লোডিং ...



গল্প-সমালোচনা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘একরাত্রি’ গল্পের নায়ক ভাঙ্গা-স্কুলের সেকেন্ড মাস্টার
সাইয়িদ রফিকুল হক


 
আমি আমার এই জীবনে যত গল্প পড়ে সাংঘাতিকভাবে বিচলিত ও আলোড়িত হয়েছি তন্মধ্যে নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘একরাত্রি’। নানাকারণে গল্পটি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এটি অদ্ভুত ভালো লাগার একটি গল্প। এখানে, খুব কষ্ট আছে, আফসোস আছে, আর আছে সীমাহীন-দুঃখবোধের মধ্যেও একটুখানি আনন্দের আভাস।
 
গল্পটি পড়ি আর সেকেন্ড-মাস্টারের জন্য উতলা হয়ে উঠি। মানুষের জীবনে কত রকমের বিচিত্র ঘটনা ঘটে থাকে। এর মধ্যে প্রেম-বিরহ-ভালোবাসা আর ভালোলাগাকে কোনোভাবেই আমাদের জীবন থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। আমরা না চাইলেও এসব আমাদের জীবনে অহরহ ঘটছে। আর এগুলো আমাদের জীবনযাত্রা থেকে কখনও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। এসবই আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এমনই একটি কথকতা নিয়ে গড়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘একরাত্রি’ গল্পটি। এই গল্পটি ‘সাধনা’-পত্রিকার জৈষ্ঠ্য ১২৯৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়।
 
গল্পটি পর্যালোচনার আগে আমরা এর মূল কাহিনীটি জেনে নেবো। আর এতে আমাদের আলোচনা বুঝতে সহজ হবে।
গল্পটির মূল কাহিনী:
 
অপূর্ব-সুন্দরী সুরবালার সঙ্গে আমাদের গল্পের নায়কের বাল্যকাল থেকে পরিচয় ও প্রণয়। সেই সুরবালা তার বাল্যসখী। একসময় তারা বড় হয়। গল্পের নায়ক দুর্দমনীয়-উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সঙ্গী করে এন্ট্রান্স-পাসের পর বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা-শহরে পাড়ি জমায়। সেখানে, সে একটি কলেজে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা ও রাজনীতি চালিয়ে যেতে থাকে। এমন সময় নায়কের পিতা বিশেষ উদযোগী হয়ে সুরবালার পিতার সঙ্গে সুপরামর্শ করে—আর তার পুত্রের সঙ্গে সুরবালার বিবাহসম্বন্ধ স্থির করে। কিন্তু সেই সময় গল্পের নায়ক সুরবালার মতো একটি মেয়েকে বিবাহ করাটাকে কোনো কাজ বলেই গণ্য করে না—অর্থাৎ, সে বিয়েতে রাজী হয় না। একসময় সুরবালার বিয়ে হয়ে যায়। পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পরে নায়ক পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে চাকরি করতে যায় পাড়াগাঁয়ের এক স্কুলে। সেখানেই সে সুরবালাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে—আর সে তখনই সত্যিকারভাবে সুরবালার প্রেমে পড়ে যায়। আর সেখানে, একদিন সুরবালার সঙ্গে তার অদৃশ্য-সাক্ষাতের পর থেকে সুরবালার প্রতি তার প্রেম ও আকর্ষণ দুইই বাড়তে থাকে। কিন্তু সুরবালা যে এখন পরস্ত্রী!
 
একজন স্বপ্নাতুর তরুণের কাহিনী এখানে করুণভাবে বিধৃত হয়েছে। একেবারেই গ্রামের ছেলে সে। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল বড়। সে কালেক্টর সাহেবের নাজির হতে চেয়েছিলো, সেরেস্তাদার হতে চেয়েছিলো, আর তা না পারলে সে আদালতের হেডক্লার্ক হতে চেয়েছিলো। একসময় সে ইতালির জাতির জনক মাটসিনি গারিবালডির মতো নেতাও হতে চেয়েছিলো। কিন্তু সে কিছুই হতে পারেনি। সবশেষে, সে হয়েছে একটা ভাঙ্গা-স্কুলের সেকেন্ড মাস্টার। আর এইখানে এসেই তার জীবনের মোড় ঘুরে গেছে।
 
