জীবনের প্রশ্নোত্তর মেলে না




ছোটগল্প:

জীবনের প্রশ্নোত্তর মেলে না
সাইয়িদ রফিকুল হক

 
সমির কয়েকদিন যাবৎ খুবই বিমর্ষ। আজ সকাল থেকে তার মনটা আরও বেশি খারাপ।
তামান্নার সঙ্গে তার সম্পর্কটা ইদানীং খুব-একটা ভালো যাচ্ছিলো না। তবুও সে এতোদিনের সম্পর্কটা ভাঙতে চায়নি। সে তাদের এই সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার জন্য গত কয়েকদিন যাবৎ যারপরনাই চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার জন্য আরেক পক্ষ থেকে কোনোরকম সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।
 
গত পরশু পর্যন্ত তামান্না তার সঙ্গে দিনে দুই-চারবার কথা বলতো। কিন্তু গতকাল থেকে সে ফোনে এবং সবরকমের যোগাযোগ হঠাৎ করেই একদম বন্ধ করে দিয়েছে। এসবের কোনো মানে বুঝতে পারছে না সমির। এই জীবনে সে শুধু এই একজনকেই ভালোবেসেছিলো। আর তাকে সারাজীবনের জন্যই ভালোবেসেছিলো।
সে অনেক চেষ্টা করেও এর কোনো সুরাহা করতে পারেনি। তামান্নার সঙ্গে তার এখন কথা বলার কোনো সুযোগ নাই।
কিছুক্ষণ আগে সে বড় আশা নিয়ে ফেসবুক খুলেছিলো। কিন্তু সেখানেও দুর্যোগের ঘনঘটা। তামান্না ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে হঠাৎ আনফ্রেন্ড করে রেখেছে। সমির এর কারণ বুঝতে পারছে না। তার ঠিক মনে আছে, গত কয়েকদিনে সে তো তামান্নার সঙ্গে কোনোপ্রকার অশোভন আচরণ কিংবা বেআদবি করেনি! তবুও সে তাকে কেন এইরকম শাস্তি দিচ্ছে!
সমির আপনমনে ভাবতে থাকে: তাদের পাঁচবছরের সম্পর্ক হঠাৎ ভেঙে যায় কীভাবে? সে নিজের মনকে অনেকরকম প্রশ্ন করে—কিন্তু সবখানেই তার সরল উত্তর—এমনটি তো হওয়ার কথা নয়! কিন্তু আজকাল এমনটিই তো হচ্ছে। সে তার কয়েক বন্ধুকে প্রেমে ব্যর্থ হতে দেখেছে। আর সে এতোদিন ভেবেছিলো, তাদের হয়তো কোনো ভুল আছে বা ছিল! কিন্তু নিজের জীবনের এই ঘটনাটা তাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছে। সে তো কোনো ভুলই করেনি! তবে কেন তার সঙ্গে নিয়তির এই নিষ্ঠুর খেলা! কেন মানুষ এমন করে?
 
সামনে সমিরের ফাইনাল পরীক্ষা। সে ভালোভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স-পাস করেছে। তার মনে আশা ছিল—মাস্টার-ডিগ্রীটাও সে ভালোভাবেই শেষ করবে। তারপর বিয়ে করবে তামান্নাকে। কিন্তু তার জীবনে যে হঠাৎ এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে তার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সে গতকাল থেকে আজ অবধি সারাক্ষণ নিজেকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখেছে, তার কোনো ভুল ছিল কিনা। কিন্তু সে কোথাও নিজের ভুল খুঁজে পায়নি। গত পরশু দিন তাদের ক্যাম্পাসে শেষ কথা হয়। তারপর বাসায় ফিরেও তারা সারাদিনে বেশ কয়েকবার ফোনে কথাবার্তা বলেছিলো। গত পরশু সে ঘূণাক্ষরেও তামান্নার কোনো পরিবর্তন বুঝতে পারেনি। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এনায়েত অবশ্য বলেছিলো, “তামান্নার নাকি বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে! আর পাত্রপক্ষ নাকি ভার্সিটিতে এসে তামান্নাকে দেখেও গেছে!”
তবুও এসবের কিছুই বিশ্বাস করেনি সমির। একটা পর্যায়ে মনের সন্দেহ দূর করার জন্য গত পরশু সমির কথাচ্ছলে তামান্নাকে জিজ্ঞাসাও করেছিলো, “ঘটনাটা কতটুকু সত্য?”
সমিরের মুখে হঠাৎ এসব শুনে তামান্না প্রথমে কিছুটা মনভার করেছিলো। পরে সে আগের মতো খুব সুন্দর করে হেসে বলেছিলো, “তুমি এসব বিশ্বাস কর? এসব তো লোকের বাড়াবাড়ি। আর ভার্সিটিতে যে-ছেলেটি আমার সঙ্গে ক্লাসের ফাঁকে একদিন দেখা করতে এসেছিলো—সে আমার কাজিন হয়। আর সে তো আমার অনেক জুনিয়র। এবার হলো তো। তোমার মনের অহেতুক সন্দেহ দূর হয়েছে? আর কক্ষনো এসব ভাববে না। তাছাড়া, আমরা তো প্রতিজ্ঞা করেছি যে, জীবনে কেউ কাউকে কখনও ছেড়ে যাবো না।”
সমির আর-কিছু বলতে পারেনি। তামান্নার কথা শুনে সেও হেসেছে। আর এসব লোকের বাড়াবাড়ি ভেবে সে একেবারে চুপ করে ছিল।
কিন্তু তখন তাদের পাশে বসা এনায়েত দু’জনের মাঝখানে কোনো কথা বলেনি। কিন্তু তামান্না চলে যেতেই এনায়েত খুব উদ্বিগ্ন হয়ে সমিরের ডানহাতটা চেপে ধরে বলেছিলো, “তুই আজই তামান্নাকে বিয়ে কর। নইলে, তামান্না তোর হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে রে!”
বন্ধুর কথা শুনে সমির হেসে বলেছে, “তুই একটা পাগল। ও অনেক ভালো একটা মেয়ে। আর আমাকে সে অনেক ভালোবাসে। ও কখনও আমার সঙ্গে এরকমকিছু করবে না।”
এনায়েত বুঝেছে, মানুষকে জোর করে কোনোকিছু বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করাটা সম্পূর্ণ বোকামি। আর জোর করে কাউকে কখনও কিছু খাওয়ালে যেমন বদহজম হয়—ঠিক তেমনি জোর করে কাউকে কোনোকিছু বিশ্বাস করাতে গেলেও তা সহজে তার বিশ্বাস হয় না। আর বদহজম হয়ে একসময় তা বেরিয়ে যাবেই। বিশ্বাস জিনিসটাই মনের স্বতঃস্ফূর্ততার ব্যাপার। তাই এখানে, কোনো জোরজবরদস্তি নাই।
 
