Site maintenance is running; thus you cannot login or sign up! We'll be back soon.

আহসান কবির

১ বছর আগে

দরকার নেই কম্বলের!

শীত, গরম আর বৃষ্টি নাকি মানব সভ্যতার সমান পুরনো! এই তিন ঋতু আদিকাল থেকে ছিল, আছে ও থাকবে। তাই পুরনো দিনের একটা কৌতুক দিয়ে শীতের শুরুটা করা যায়।

রাজা উজিরের কাছে জানতে চাইলেন— প্রতি রাতে শেয়াল ডাকে কেন? এত বিশ্রিভাবে ডাকলে কি ঘুম আসে? উজিরের উত্তর, ‘রাজা মশাই ওদের শীতের কম্বল নেই।’ তাই প্রত্যেক শেয়ালকে একটি করে কম্বল দেওয়ার নির্দেশ শোনালেন রাজা। বিতরণ শেষে উজির এসে রাজাকে জানালো, শেয়ালদের কম্বল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেয়ালদের হুক্কাহুয়া তবু থামলো না। তিন-চার দিন পর রাজা খানিক রেগে উজিরের কাছে জানতে চাইলেন, কম্বল তো দেওয়া হলো। এখনও ডাক থামে না কেন? উজিরের উত্তর, ‘কম্বল পেয়ে শেয়ালরা রাজার গুনগান গাচ্ছে। যতদিন কম্বল থাকবে ততদিন তারা রাজার গুনগান গেয়েই যাবে!’ তাই শীত এলে শেয়ালদের ডাক কখনও থামে না। কিন্ত গরম বা বর্ষাকালে শেয়ালরা ডাকে কেন?

যতই ডাকুক, ধরে নেওয়া যাক শেয়ালদের আগে একটি করে কম্বল ছিল। ২০১৮ সালের শুরুটা হয়েছে শীত দিয়ে। হাড়কাঁপানো শীতে বাঘ কিংবা শেয়াল সবারই জবুথবু অবস্থা। উজির নেই, তাই জানা যায়নি শেয়ালদের আরও একটা করে বেশি কম্বল লাগবে কিনা অথবা বাঘ-বানরদের কপালে কী আছে। বাঘ-বানরদের অবস্থা যেমনই হোক মানুষের অবস্থা কেমন? বৈশ্বিক জলবায়ুতে যতই পরিবর্তন আসুক, মানুষের ভোগান্তি যতই বাড়ুক, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তাতে কিছু যায় আসে না। জলবায়ু পরিবর্তন হেতু মানুষের নেওয়া কার্যক্রমকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ভাওতাবাজি!’
শীতকে অবশ্য এই দেশের কবি-সাহিত্যিকরা নিয়েছিলেন খুব সম্মানের সঙ্গে। জীবনানন্দ দাশ সম্ভবত শীতকে ভয় পেতেন। তিনি বলতেন, শীতের রাতে তার হৃদয়ে মৃত্যু আসে! যদিও শিশির ঝরে, মধ্যরাতে শোনা যায় বিষণ্ন পেঁচার ডাক। তবু জীবনানন্দ লিখেছিলেন, শীতের রাতে নাকি সার্কাসের সিংহ যে হুংকার দেয় তা নাকি ব্যথিত হুংকার। শীতের রাত এলে সম্ভব সেই সিংহ বুঝতে পারতো সে আর অরণ্যকে খুঁজে পাবে না!

এই দেশের মানুষ এখন আর যেমন শরত, হেমন্ত ও বসন্ত; এই তিন ঋতুকে সহসা খুঁজে পায় না! এখন ঋতু নাকি তিনটি! গ্রীষ্ম,বর্ষা আর (খানিক) শীত। এই দেশে এখন আর সময়মতো শীত আসে না যখন আসে তখন নাকি রক্ত, চামড়া আর হাড় সব ঠাণ্ডা করে দিয়ে যায়। সম্ভবত ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রকৃতি ও আবহাওয়া মানুষের সঙ্গে ভাওতাবাজি শুরু করে দিয়েছে! তবে শীত নিয়ে চার্লস বোদলেয়ার, জীবনানন্দ আর বুদ্ধদেব বসুর ভাবনার কিছু মিল আছে। বোদলেয়ার শীতকে আগাগোড়া বিষণ্ন ঘাতক জ্ঞান করেছেন। আর বুদ্ধদেবের নাকি শীত এলেই মরে যেতে ইচ্ছে করতো! গাছ আর গাছের পাতা যেমন মরে যায় শীতে, সাপ যেমন খোলস বদলায় বা মরার মতো পড়ে থাকে, বুদ্ধদেব বোধ হয় শীত নিয়ে তেমন মৃত্যুর রোমান্টিসিজমে ভুগতেন।

