রাজু আহমেদ

৪ বছর আগে

অর্থমন্ত্রীর পুরো পরিকল্পনা জানালে জাতি কৃতার্থ হত

৪ হাজার কোটি টাকা টাকার অঙ্কে কোন টাকাই নয় ! ঘুষ গ্রহন অবৈধ নয় ! পাঁচ টাকার নিম্ন মানের কোন মুদ্রার প্রয়োজন নাই ! রাবিশ ! বোঘাস ! একজন মানুষকে অমর করে রাখা জন্য এর চেয়ে বেশি কি আর কিছুর প্রয়োজন আছে ? বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই ভাগ্যবান কেননা তারা এমন একজন সুযোগ্য অর্থমন্ত্রী পেয়েছেন ! বিশ্বের সম্পদশালী রাষ্ট্রগুলো কোথাও এক ডলার ব্যয় করলে যেখানে কয়েকবার ভাবে সেখানে বাংলাদেশের মত একটি তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ণশীল দেশের দায়িত্বশীল অর্থমন্ত্রী নির্দ্বিধায় ঘোষণা দিলেন ৪ হাজার কোটি টাকা কোন টাকাই নয় । ভাবতেই ভালো লাগছে বাংলাদেশ বোধহয় বিশ্বের প্রধান ধণী রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে ! তবে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার সাথে বাংলাদেশের বাস্তব রুপ মেলাতে পারছি না । যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দু’বেলা আহার জোগাতে পারে না, দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য খেতে পারে না, কোটি টাকার কোন উন্নয়ণ প্রকল্প হাতে নিলে দাতা দেশ গুলোর কাছে সাহায্যের হাত পাততে হয় সেই দেশে ৪ হাজার কোটি টাকা কোন টাকাই নয় এর চেয়ে বিস্ময়কর সংবাদ আর কি হতে পারে ? অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা যদি সঠিক বলে বিবেচ্য হয় তবে এদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ মানাসিকভাবে সুস্থ নয় । হলমার্ক কেলেঙ্কারীতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের চার সহস্রাধিক টাকা লোপাট হওয়ার পর যেভাবে বীরবেশে অর্থমন্ত্রী ঘোষনাটি দিয়েছিলেন তাতে জাতি শুধু অবাকই হয়নি বরং অন্যকিছুও ভেবেছিল । সাধারণ মানুষ শুধু ভাবতেই পারে কিন্তু এমন বিখ্যাত মানুষদের নাগাল পেয়ে জিজ্ঞাসা করা কি সম্ভব ? লোপাটের টাকা রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে উধাও হলেও টাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের ছিল । হাজার টাকার নোট মুদ্রণ করতে হয়ত হাজার টাকা খরচ হয়না ভেবেই অর্থমন্ত্রী মহোদয় এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন কিন্তু অপরাধের পক্ষে বললেন কেন ? যারা এবং যাদের যোগ-সাজোশে টাকা লোপাট হয়েছে তাদেরকে নিয়ে যে নাটক করা হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষ দর্শক হিসেবেও লজ্জা পেয়েছে । অপরাধীদেরকে কখনো জামিন আবার কখনো জেল এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে । কখনো কখনো আইনও যে টাকায় বিক্রি হয় এটা বাংলাদেশে না জন্মালে হয়ত এমন নগ্নভাবে দেখা হত না । অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশকে নিয়ে কেমন স্বপ্ন দেখেন এবং তার পরিকল্পনা কি তার পুরোটা যদি জাতির সম্মূখে একবারে খুলে বলতেন তবে জাতি অনেকটা নিশ্চিত হত । হয়ত আশায় বুক বাঁধত নতুবা মূক, অন্ধ ও বধির হওয়ার কামনা করত । বিভিন্ন সময়ে অর্থমন্ত্রীর উদ্ভট কথাবর্তা সরকারকে বিব্রত না করলেও সাধারণ মানুষকে ঠিকই বিব্রত করেছে । উন্নত দেশগুলোর দূর্ভাগ্য তারা এমন অর্থমন্ত্রী পায়নি ! যদি পেত তবে তাদেরকেও বোধহয় বাংলাদেশের কাতারে নামতে হত । সরকার হয়ত তার দ্বারা সরকারের হারিয়ে যাওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করার স্বপ্নে বিভোর কিন্তু সাধারণ মানুষের স্বপ্ন যে ভেঙ্গে যাচ্ছে তার খবর কে রাখছে । সরকার যদি মনে করে, অর্থমন্ত্রীর এমন উদ্ভট কথাবর্তায় সরকারের সুনাম বাড়ছে তবে তাদের ভাবণায় ভূল আছে বলেই বিশ্বাস । চার হাজার কোটি কেন মাত্র চার হাজার টাকা নিয়েও যদি মন্ত্রী মহোদয় এমন অযৌক্তিক উক্তি করেন তবুও তা মানুষ মেনে নেবে না । মন্ত্রী পরিষদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদধারী অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্য সরকারকে নানামূখী সমস্যায় ফেলবে । হয়ত অর্থমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের ফল অতীতে সরকার কিয়দাংশ টের পেয়েছে তবে বাকীটা টের পাওয়ার সময় অত্যাসন্ন ।

