রাজু আহমেদ

৪ বছর আগে

তরুন প্রজন্ম বাঁচাতে মাদকের লাগাম টানুন

জীবনের শত ব্যস্ততার মধ্যে মাত্র দু’দিনের অবসর পেলেও জন্ম ভূমিতে ছুটে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করি । কখনও সফল হই আবার কখনও যাওয়া হয়ে ওঠে না । বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল বলতে যা বোঝায় তেমনি একটি গ্রামে আমার জন্ম । তবুও সেই গ্রামটিই আমার সব, অতীত-ভবিষ্যত । সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, ছোট বেলায় দূরন্ত ছুটে চলার কথা স্মৃতির পাতায় কেবল ভেসে ওঠে এবং শিহরণ দেয় । সেই প্রিয় গ্রামটিতে ফিরে ঠিকই যাই কিন্তু আগের মত আনন্দ পাই না । আমার সুখ-শান্তি তো শুধু আমার একার উপর নির্ভর করে না । এজন্য গ্রামবাসীর মধ্যেও আনন্দ উল্লাস থাকা চাই । ছোট্ট বেলা থেকেই আমার সাথে আমার সমবয়সীদের চেয়ে বায়োজেষ্ঠ্যদের সম্পর্ক বেশি । সর্বক্ষণ হাসি-খুশী আনন্দে কাটানো সেই মানুষগুলোর হঠাৎ হল কি ? কেউ আর আগের মত প্রাণচ্ছোল নেই । মূখে হাসি কিংবা আনন্দের ছিটে ফোঁটাও তাদের মধ্যে লক্ষ্য করি না । সেই ন্যাংটাকাল  থেকে চেনা এ মানুষগুলোর আচরণ তো এমন ছিল না । তাদের মধ্যে আনন্দ না দেখে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম । গত ঈদুল আযহায় লম্বা সময় নিয়ে গ্রামে গিয়েছিলাম । অন্যান্য অনেক উদ্দেশ্যের সাথে প্রাণের মানুষগুলোর আনন্দ হারিয়ে যাওয়ার হেতু খুঁজে বের করে তার সমাধান করতে চেয়েছিল । কারণ খুঁজে পেতে দেরী হয়নি । এক কালের আমার কয়েকজন প্রিয় খেলার সাথীর অভিভাবকের সাথে আলাপ করেই জানা গেল তার প্রিয় সন্তানেরা তাদের ভাষায় বিপথগামী হয়ে গেছে । কি সকল ছাই-পাশ খেয়ে সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করে । তার মধ্যে সবার আগে উঠে এল গাঁজার নাম । আমার চেনা মাত্র পাঁচ বছর পূর্বের গ্রামের মানুষ গাঁজা তো দূরের কথা সিগারেটের নামই জানত না । তাদের খারাপ অভ্যাস সীমাবদ্ধ ছিল শুধু আলম আর গোপাল বিড়িতে । আবার কাউকে পাতার একজাতীয় বিড়িও ফুঁকতে দেখতাম । সেই গ্রামটির এতই উন্নতি হল ! গ্রামের উন্নতির দোষ দিয়ে লাভ কি যেখানে দেশ চরম উন্নতিতে ভাসছে !! যাদের বিরুদ্ধে গাঁজা ফোঁকার অভিযোগ পেলাম তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা হল । সমবয়সী যে মানুষগুলোর কাছে কোন দিন বাড়তি কিছু আশা করি নি কিন্তু তারাই এতদিন যথার্থ সম্মান দিয়ে কথা বলত অথচ তাদের মধ্যে অনেকটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম । তবুও ভাগ্য, তারা সীমালঙ্গন করেনি । আশান্বিত হয়েছি কারন ঠিকমত হাল ধরতে পারলে পরিবর্তন আনা অসম্ভব নয় । আরও একটি ইতিবাচক দিক দেখলাম, শহর কিংবা অন্যান্য এলাকার মত নেশা জাতীয় কোন পানীয় এখনো আমার গ্রামে পৌঁছে নি অর্থ্যাৎ আধুনিক কোন নেশার নাম এখনো এরা জানে না । এলাকার কিছু সুধী জনের সাথে এর প্রতিকার নিয়ে কথা বলে বুঝতে পারলাম, তারা তাদের মান-সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায় । এভাবে চলতে থাকলে মান-সম্মান কতদিন রাখা যাবে তা তাদের মাথায় ঢোকাতে পারি নি । স্থানীয় প্রশাসনের চৌকিদারের সাথে আলাপ করে বুঝা গেল তিনি সব জানেন এবং উপর মহলেও জানান কিন্তু উপর থেকেই ব্যবস্থা গ্রহন করা হয় না । বন্ধুত্বের দাবী নিয়ে যে সমাধানের পথ আমি খুঁজছিলাম, তা আমার অযোগ্যতা, ব্যর্থতা এবং সীমাবদ্ধতার কারণে সফল হয়নি । যেভাবে আমার গ্রাম দেখেছি তার চেয়ে দেশের অন্য প্রতিটি গ্রাম, শহরের অবস্থা আরও খারাপ আরও ভয়াবহ । ভয়াল নেশায় যদি বৃদ্ধদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিত তবে মাথা ঘামানোর খুব বেশি প্রয়োজন পড়ত না কিন্তু নেশার ভয়াল থাবা যাদেরকে আক্রমন করেছে সেই তাদেরকে ভিত্তি করেই আমার দেশটা স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্নে বিভোর । এভাবে তরুন-তরুনী, যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রী যদি নেশার জগতে বুদ হয়ে থাকে তবে দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে কে ? কে দেবে জাতিকে আলোর দিশা ? দেশ বাঁচাতে তরুন প্রজন্মকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে । আবার তরুন প্রজন্মকে যোগ্য করতে তাদেরকে মাদকের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে । তরুন প্রজন্ম সঠিক পথে না থাকলে জাতির ভবিষ্যতও বিপথে চলবে । সুতরাং দেশের প্রতিটি স্থানকে মাদক মুক্ত, নেশা জাতীয় সকল দ্রব্য মুক্ত রাখা সময়ের দাবী ।

