে চাকমাদের মধ্যে সাক্ষরতার হার বেশি। কিন্তু তাদের অভিন্ন আকুতি আমদের খুবই বিচলিত করে। এদিন আরও একটি বক্তব্য জোড়ালোভাবে উচ্চারিত হয়, ‘আমরা আমাদের ভাষা, বর্ণমালা, সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং বিকাশ চাই।’
যদিও তারা জানে, বাংলাকে অস্বীকার করে সাক্ষরতা অর্জন অসম্ভব। সেদিন এদের কথা শুনে বোধ হয়েছে, সাত লক্ষাধিক জুম্মজনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পাহাড়ি জনপদে বাংলা লিঙ্গুয়াফ্রাংকা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। ভাষার অধিকারের দাবিতে একদিন এ জনপদের মানুষ বুকের রূধিরে রাজপথে রঞ্জিত করেছিল। বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কাহিনী সাত লক্ষাধিক জুম্মজনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অজানা থাকার কথা নয়। ওই কারণেই তারা তাদের ভাষা এবং বর্ণমালা চর্চার সুযোগ দাবি করছে। তারা তাদের ভাষায় জাতীয় সংসদে বক্তৃতা দিতে চাইনি। এরা নিজেদের ভাষায় মাকে মা ডাকে না, মা তার সন্তানকে ঘুম পাড়ায় না, যে ভাষায় ওরা স্বপ্ন দেখে না, সে ভাষাকে কতটুকুই আর আপন করে নেওয়া যায়? এই কর্মশালায় ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উচ্চারিত হয়েছে আরও অনেক রূঢ় সত্য।

ছয়.
সামাজিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিাকোণ থেকে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার বেদনাহত কাহিনী শুনলে এক সময় আমাদের চোখও অশ্রুসজল হয়ে পড়বে। নিজেদের অর্থনৈতিক দূরাবস্থার কথা বলতে গিয়ে চাক জাতিসত্তার চিংলা মং চাক যখন আমাকে বলেন, ‘আমি একজন শিক্ষক। আমি এই আদিবাসী সংস্কৃতি মেলায় দল নিয়ে এসেছি বিঝু উপলক্ষে প্রাপ্ত বোনাসের টাকা খরচ করে। জানি না, বাড়ি গিয়ে কীভাবে বিঝু পালন করব। স্ত্রী-সন্তানকে কী জবাব দিব।’ ১৯৯৯সালের আদিবাসী মেলায় চিংলা মং চাকের সেই করুণআর্তি আজও আমার কানে বাজে। সে পরিস্থিতি আজও যে বেশি পরিবর্তন হয়েছে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। তখন মনে হয়, ধ্বংসোন্মুখ আদিবাসী সংস্কৃতিকে বিকাশমান করতে আদিবাসী জাতিসত্তার লোকসকল পথের অšে¦ষণ করে চলেছেন। এক্ষণে এদের আনন্দবেদনার বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে তাদের চাহিদাভিত্তিক উন্নয়নের পথ সন্ধানে আমরা যদি আন্তরিক ভূমিকা রাখতে পারি, তবেই সেখানে শুরু হতে পারে শান্তি ও সম্প্রীতির নতুন এক অভিযাত্রা।
উল্লেখ্য যে, আদিবাসী সাংস্কৃতিক কর্মীদের সমস্যা সমাধানের অভিযাত্রায় পা মিলাতে হবে আদিবাসী, বাঙালি নির্বিশেষে সর্বস্তরের শান্তিকামী মানুষকে। কারণ কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়, ‘অবহেলা ও উপেক্ষার ফলে পাহাড়ি আদিবাসীদের সমৃদ্ধ শিল্প, সংস্কৃতি, উন্নত সাহিত্য ও উপকথা, কলা, নৃত, গীত হারিয়ে যেতে বসেছেÑ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আর কাদের আমরা উপেক্ষা করছি, যারা সত্যি উন্নত চরিত্রের অধিকারী, উন্নত যাদের মূল্যবোধ, যারা নারীকে সম্মান করতে জানে, যারা মানুষকে বিশ্বাস করতে জানে, যারা প্রতারণা, শঠতা জানে না?
‘আমি পাহাড়ি আদিবাসী সংস্কৃতির বিকাশ ও উন্নয়ন চাই। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়েই তারা তাদের উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখুক। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে এই সংস্কৃতির তো কোনো বিরোধ নেই, বরং আদিবাসী সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত হলে বাঙালি সংস্কৃতিই গৌরবান্বিত হবে বরে মনে করি।’ দ্বিতীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী সংস্কৃতি মেলা ১৯৯৯ উপলক্ষে শুভেচ্ছা বাণী)। আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থার। নৃত্য, গীত সব কিছুতেই তারা পুরুষানুক্রমিকভাবে উৎপাদনের কথা, উন্নয়নের কথা বলে আসছে। শিল্পকে এরা শুধু শিল্পের জন্য কখনও ব্যবহার করেনি। জুম নৃত্য দেখতে দেখতে উপলব্ধি করেছি, জীবনের কত ভেতর থেকে উঠে এসেছে এসব নৃত্যের যতসব মুদ্রা। পাহাড় জঙ্গলে ফসল বুনার জন্য আগাছা পরিষ্কার করা, ঝোপ ঝাড়ে আগুন লাগানো, বীজ বপন করা, পাখি পোকামাকড়, পশু বলি, ফসল কাটা আবার এসবের ফাঁকে ফাঁকে যুবক-যুবতীর অভিসার, মৌসুমী উৎসব সবই ছিল আদিবাসী নৃত্যগীতের মধ্যে। আদিবাসী সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে আদিবাসী সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে যে ছয়টি সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো হলোÑ
১. বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব।
২. শিক্ষিত আদিবাসীদের নিজস্ব শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে হীনমন্যতা।
৩. শিক্ষার ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করা।
৪. অর্থনৈতিক অসংগতি।
৫. প্রচার মাধ্যমের অসহযোগিতা।
৬. সাংস্কৃতিক সংগঠনের অপ্রতুলতা।