কবি-সাহিত্যিকরা শীতকে মূলত দুই ভাগে বিচার করেছেন। কেউ বিচার করেছেন প্রকৃতি, নিসর্গ বা সৌন্দর্যের চোখ দিয়ে। আর কেউ কেউ দেখেছেন গরিব-দুঃখী মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। শীত গরিব মানুষকে কতটা কষ্ট দিতে পারে সেই আদলে। জীবনানন্দের কবিতায় যেমন শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যার বর্ণনা আছে, তেমনই আছে ‘ধান কাটা হয়ে গেছে’র বিবরণ। ধান কাটার বর্ণনা রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আছে তবে সেটা বর্ষাকালের। যেমন— ‘রাশি রাশি ভাড়া ভাড়া/ধান কাটা হলে সারা/ভরা নদী ক্ষুরধারা…’।

অবশ্য ডজনেরও বেশি কবিতা আছে রবীন্দ্রনাথের শীত নিয়ে। আছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসিম উদদীন, হাসান আজিজুল হক কিংবা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহসহ আরও অনেক কবি-সাহিত্যিকের লেখায়ও রয়েছে শীতের বিশদ বর্ণনা। ধান কাটা ও ধান শুকানোর দৃশ্য, সেই আগুনে পোহানোর জন্য উঠানে সমবেত হওয়া, ধান সেদ্ধ করার সময়কার কিংবা গরম ভাপাপিঠার ভাপ ছিল এ দেশের মানুষের শীত বিনোদনের অন্যতম উপকরণ।

কয়েক বছর ধরে পিঠাপুলির মধুর রসে মুখ রাঙানো, শীতের সকালে কাঁথা মুড়ি দিয়ে খেজুরের রস আর চিড়া, মুড়ি ও খই খাওয়ার নান্দনিক দৃশ্য কমে আসছে। কমে যাচ্ছে খেঁজুর গাছের সংখ্যা। যারা খেঁজুরের রস দিয়ে গুড় বানাতো তাদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে চিতই আর ভাপা পিঠা যেন চলে এসেছে শহরে। শীত এলে পথে পথে এসব পিঠা বানানোর দৃশ্য চোখে পড়ে প্রায়ই। হারিয়ে যাচ্ছে হরেক রকম পিঠা খাওয়ার অভ্যাস। শীত যেন বন্দি হয়ে যাচ্ছে ভাপা আর শুকনো চিতইতে! শীত চলে এসেছে যেন সামর্থ্যবানদের কাপড়-চোপড়ের ফ্যাশনে কিংবা খাবারের মেন্যুতে। শীতের খিচুড়ি বা পিঠা-পায়েস না খেলে তাদের ‘উইন্টার সেলিব্রেশন’ জমেই না!

অন্যদিকে ২০১৮ সালে এসে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ শৈত্যপ্রবাহ শুরু হলে (বাংলাদেশের কোনও কোনও এলাকার তাপমাত্রা ২-৩ ডিগ্রিতে নেমে আসবে এটা কেউ আগে কল্পনাও করতো না!) মানুষের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে। সুকান্ত ভট্টাচার্য্য অবশ্য অনেক আগেই লিখে গেছেন— ‘হে সূর্য,শীতের সূর্য তুমি আমাদের স্যাঁতস্যাঁতে ভিজে ঘরে/উত্তাপ আর আলো দিও/আর আলো দিও গলির ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।’ শীতের জন্য মানুষের এই কষ্ট নিয়ে অনেকের মতো লিখেছিলেন নবারুন ভট্টাচার্য্য— ‘দরকার নেই সহৃদয় কম্বল! বা সাহেবদের বাতিল জামার! সবার কি শীত করছে এমন, নাকি শুধুই আমার?’

চলমান বাস্তবতা, এনজিওর পরোক্ষ শোষণ, ক্ষমতাসীনদের অবহেলা, বিদেশি সাহায্য নিয়ে অনেক কটাক্ষ ছিল নবারুন সাহেবের এই কবিতায়। তার সেই অমর কবিতা কার না মনে আছে— ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না!’ তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, যতই শীত নামুক তবুও বাংলা আমার দেশ।

এ বছরের জানুয়ারিতে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সিলেটের শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৪৮ সালের কোনও একদিন নাকি এর চেয়েও কম ছিল তাপমাত্রা। তার মানে দাঁড়াচ্ছে আততায়ীর মতো এমন শীত এ দেশে আগেও এসেছিল নিঃশব্দে! অভ্যাস নেই বলে এমন শীতে স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি কমে গেছে। বোরো ধান আর আলু-পিঁয়াজের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের জবুথবু অবস্থা হয়েছে যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। যারা দিন আনে দিন খায়, কাজ নেই বলে তারা অনাহারে থাকতে বাধ্য হয়েছে। সারাদেশে প্রচণ্ড শীত ও কুয়াশায় ফেরি চলাচলে দুরবস্থা তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালের প্রথম সপ্তাহে ৭০০’র মতো মানুষ শীতজনিত রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মারা গেছেন ৩৭ জন (সরকারি ভাষ্যমতে)।