আমাদের গল্পের সেকেন্ড মাস্টার বয়সে একেবারেই তরুণ ছিল। আর তার স্বপ্নগুলোও ছিল একেবারে তরতাজা। তাই, সে ভাবী-জীবনের জন্য একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সঙ্গী করে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলো। এন্ট্রান্স পাস করার পর সে মনে করেছিলো: কোনোরকমে একবার কলকাতা-শহরে যেতে পারলে তার জীবনের বিরাট একটাকিছু হয়ে যাবে। এই আশার বশবর্তী হয়েই সে পালিয়ে কলকাতায় এসে একটি কলেজে ভর্তি হয়। আর সেখানে সে রাজনীতিও শুরু করে দেয়। তরুণ-বয়সে কলকাতার মতো একটি বিরাট শহরে গিয়ে তার রক্তে রাজনীতির একটা নেশা ধরে যায়। আর সে মনে করে: এভাবেই পতিত-ভারতবর্ষের একটি বিরাটকিছু রকমের উন্নয়ন সাধিত হবে। সেই আশাতেই সে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে ভারতের সেবক হয়ে উঠেছে বটে—কিন্তু তার নিজের ভবিষ্যতকে বিসর্জন দিয়ে। আর এই সময় হঠাৎ তার মধ্যে দেশপ্রেমের আবেগটা বেশি পরিমাণে জাগ্রত হয়। আর এইসময় পারিবারিক বা বৈষয়িক কোনো ব্যাপারেই তার তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। আর তাই, একনিষ্ঠচিত্তে সে দেশসেবায় নিয়োজিত হয়েছিলো। এবার গল্পকথক সেকেন্ড মাস্টারের মুখেই আমরা কতকটা শুনি:
 
“নাজির-সেরেস্তাদার হইতে আসিয়াছিলাম, কিন্তু মাটসীনি গারিবালডি হইবার আয়োজন করিতে লাগিলাম।”
 
মানুষ সবকিছু আগেভাগে বুঝতে পারে না। অনেকে ঠকে শেখে। আবার অনেকে নিজের চরম সর্বনাশের পরে প্রকৃত-সত্য-উপলব্ধি করতে পারে। আমাদের এই সেকেন্ড মাস্টারের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। সুরবালার সঙ্গে যখন তার পিতা উদযোগী হয়ে তার বিবাহের সমস্ত সুবন্দোবস্ত করছিলো, তখন সে এটিকে নিছক একটি পাগলামি বা ছেলেমানুষি মনে করে নিজের মনের অজান্তেই তার থেকে দূরে সরে গেছে। আর এই অবসরে সুরবালার বিয়েও হয়েছে রামলোচন উকিলের সঙ্গে। কিন্তু তাতেও সেকেন্ড মাস্টারের রাজনীতির মোহভঙ্গ হয়নি। তার মোহভঙ্গ হয়েছে আরও অনেক পরে। তাই, আমাদের সেকেন্ড মাস্টার তার চপলতা ও চাঞ্চল্যের কারণে তার বাল্যসখী সুরবালার সঙ্গে পারিবারিকভাবে আয়োজিত বিবাহকে অস্বীকার করে আজীবন বিবাহ না করে দেশসেবার প্রতিজ্ঞা করে বসলো। এখানে, তার অদূরদর্শী সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পেয়েছে। গল্পকথক নিজেই বলেছে:
 
“আমি পনেরো বৎসর বয়সের সময় কলিকাতায় পালাইয়া আসি, তখন সুরবালার বয়স আট; এখন আমি আঠারো। পিতার মতে, আমার বিবাহের বয়স ক্রমে উত্তীর্ণ হইয়া যাইতেছে। কিন্তু এ দিকে আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, আজীবন বিবাহ না করিয়া স্বদেশের জন্য মরিব। বাপকে বলিলাম, বিদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ সমাধা না করিয়া বিবাহ করিব না।
 
দুই-চারি মাসের মধ্যে খবর পাইলাম উকিল রামলোচন বাবুর সহিত সুরবালার বিবাহ হইয়া গিয়াছে। পতিত ভারতের চাঁদা-আদায়কার্যে ব্যস্ত ছিলাম, এ সংবাদ অত্যন্ত তুচ্ছ বোধ হইলো।”
 