 

এত দিন নেশাজাতীয় দ্রব্য বলতে শুধু দেশী-বিদেশী মদ, গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, কোকেইন, আফিম, মারিজুয়ানা, গাম, ফেনসিডিল, পেথেডিন, সিডাক্সিন, ইউনিকটিন, মরফিনের নাম পরিচিত ছিল । তবে প্রত্যহ এর সাথে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম । সর্বশেষ সংযোজন হয়েছে সিসা নামের একজাতীয় নেশা দ্রব্য । অল্পদিন পূর্বেও যে সকল নেশাজাতীয় দ্রব্য অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তার মধ্যে সিসা অন্যতম । তবে বর্তমানে সিসার ব্যাপ্তি সবার কাছেই পৌঁছেছে । সকল নেশাজাতীয় দ্রব্যের মধ্যে সিসার ক্ষতি সাধনের ক্ষমতা বেশি । এক সেশন সিসা টানলে ৫৪ টি সিগারেটের সমান ক্ষতি হয় । এছাড়াও সিসার ধোঁয়ায় প্রচুর পরিমাণে কার্বন-মনোঅক্সাইড থাকে, যা মানবেদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর । অন্য মাদকে যে ক্যান্সার ছড়াতে পাঁচ বছর সময় লাগবে সেখানে নিয়মিত সিসায় আসক্ত হলে দুই বছরের মধ্যে শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়তে পারে । জাতিকে ধ্বংসের জন্য শুধু নব্য আগত সিসাই নয় বরং সকল মাদক দ্রব্য, নেশাজাতীয় দ্রব্য সমান দায়ী । বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, স্কুলগামী ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগেও পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবার মত সর্বনাশা নেশার ট্যাবলেট । এতদিন বাংলাদেশে যত ধরনের অপরাধ সংগঠিত হত তাতে পুরুষদের সম্পর্কিত থাকার কথা শোনা যেত কিন্তু সময় বদলেছে । পুরুষের সাথে নারীরাও সমান তালে নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে । বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় কিংবা প্রগতিশীল সমাজের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে নারী-পুরুষ সকলেই নেশার কাছে মাথা নত করেছে । নেশাখোরদের মধ্যে তরুন-তরুনীদের সংখ্যাই বেশি । প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেছে, দেশের ৫০ থেকে ৮০ লাখ তরুন-তরুনী প্রত্যক্ষ নেশার সাথে জড়িত । এই বিপুল সংখ্যক যদি তাদের সঙ্গী বানানোর চেষ্টা করে (তারা এটা করছেও) তবে দেশের নিকট ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে তা কি সমাজ কিংবা রাষ্ট্র যথাযথভাবে ভাবছে ?   