 

অর্থমন্ত্রী ঘটা করে ঘোষণা দিয়েছেন দেশে পাঁচ টাকা মূল্যমানের নিম্নের কোন মুদ্রা রাখা হবে না । পাঁচ টাকার কয়েন কিংবা কাগজী মুদ্রাই হবে টাকার অংকের প্রথম সংখ্যা । অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় দেশ আবারও এগিয়েছে ! তবে কিছু সমালোচক বলছেন দেশে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে । অর্থমন্ত্রীর ঘোষণানুযায়ী বাজারে এক ও দুই টাকার যে মুদ্রা চালু আছে তা তুলে নিতে ৩’শ কোটি টাকা খরচ হবে । যার কাছে চার হাজার কোটি টাকা কোন টাকাই নয় তার কাছে মাত্র ৩’শ কোটি টাকার প্রশ্ন রাখা অর্থহীন । হঠাৎ করে এক ও দুই টাকার মুদ্রা তুলে নেয়ার কি যৌক্তিক কারণ আছে তা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয় । অর্থমন্ত্রী হয়ত ভাবছেন চলতি বছরের মাঝামাঝি তিনিসহ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনাভাতা শতভাগ বৃদ্ধি পাচ্ছে কাজেই এ দেশে এক ও দুই টাকার মুদ্রার প্রয়োজন কি ? মাত্র ১৩ লাখ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ১৫ কোটি ১০ লাখ মানুষের স্বার্থ কোন ভরসায় জলাঞ্জলি দিচ্ছেনা তা একমাত্র অর্থমন্ত্রীই বলতে পারেন । অর্থমন্ত্রী মনে ভাবতে পারেন ১৩ লাখ (যার ১১ লাখ কর্মর্ত ও ২ লাখ অবসরে) সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদেরকে ক্ষমতায় রাখতে সক্ষম কাজেই বাকীদের স্বার্থ কেন দেখতে যাবেন । বর্তমানে বাচ্চাদেরকে এক টাকায় যে চকলেট কিনে গরীব পিতা খুশি করেন সেই চকলেট পাঁচ টাকায় কিনে দিতে হবে । মন্ত্রীমহোদয় হয়ত বলবেন, গরীব পিতার কি আয় বাড়বে না ? অবশ্যই বাড়বে । ধরা যাক, গরীব পিতাটি রিকশাওয়ালা । সকল পেশার মানুষই তার রিকশার যাত্রী । সরকারী কর্মচারী যখন তার রিকশায় চড়বেন তখন তিনি বারো টাকার ভাড়ার স্থলে পনেরো কিংবা বিশ টাকা দিতে পারবেন কেননা সরকার তার বেতন দ্বিগুন করেছে কিন্তু যে লোকটি কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে কিংবা খেঁটে খায় সে কিভাবে বারো টাকার ভাড়ার স্থলে পনোরো টাকা দিবে ? এ অসামনঞ্জস্যতার সমাধান কি রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে ? দু’ই টাকার ললিপপ কিংবা একজন ছাত্র দু্’ই টাকা দিয়ে যে খেয়া পার হয়ে স্কুল আসত সেখানে পাঁচ টাকা পরিশোধ করার ক্ষমতা কয়জনের থাকবে ? এক ও দুই টাকার মুদ্রা বাজার থেকে তুলে দেওয়া কঠিন কোন কাজ নয় কিংবা অন্যায়ও হবে না কিন্তু এর কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানে অর্থমন্ত্রী কি পরিকল্পনা গ্রহন করেছেন ? হয়ত সকল সমস্যার সমাধান করার জন্য তার বৃহৎ পরিকল্পনা আছে যার কারণে তিনি এক ও দুই টাকার মুদ্রাকে জাদুঘরে পাঠাতে চান তবে সমস্যা সৃষ্টির আগেই মানুষ সমাধান জানতে চায় । এদেশে মন্ত্রী কিংবা তার কাছাকাছি পর‌্যায়ের কোন লোকের পাঁচশ টাকা কিংবা হাজার টাকার নোটের নিচে না থাকলেও চলে কিন্তু বৃহৎ অংশের স্বার্থও তো তাদেরকে দেখতে হবে । এদেশের সবাই মনে প্রাণে চায় দেশেটা দ্রুত উন্নতি করুক । বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের সাথে পাল্লা দিয়ে চলুক । তার জন্যই কি মন্ত্রীর এমন পরিকল্পনায় ? শতভাগ বেতন বৃ্দ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নতির পথে তুলে দেয়া হয়েছে ঠিক কিন্তু দেশের কতগুলো স্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তার হবে তা কি একবারও ভেবে দেখেছে দায়িত্বশীলরা ? বিশ্বের দু’একটি দেশ ছাড়া কোন দেশেই একবারে শতভাগ বেতন বৃদ্ধির দৃষ্টান্ত আছে বলে জানা নাই । বেতন আরও বাড়ালেও কোন আপত্তি নাই কিন্তু সেটার কারণে বেসরকারী খাতের বৃহৎ কর্মজীবি জনগোষ্ঠীর স্বার্থও বিবেচনা করা হউক । ধণীকে আরও ধণী এবং গরীবকে পিষে মারার মত ঘটনা বর্তমান সময়ে সত্যিই হতাশার ।