আসলে কী তা-ই? তখন তার ভিতরে প্রচণ্ডরকমের ছেলেমানুষির প্রভাব থাকায় সুরবালাকে তার কাছে তুচ্ছ বলে মনে হয়েছিলো। কিন্তু এরই কিছুদিন পরে যখন আমাদের নায়কের পিতার মৃত্যু হয়—তখন তাকে পরিবারের হাল ধরার জন্য পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি আয়-রোজগারের জন্য নওয়াখালি-বিভাগের ছোট শহরে একটি এন্ট্রান্স-স্কুলের সেকেন্ড মাস্টারির পদগ্রহণ করতে হলো। আর এইসময় সে জানতে পারলো: সুরবালাও এখানে থাকে—সরকারি উকিল রামলোচন এখানকারই বাসিন্দা। সেই সুবাদে একদিন স্কুলের কাজ-শেষে আমাদের সেকেন্ড মাস্টার রামলোচন উকিলের সঙ্গে আলাপ করতে তার বাসায় গেল। আর এখানে এসেই তার জীবনের সমস্ত মোহ-ভঙ্গ হলো। আমাদের মাস্টার যখন রামলোচন উকিলের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। তখনই হঠাৎ তার মনোযোগ বিঘ্নিত হলো—আর তা অন্যদিকে নিবদ্ধ হলো। আমরা নায়কের নিজের মুখেই শুনি:
 
“এমন সময় পাশের ঘরে অত্যন্ত মৃদু একটু চুড়ির টুংটাং, কাপড়ের একটুখানি খসখস এবং পায়েরও একটুখানি শব্দ শুনিতে পাইলাম। বেশ বুঝিতে পারিলাম, জানালার ফাঁক দিয়া কোনো কৌতুহলপূর্ণ নেত্র আমাকে নিরীক্ষণ করিতেছে।
 
তৎক্ষণাৎ দুখানি চোখ আমার মনে পড়িয়া গেল—বিশ্বাস, সরলতা এবং শৈশব-প্রীতিতে ঢলঢল দুখানি বড় বড় চোখ, কালো কালো তারা, ঘনকৃষ্ণপল্লব, স্থিরস্নিগ্ধ দৃষ্টি। সহসা হৃৎপিণ্ডকে কে যেন একটা মুষ্টির দ্বারা চাপিয়া ধরিল এবং বেদনায় ভিতরটা টনটন করিয়া উঠিল।”
 
আর তা এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী কথাগুলোও তার মুখ থেকেই শুনি।
 
“বাসায় ফিরিয়া আসিলাম, কিন্তু সেই ব্যথা লাগিয়া রহিল। লিখি-পড়ি, যাহা করি, কিছুতেই মনের ভাব দূর হয় না; মনটা সহসা একটা বৃহৎ বোঝার মতো হইয়া বুকের শিরা ধরিয়া দুলিতে লাগিল।”
 
এরপর থেকে তার শুধু সুরবালার কথা মনে হতে লাগলো। সে অনেক চেষ্টা করেও সুরবালার চিন্তা তার মাথা থেকে দূর করতে পারলো না। সুরবালার জন্য তার মনটা কেবলই আকুলিবিকুলি করতে লাগলো। এমন সময় তার বুকের ভিতরে আপনাআপনি বেজে উঠলো:
 
“সুরবালা আজ তোমার কেহই নয়, কিন্তু সুরবালা কী না হইতে পারিত।”
 
এই একটি কথা আর একটিমাত্র ভাবনা আজ সেকেন্ড মাস্টারের সমস্ত শক্তি ও সাহসকে ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছে। এরপর থেকে সেকেন্ড মাস্টার আর-কোনো কাজে মনঃসংযোগ করতে পারছে না। দিনের সমস্ত সময় তার মনের ভিতরে একটিমাত্র ভাবনা সবকিছুতেই আজ তালগোল পাকিয়ে ফেলছে, আর সবকিছুকে একেবারে তছনছ করে দিচ্ছে। তার নিজের কথায়:
 