আজ দু’দিন ধরে সমির ভার্সিটিতেও যায় না। তার মন খুব খারাপ। এককথায় তার মনটা এখন ভীষণ খারাপ। আর মনখারাপ হলে সে কোনোকিছুই করতে পারে না।
সকালে কোনোরকমে সামান্য নাস্তা করলো সমির। তারপর একটু গান শোনার চেষ্টা করলো। কিন্তু সেখানেও সে মন বসাতে পারলো না। তার মনের কোণে এখন একটা সন্দেহ বাসা বেঁধেছে। আর এনায়েতের কথাগুলো তার কাছে এখন একটু-একটু করে সত্য হতে শুরু করেছে। তামান্নার আচরণগুলো এখন তার কাছে আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
একটু আগে তার মা তাকে কয়েকবার ভার্সিটিতে যাওয়ার কথা বলে গেছেন। কিন্তু সমিরের মন ভালো নাই। সে একবার ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য বের হতে গিয়েও পারলো না। একরাশ লজ্জা তাকে গ্রাস করলো। তার ঈর্ষাকাতর বন্ধুরা নিশ্চয়ই এতোক্ষণ তাকে নিয়ে ক্যাম্পাসে নানারকম বিদ্রুপ শুরু করে দিয়েছে। কথাটা ভাবতেই সমির কাঁধের ব্যাগটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে বিছানায় শুয়ে পড়লো। সে বুঝতে পারছে, তার মন এখন একটু-একটু করে আরও খারাপ হচ্ছে। আর এই খারাপের যেন কোনো শেষ নাই। মন একবার খারাপ হতে শুরু করলে তা ক্রমাগত খারাপ হতেই থাকে। সে এই খারাপ মন নিয়ে আজ কোথাও যেতে পারবে না।
সে জোর করে নিজের মনটাকে অনেকরকম সান্ত্বনার বাণী প্রয়োগ করে একটু শান্ত ও চাঙ্গা করার চেষ্টা করলো। তবুও কোনো লাভ হলো না। তার মন থেমে-থেমে, থেকে-থেকে, ধীরে-ধীরে শুধু খারাপই হচ্ছে। আজ সমিরের দিনটাই খারাপ।
 
সমিরের মা ছেলের রুমে ঢুকে আদরমাখা-সুরে বললেন, “বাবা, আজ ভার্সিটিতে যাবি না?”
সমির মা-কে দেখে একটু উঠে বসার চেষ্টা করে বললো, “না, মা। আজ আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। কেমন যেন খারাপ লাগছে!”
মা কাছে এসে ও-কে একটুখানি ভালোভাবে দেখে তারপর ওর কপালে হাত রেখে বললেন, “না, জ্বরটর তো তেমনকিছু নাই! তবে হঠাৎ শরীর খারাপ করবে কেন? এতো চিন্তার বিষয়! তাইলে শুয়ে থাক বাবা। আজও না হয় ভার্সিটিতে না গেলি।”
মা চলে যাওয়ার পর সমির আরও ভেঙে পড়ে। সে আর স্থির থাকতে না পেরে বন্ধু এনায়েতকে তখনই ফোন করলো।
প্রথম কলে সে বন্ধুর কোনো সাড়াশব্দ পেলো না। পরেরবার ওপাশ থেকে ভেসে এলো বন্ধুর কণ্ঠ: “হ্যালো সমির, তুই কোথায়?”
সমির খুব মনমরা হয়ে বলে, “এই তো বাসায় রে!”
এনায়েত বলে, “আজও বাসায়! ক্যাম্পাসে একবার আসবি না? এদিকে তো একটা ঘটনা ঘটে গেছে। তুই আয় তোকে সবটা বলি। ফোনে এতোকথা বলা যাবে না।”
সমির এতে দিশেহারা হয়ে বলে, “আমি এখন শয্যাশায়ী বন্ধু। পারলে তুই ভার্সিটি থেকে একবার এখানে আয়। আর সারাদিনের মতো চলে আয়। একা-একা আমার ভালো লাগছে নারে।”
এনায়েত
১ Likes ০ Comments ০ Share ১৭৭ Views