 

ইসলাম ধর্মমতে, পৃথিবীতে যতগুলো খুন হবে এবং তার খুনীদের যে পাপ হবে তার একটি অংশ পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আঃ) এর পুত্র কাবীলের ভাগ্যে জুটবে । কেননা পৃথিবীর ইতিহাসে হাবীলকে খুন করে কাবীল সর্বপ্রথম খুনের মত জঘন্য ঘটনার সূত্রপাত ঘটায় । ঘুষ অনেকেই গ্রহন করে তবে তাদের কেউ আজও ঘুষকে বৈধ বলার সৎসাহস দেখায়নি । অর্থমন্ত্রী ঘুষকে গতি সঞ্চারক অর্থ ঘোষণা করে এতে কোন দোষ খুঁজে পাননি বরং তিনি বলেছেন, যে অর্থের দ্বারা কাজের গতি বাড়ে তা চালাচাল করা যেতেই পারে । প্রমাণ হল, পারিশ্রমিক কাজের গতি সঞ্চার করতে ততোটা পরাঙ্গম নয় যতটা ঘুষ পারে । তাইতো বোধহয় বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে । আমরা কি নিশ্চয়তা পাচ্ছি, নতুন বেতন কাঠামো কার‌্যকরী হওয়ার পর ঘুষের কোন লেনদেন থাকবে না ? দু’টো পথের দু’টোই তো অনুসরণ করা সম্ভব নয় । হয় বেতন বাড়ুক এবং ঘুষ বন্ধ হোক নতুবা বেতন আগের মতই থাক এবং ঘুষের লেনদেনও আগের মত চলুক । অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় মনে হচ্ছে, বেতনও বাড়বে ঘুষও চলবে । সরকারের শুধু অর্থমন্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ বো্ধহয় ঘুষকে বৈধ বলবেননা । কাজেই দেশে যত ঘুষের আদান প্রদান হবে এবং কালে-ভদ্রে ঘুষ দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে দু’পাঁচ জন যখন কিছুটা বিচারের মূখোমুখি হবে তার কিছু অংশ কি অর্থমন্ত্রীও পেতে পারেন ?

 

অর্থমন্ত্রী উচ্চশিক্ষিত, বিচক্ষন, প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী ও জ্ঞানী তাতে সন্দেহের লেশমাত্র নাই । বয়সের কারণে হোক কিংবা অন্য কোনভাবেই হোক তার কিছু কিছু কথা ও সিদ্ধান্ত যেমনিভাবে সরকারের দুর্ণাম সৃষ্টি করছে তেমনি সাধারণ মানুষকেও বিভ্রান্ত হতে হচ্ছে । তার উচিত নিজ থেকেই মুক্তি নেয়া । যদি একান্তই তা না করেন তবে সরকারের উচিত তাকে বিশ্রামে পাঠানো । দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ণে তার তুলনা তিনি নিজেই কিন্তু কিছু কর্মকান্ড তার অর্জনে ম্লান করে দিচ্ছে । মানুষ দু’ই ভাবে অমর হতে পারে । তবে সকলের উচিত ইতিবাচক ভাবেই অমর হওয়া । শচীন টেন্ডুলকার ইচ্ছা করলে আর অনেক বছর ‍ক্রিকেট খেলতে পারত এবং তাতে তার রেকর্ডও অনেক লম্বা হত কিন্তু নিজ স্বার্থেই তিনি তা করেননি । অর্থমন্ত্রী এবং সরকার উভয়ের দিক থেকেই বিষয়টি বিবেচনা করার দাবী রইল । অনেক অর্জন সামন্যতেই বিলীন হয়ে যেতে পারে । নিশ্চয়ই মন্ত্রীমহোদয় সেটা চাইবেন না । কল্যানাকামীতাই হোক আমাদের সকলে কর্মের ধর্ম ।

 

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

raju69mathbaria@gmail.com

 

১ Likes ০ Comments ০ Share ৫০৬ Views