চিহ্নিত সমস্যার কারণসমূহ হলো :
১. বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব।
২. শিক্ষিত আদিবাসীদের নিজস্ব শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে হীনমন্যতা।
৩. শিক্ষার ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করা।
৪. অর্থনৈতিক অসঙ্গতি।
৫. প্রচার মাধ্যমের অসহযোগিতা।
৬. সাংস্কৃতিক সংগঠনের অপ্রতুলতা।

এসব সমস্যা সামাধানের লক্ষ্যে সুপারিশসমূহ হলো নিম্নরূপ :
ক. সরকারের করণীয় :
১. উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটকে (ইসাই) স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান করা এবং পর্যাপ্ত মজুরি প্রদান। প্রতিটি থানায় আদিবাসী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের শাখা প্রতিষ্ঠা করা।
২. আদিবাসীদের পৃথক শিক্ষাবোর্ড গঠন এবং আদিবাসী ভাষা, বর্ণমালা, ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।
৩. আদিবাসী আইন ও প্রথাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা।
৪. আই. এল. ও. কনভেনশন ১০৭-এর যথাযথ প্রয়োগ।
৫. আদিবাসীদের জন্য পৃথক বেতার, টেলিভিশন কেন্দ্র স্থাপন।

খ. আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের করণীয় :
১. শিল্পকলা একাডেমী, শিশু একাডেমী, বাংলা একাডেমী ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে আদিবাসীদের জন্য পৃথক শাখা স্থাপন।
২. বিলুপ্তপ্রায় অসংখ্য লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণসহ সহায়ক ভূমিকা নেওয়া।

গ. বেসরকারি সংস্থার করণীয় :
১. আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ধারণ করে তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা।
২. আদিবাসীদের সমস্যাগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা।
৩. সরকারি নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের সম্পৃক্ত করার প্রয়াস চালানো।