“এখন হইতে আর কোনো কাজে মনঃসংযোগ করিতে পারি না। দুপুর বেলার ক্লাসে যখন ছাত্রেরা গুনগুন করিতে থাকিত, বাহিরে সমস্ত ঝঁ-ঝাঁ করিত, ঈষৎ উতপ্ত বাতাসে নিমগাছে পুষ্পমঞ্জরীর সুগন্ধ বহন করিয়া আনিত, তখন ইচ্ছা করিত। কী করিত, জানি না। এই পর্যন্ত বলিতে পারি, ভারতবর্ষের এই সমস্ত ভাবী আশাম্পদদিগের ব্যাকরণের ভ্রমসংশোধন করিয়া জীবনযাপন করিতে ইচ্ছা করিত না।”
 
একদিন সেকেন্ড মাস্টার স্বেচ্ছায় সুরবালাকে ভুলে দেশসেবার ব্রতগ্রহণ করেছিলো। আজ সেই মাস্টারই সুরবালার জন্য ভীষণভাবে উতলা। সুরবালা ছাড়া তার জীবন যেন এখন একেবারে অর্থহীন। সুরবালাই এখন তার কাছে সবকিছু! তার নিজের কথায় এটি ভীষণভাবে ফুটে উঠেছে:
 
“তোমার মতো লোক সুরবালার স্বামীটি হইয়া বুড়া বয়স পর্যন্ত বেশ সুখে থাকিতে পারিত। তুমি কিনা হইতে গেলে গারিবালডি এবং শেষে হইলে একটি পাড়াগাঁয়ের স্কুলের সেকেন্ড মাস্টার!”
 
এটি শুধু তার আক্ষেপ নয়—এটি তার বিরহ-যন্ত্রণাকাতর তাপিত-হৃদয়ের নির্মম আহাজারি। এর থেকে যেন তার আজ মুক্তি নাই। সুরবালা ভিন্ন অন্যকিছুতে তার হৃদয়ের তাপদগ্ধ-যন্ত্রণা আজ আর প্রশমিত হবে না। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে আজ তার কাছে মনে হচ্ছে: এই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস একমাত্র সুরবালা। আর তার অনুতপ্ত-হৃদয়ই এখন বলে দেয়, ভুল-ভারে আজ সে জর্জরিত। সে এখন সচেতনভাবে আপনমনে স্বীকার করে নিচ্ছে—এই ভুল তার একান্তই নিজের।
 
আর এই ভুলের মাশুল আজ তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। সেদিন, নিজের তারুণ্যশক্তির মদমত্তে দিশেহারা হয়ে তরুণ-কলেজছাত্র সুরবালাকে চিনতে পারে নাই। সেদিন, তার মধ্যে একমুহূর্তের জন্যও সামান্য কিংবা প্রচণ্ড প্রেমভাব-জাগ্রত হয় নাই। উচ্চাকাঙ্ক্ষার অদম্য-দুরাশা তাকে বাল্যসখী সুরবালাকে চিনতে দেয় নাই। উপরন্তু, কলকাতা-শহরে গিয়ে তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিলো এক অসামান্য দেশপ্রেমচেতনা, আর এই চেতনা নিঃসন্দেহে তার মানবিক-সত্তারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু দেশসেবা করেও তো সুরবালাকে বিবাহ করা যেতো—আর সুরবালাকে বিবাহের পরও তো তার দেশসেবা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। অধিকন্তু, তখনই বরং তার দেশসেবা আরও ভালোভাবে চলতে পারতো। সুরবালাকে হারিয়ে আজ-এখন তার কাছে এই জগতসংসার সবকিছুই অসহ্য মনে হয়। অথচ, একদিন শিক্ষকতার কাজ পেয়ে এই সেকেন্ড মাস্টার কতই না খুশি হয়েছিলো। আর ভেবেছিলো: এর মাধ্যমে সে দেশসেবা করতে পারবে। কিন্তু আজ তার কাছে এমনতর সবকিছুই যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়। এখানে, তার সেই যন্ত্রণাকাতর হৃদয়ের পরিচয় একটুখানি তুলে ধরছি:
 
“স্কুলের ছুটি হইয়া গেলে আমার বৃহৎ ঘরে একলা থাকিতে মন টিকিত না, অথচ কোনো ভদ্রলোক দেখা করিতে আসিলেও অসহ্যবোধ হইত। সন্ধ্যাবেলায় পুষ্করিণীর ধারে সুপারি নারিকেলের অর্থহীন মর্মরধ্বনি শুনিতে শুনিতে ভাবিতাম, মনুষ্যসমাজ একটা জটিল ভ্রমের জাল। ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করিতে কাহারও মনে পড়ে না, তাহার পরে বেঠিক সময়ে বেঠিক বাসনা লইয়া অস্থির হইয়া মরে।”
 