 

কোথা থেকে আসে এতসব নেশার জাতীয় দ্রব্য ? প্রায়ই খবরে শুনি, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বস্তা বস্তা গাঁজা আটক, কোটি কোটি পিস ইয়াবা উদ্ধার, লাখ লাখ বোতল ফেনসিডিল ভাঙ্গে । যে সেকল দ্রব্য দিয়ে দেশের তরুন প্রজন্ম ধ্বংস হচ্ছে তার অধিকাংশই এদেশে উৎপাদিত হয় না । এগুলো মায়ানমার কিংবা ভারত থেকে এদেশে আসে । বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী কিংবা অন্য সকল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য যদি তৎপর থাকে তবে এক পিস ইয়াবাও কি বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে প্রবেশ করতে পারে ? মাঝে মধ্যে অনেকটা অনাকাঙ্খিতভাবেই বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ হয়ে পড়ে দু’চারজন লাগব বোয়াল কিংবা উঁচু স্তরের মানুষের নাম যারা অবৈধ মাদক ব্যবসার এদেশীয় এজেন্ট । আবার কখনো বের হয়ে আসে কিভাবে প্রশাসনের সহায়তায় নেশা জাতীয় দ্রব্যের প্রসার ঘটানো হয় । সামান্য অর্থের লোভে যারা গোটা জাতিকে বিপথগামী করার চক্রান্ত করছে তাদেরকে কি শাস্তির মূখোমূখি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় ? অর্থনীতিতে একটা সূত্র আছে, দ্রব্যের চাহিদা বাড়লে যোগান বাড়ে । সেই সূত্র যদি মাদকের বাজারেও প্রয়োগ করা হয় তবে দেশটা ব্যর্থ হতে আর কতক্ষন ? মাদকের জন্য সূত্র হওয়া উচিত, উৎপাদক কিংবা আমদানি নাই কাজেই চাহিদা বন্ধ ।  

 

শুধু আমার গ্রাম নয় দেশের সকল গ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে উদ্যোগী হয়ে সকল প্রকার মাদক দ্রব্যের বিরুদ্ধে রেড-এ্যালার্ট জারি করতে হবে । প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী ট্রাসফোর্স গঠন করে পাবলিক প্লেসে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত এবং আসক্তদের শাস্তি দিতে হবে । দেশের স্বার্থেই ভাবতে হবে তরুন প্রজন্মের কথা । এ প্রজন্মই ভবিষ্যত বাংলাদেশের সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্বে দিবে । ভবিষ্যতের সেই নেতারাই যদি নেশাখোর হয় তবে তাদের থেকে দেশ পাবে কি ? মাদকের দৌরাত্ম্য রোধ করা খুব বেশি কঠিন কাজ নয় । প্রশাসনের আন্তিরক প্রচেষ্টা এবং স্থানীয়দের সহযোগিতার মাধ্যমে এ ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব । মাদকাসক্তরা কিংবা নেশাগ্রস্থরা সকল সময় অপরাধ কর্মে জড়িত । পারিবারিক কলহ কিংবা সামাজিক অস্থিরার জন্যও দায়ী মাদক । কাজেই সু্স্থ সমাজ এবং অপরাধমূক্ত দেশ গড়তে চাইলে প্রথমে দেশকে মাদকমূক্ত করতে হবে । সিসা কিংবা ইয়াবার মত ক্ষতিকর সকল মাদকদ্রব্য সাময়িক কিছু প্রশান্তি দিতে পারে বটে কিন্তু ভবিষ্যত পুরো অন্ধকার করে ফেলবে । এর কবল থেকে মুক্ত হতে না পারলে সমাজ কাঠামো, পারিবারিক ব্যবস্থার সবটাই ভেঙ্গে পড়বে । মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সচেতনতা সৃষ্টি যতটা জরুরী তার চেয়ে বেশি জরুরী মাদকের আমদানি এবং উৎপাদন বন্ধ করা । মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের মাধ্যমে আবারও ফিরে আসুক হারানো আনন্দঘন পরিবেশ, পারিবারিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আন্তরিকতা ও সামাজিক শান্তি ।

 

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

raju69mathbaria@gmail.com

 

 

 

 

০ Likes ০ Comments ০ Share ৪৩৭ Views