ঘ. আদিবাসীদের করণীয় :
১ গণসচেতনতার জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা ও সংস্কৃতি উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
২. যেসব সম্যার ক্ষেত্রে একক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়, সমমনা সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা।
৩. স্ব-স্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য বিষয়ক গবেষণা কর্ম প্রকাশ ও প্রচার।
৪. ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে আধুনিকীকরণ বা যুগোপযোগী করে প্রচার। একই সঙ্গে এর ঐতিহ্যের প্রতি গুরুত্বারোপ।
৫. আদিবাসী অঞ্চলের বিভিন্নস্থানের আদিবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। যাতে অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ আন্দোলনে একে অপরকে সাহায্য করতে পারে।
৬. স্থানীয় সচেতন মহলকে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। মেধাবী অথচ নিষ্ক্রিয় কর্মীদের খুঁজে বের করে সক্রিয় করা।
৭. গ্রামে অসংগঠিতভাবে যারা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তাদের সংগঠিত করা।
৮. মন্দির/ক্যাংভিত্তিক যে শিক্ষাব্যবস্থা মারমা সমাজে চালু আছে, তেমনিভাবে মাতৃভাষার কার্যক্রম পরিচালনা করা।
৯. মৌখিক লোকসাহিত্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া এবং তা প্রকাশ করা অসম্ভব হলে ‘উসাই’-এর মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
১০. মূলধারা থেকে পিছিয়ে থাকা জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সংরক্ষণে অগ্রসর সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগ নেওয়া।
পাহাড়ি জনপদের এগারোটি জাতিসত্তার মধ্যে চাকমারা বেশি শিক্ষিত। কিন্তু শিক্ষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ঐতিহ্যবিমুখ হয়ে পড়ছে। শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ভয়ার্ত কণ্ঠে জানতে চাইলাম, আকাশ সংস্কৃতি এদেরও কী ঘায়েল করে ফেলেছে? চাকমা জাতিসত্তার অনুষ্ঠানে তাই আর গেংখলীদের খুঁজে পাওয়া যায় না। রাধামন ধনপুদী পালা, নরধন রনপুদী পালা গান কেউ করে না। উবাগীত পরিবেশিত হয় না। সমতলের আদিবাসীদের জন্য আরেকটি বিপদ ধর্মান্তর।
চাক সাংস্কৃতিক দলের প্রধান চিংলা মুং চাক জানালেন, চাকদের কোনো গান ছিল না। মং মং চাক (যিনি এম এম চাক নামে পরিচিত) ১৯৭৮ সালে চাক জাতিসত্তার জন্য প্রথম গান লিখেন। তিনি এই জাতিসত্তার প্রথম শিক্ষিত এবং চাকরিজীবী। ত্রিপুরা জাতিসত্তার পক্ষে ইতোপূর্বে একাজটি করেছেন সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। তাঁর মৃত্যুর পর আর কেউ এগিয়ে আসেননি ত্রিপুরা সংস্কৃতিচর্চার ধারাটিকে বিকশিত করতে।