একদিন ঝড়-জলোচ্ছাসের রাতে সুরবালা কোনো উপায়-অন্তর না দেখে অপেক্ষাকৃত উঁচুস্থান স্কুলঘরে আশ্রয় নিতে এসেছিলো। আর সে পানি-ভেঙে এসে স্কুলের পুকুরপাড়ে উঁচু জায়গাটায় দাঁড়ালো। অপরদিকে তাকে বাঁচানোর জন্য তার বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলো আমাদের সেকেন্ড মাস্টার। হঠাৎ তারা দুজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। আর সেইসময় তারা দুজন শুধু নীরবে-নিভৃতে দাঁড়িয়েই রইলো। কেউ কোনো কথা বলেনি।
 
এই একটি রাতেও তার বিরহ-যন্ত্রণা কমেনি। বরং তা যেন আরও বেড়ে গেছে। তবুও এই যন্ত্রণার মাঝেও সে একটুখানি সুখ খুঁজে পেয়েছে। তার অবহেলার পাত্রী-বাল্যসখী সুরবালা সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সেই বিপদমুহূর্তে শুধু তার কাছেই ছুটে এসেছিলো। আর এতে সেকেন্ড মাস্টারের বিরহ-যন্ত্রণা কমেনি—বরং আরও বেড়ে গেছে। সুরবালাকে এতো কাছে পেয়েও সে তাকে কিছুই বলতে পারেনি।
 
সেকেন্ড মাস্টারের বিরহ-যন্ত্রণা কখনও কমবে না। কারণ, সারাজীবন তার বুকের ভিতরে কেবলই ধ্বনিতপ্রতিধ্বনিত হতে থাকবে: “সুরবালা কী না হইতে পারিত।” তাই, সমগ্র বাংলাসাহিত্যে এমন বিরহ-যন্ত্রণাকাতর মানুষ খুব কমই আছে। সেকেন্ড মাস্টার চিরদিন এই দুঃখকে হৃদয়েধারণ করেই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। তার নিজের ভাষায় শোনা যাক সেই আকুতি:
 
“ভাবিলাম, আমি নাজিরও হই নাই, সেরেস্তাদারও হই নাই, গারিবালডিও হই নাই। আমি এক ভাঙ্গা স্কুলের সেকেন্ড মাস্টার। আমার সমস্ত ইহজীবনে কেবল ক্ষণকালের জন্য একটি অনন্ত রাতের উদয় হইয়াছিল—আমার আয়ুর সমস্ত দিন-রাত্রির মধ্যে সেই একটিমাত্র রাত্রিই আমার তুচ্ছ জীবনের একমাত্র চরম সার্থকতা।”
 
আমাদের সেকেন্ড মাস্টার যথা-সময়ে যথা-কাজটি করতে পারেনি। বয়সের চঞ্চলতার কারণে, তার উপর বৃহৎ কলকাতার আকর্ষণীয় জনজীবনে সেকেন্ড মাস্টার আনন্দচিত্তে মিশে যাওয়ায় তার জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। তাই, তার শৈশবের বালসখী সুরবালাকে বিসর্জন দিতে তার তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। কলকাতার আবহাওয়ায় তার মনে হয়েছিলো: এমন কত সুরবালা কিংবা এরচেয়ে যোগ্য কোনো বালা তার জীবনকে আলোকিত করবে। কারণ, তার স্বপ্ন ছিল ইতালির জাতির জনক মাটসীনি গারিবালডির মতো নেতা হওয়ার। কিন্তু তার পিতার অকাল-মৃত্যুতে আর নিজের নির্বুদ্ধিতায় তার জীবনে এই অশনী সংকেত নেমে আসে। এখন তার জন্য আমাদের বৃথা আফসোস ব্যতিরেকে আর কিছুই করার নাই।




 
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৩/০৬/২০১৬

আপনার সমস্যা সম্পর্কে দয়া করে আমাদের জানান