আমেরিকা, কানাডা, সুইডেনসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে রেকর্ড পরিমাণ শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারপাত হয়েছে। বরফে ঢেকে গেছে রাস্তাঘাট। এসব দেশে গরম কাপড় ও অ্যালকোহলের দোকানে মানুষের ভিড় বেড়েছে। বাংলাদেশে শীত বাড়াতে অনেকে ব্যঙ্গ করে বলছেন, ‘বাংলাদেশও উন্নতির দিকে যাচ্ছে!’ তবে এ দেশে অ্যালকোহলের দোকানে মানুষের ভিড় বাড়ছে কিনা কেউ জরিপ করে দেখেনি। তবে উল্টোভাবে যা জানা গেছে তা হলো বাংলাদেশে মদ ও বিয়ারের দাম বেড়েছে। জানি না এর সঙ্গে শীতের আদৌ কোনও সম্পর্ক আছে কিনা।

সত্যিই এই পৃথিবীর আবহাওয়া কেমন যেন হয়ে গেছে। যখন আমেরিকা, কানাডা কিংবা ভারতে বরফ পড়ছে তখন অস্ট্রেলিয়ায় চলছে চরম দাবদাহ। বনভূমিতে আগুন লাগছে। টেনিসসহ খেলোয়াড়রা মাঝপথে খেলা থামিয়ে দিচ্ছেন। রাস্তাঘাটে মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছেন। গরমের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীরা ঠিকভাবে যেতে পারছে না। বয়স্করা কষ্ট পাচ্ছেন। একই পৃথিবীর দুই প্রান্তে প্রকৃতির কী বিপরীত আচরণ! মানুষকে যাতনার চরমসীমায় পৌঁছে দিচ্ছে শীত কিংবা দাবদাহ।

শোনা যাচ্ছে, এ বছরের জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারিতেও এমন হাঁড়কাপানো শীত নামতে পারে। মানুষের ভোগান্তি যতই বাড়ুক; বরফ দিয়ে মূর্তি, ভাস্কর্য কিংবা স্থাপনা বানানো আদৌ কমবে না। কমবে না সাইবেরিয়ার ইয়াকুতিয়া শহরের গল্প। রূপকথা অনুযায়ী একদিন সম্পদের দেবতা উড়ে যাচ্ছিলেন। শীতের মাত্রা এতই বেশি ছিল যে, দেবতা জমে গিয়ে আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে যান। ধনসম্পদও মাটিতে পড়ে যায়। সেই থেকে ইয়াকুতিয়া শহর শীতে বরফে ঢাকা পড়লেও বরফ সরালেই নাকি সম্পদ পাওয়া যায়। সাইবেরিয়ার শীতলতম স্থানের একটি এই ইয়াকুতিয়া এখন শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ।

আবার এই ইয়াকুতিয়ার মতো আরেকটি শহর হলো ওমিয়াকন। এটি ভীতিকর একটি শহর হিসেবেই পরিচিত ছিল একসময়। জোসেফ স্টালিনের আমলে যারা ভিন্নমত পোষণ করতেন, তাদের নাকি ওমিয়াকনে নির্বাসনে পাঠানো হতো! আমেরিকার লোকজন তখন বলতো— স্টালিনের শাসনে থাকার চেয়ে ওমিয়াকনে গিয়ে জমে মরাই ভালো! তবে আলাস্কার প্রসপেক্ট ক্রিগ, কানাডার স্নাগ, অ্যান্টার্কটিকার ভোস্তক, আমেরিকার স্টানলি কিংবা ইদাহো এখনও পৃথিবীর শীতলতম স্থানের মধ্যে অন্যতম। চীনে এখনও বরফের স্থাপত্য কিংবা ভাস্কর্য নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়, ইতালির ভেনিসে শীত উদযাপন করা হয় ধুমধাম আয়োজনে।

জানি না শীত পোহানো আর শীত উপভোগের মধ্যে পার্থক্য আছে কিনা। তবে নবারুন ভট্টাচার্য্যের মতো বলতে চাই, শীত নিয়ে ব্যবসা না হোক। কোটি মানুষকে গরিব বানিয়ে এনজিওর কম্বল বা বড়লোকদের পুরনো জামাকাপড় দিয়ে সেবা ও উপকারের নামে তাদের নিত্য অপমান করতে চাই না। এই বাংলার মানুষ শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষাসহ সবসময়ে স্বাবলম্বী হয়ে বাঁচুক।
০ Likes ০ Comments ০ Share ১১২ Views