সাত.
বিগতদিনে নিজেদের ভাষার অধিকার, স্বাধীকার, ছোটের অধিকার ইত্যাদি নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে, আমাদের একই ভূখন্ডের অপরাপর জাতিসত্তার কৃষ্টি, ঐতিহ্য, দুঃখ, বেদনার কথা মনেই করিনি। আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম সেইসব সুঠাম কান্তি নারী-পুরুষের কথা। যার প্রেক্ষিতে আমরা এদের আমাদের সংগ্রামের, আমাদের দুঃখ-বেদনার সঙ্গী করতে পারিনি। আমরাও হতে পারিনি ওদের উচ্চারিত, অনুচ্চারিত দুঃখ-বেদনায় সমব্যথী।
আদিবাসী জনপদে উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বেদনাহত জীবনের দিকে প্রথমেই তাকাতে হবে। তাদের সকল দুঃখের প্রদীপ অন্তর দিয়ে অনুভব করতে হবে। হতে হবে তাদের আনন্দ বেদনার বিশ্বস্ত সঙ্গী। তবেই সবুজ অরণ্যে বারুদের গন্ধ দূর হয়ে নির্মল বাতাস প্রবাহিত হবে। হারিয়ে যাওয়া জীবন, স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা সবই ফিরে আসবে। তবেই সত্য যুগের চম্বক নগরের মতো আজকের কলিযুগে আদিবাসী জনপদের ঘরে ঘরে সুখ, আনন্দের বন্যা নেমে আসবে (গেংখুলীদের একটি পালা গানের ক’টি লাইনÑ ‘চম্পক নগরের গ্রামে পালা গায়, তখন সত্য যুগ। ঘরে ঘরে সুখ ছিল।’ চম্পক নগর হয়তোবা চাকমাদের কোনো গ্রাম দেশকেই কল্পনা করে বলা হয়েছে গানে, যেখানে সত্য ছিল। জীবনে সুখ ছিল। Ñসজ্ঞীব দ্রং)। তবেই একদিন আদিবাসী জনপদে স্বপ্নের ভোর হবে। তবেই আদিবাসী কলামিস্ট সজ্ঞীব দ্রং-এর প্রত্যাশানুযায়ী গানে গানে বেহালার সুরে সুরে গেংখুলীরা আদিবাসী জীবনের অতীত ও সুন্দর ভবিষ্যতের কথা বলবে। গারো পাহাড়ের সেরেংজিংয়ের সঙ্গে গেংখুলীর ভালোবাসা সূচিত হবে। কোচপানা ও নামনিকা এক হবে। সজ্ঞীব দ্রং-এর মতো আমিও আজ এরকমই স্বপ্ন দেখি। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের কাছে আমারও অন্তরতম আকুতি, আমাকে এরকম একটি স্বপ্ন দেখতে সহায়তা করুন। ঝিমিত ঝিমিত চাকমা, মানস মুকুর চাকমা, মৃত্তিকা চাকমা, সজ্ঞীব দ্রং, শিশির চাকমা, রবীন্দ্রনাথ সরেণ, চিং মার্মা, শান্তিময় চাকমার সঙ্গে পূণিমার রাতে মাচাং ঘরে আমি, আমরা আবার, একবার নয়, বারবার, রাতের পর রাত, দিনের পর দিন কথা বলতে চাই। ছাদ ফাটিযে, রাতের নির্জনতা ছিন্নভিন্ন করে হাসতে চাই। কারণ আমি এখানে বারবার এসে অনুভব করেছি, এতদিনে তাদের জীবন থেকে জীবন হারিয়ে গিয়েছে। স্বপ্নহীন হয়ে পড়েছে এই সুঠাম কান্তি মানুষগুলো। তাই আজকের মুক্ত পরিবেশে আমিও প্রত্যাশা করি, পার্বত্য জনপদের সরল, উদারনৈতিক এই মানুষগুলো এবার নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখুক। কিন্তু এজন্য সবার আগে চাই, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আনন্দ, বেদনার বিশ্বস্ত সঙ্গী। ‘নতুন সূর্যোদয়ের মতো সহস্র কিরণের পেখম ছড়িয়ে? শান্তি এসেছে পাহাড়ে পাহাড়ে, সবুজ উপত্যাকায়। শান্তির/সপক্ষের হাতগুলো মানবতার উদার জমিতে ফোটাবে/ রঙ বেরঙের ফুল। ইতিহাস প্রোজ্জ্বল/ ফোয়ারা হয়ে হাসবে প্রহরে প্রহরে/ দশ দিগন্ত উদ্ভাসিত করে।’ (শামসুর রাহমান)।
...........................................................................................................................
কুমার প্রীতীশ বল, উপকরণ উন্নয়নবিদ, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, ব্র্যাক
২ Likes ০ Comments ০ Share ১৮৪ Views